হাসান হাফিজের রম্য কলাম: অলিম্পিকে সুড়ঙ্গ খননের ইভেন্ট চাই

Hasan-Hafiz-v2 শুক্কুরে শুক্কুরে এক মাসও পার হয় নাই। বলছি নয়া মন্ত্রীদের বয়সের কথা। দুজন মন্ত্রী উমদা নিউজ পয়দা করেছেন। একজন হাসি হাসি মুখ করে সোনার নৌকা উপহার নিয়েছেন। তাকে ‘সংবর্ধনা’ জানাতে জড়ো হওয়া (বাধ্যতামূলক) কচি কচি শিশুদের থাকতে হয়েছে অনাহারে। আরেক মন্ত্রী কলেজের অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসে আয়েশ করে ধূমপানে লিপ্ত ছিলেন। সাব্বাস মন্ত্রীষ্টয়। ইনারা মহাক্ষমতাধর। তাদের ‘লীলা’ বোঝা ভার! তাদের কর্মকা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা নালায়েকের কাজ। সেধে সেধে বেকুব হতে চায় কোন্ আহাম্মক! আমরা বেছে নেব নিরাপদ একটা সাবজেক্ট। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেমন ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে (এ) বেছে নিয়েছে। এই পাট্টি সরকারেও আছে, বিরোধী দলেও আছে। টু ইন ওয়ান। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা কবিতার বইয়ের নাম ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’।

পাঁচ বস্তা টাকা চুরি করে নেওয়া হয়েছে। ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পুকুর চুরি, না সমুদ্র চুরি। সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখা থেকে। এই মহত্ কর্ম সম্পাদিত হয়েছে অভিনব ডিজিটালি কায়দায়। মাটি কেটে সুড়ঙ্গ কেটে লোপাট করা হয় এসব টাকা। ২৩ মাস সময় ব্যয় হয়েছে এই সুড়ঙ্গ নির্মাণ (!) করতে। এক শ’ ফুটের সুড়ঙ্গ। মূল হোতা সোহেল ৫ বস্তা টাকাসহ গ্রেফতার হয়েছে ঢাকায়। বমাল কট। সংক্ষেপে এই হলো আমাদের ‘নিরাপদ’ সাবজেক্ট। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা বাংলার মাটিতে এটাই প্রথম ঘটল। ডিটেইলস না জানা অব্দি শান্তি পাওয়া যাচ্ছে না।

ফিল্মি কায়দায় যে ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তার নায়ক সোহেলের সাকিন পটুয়াখালী। চাকরি সূত্রে বসবাস কিশোরগঞ্জে, ১৫ বছর ধরে। এই জেলারই মেয়ে সাদিয়ার সঙ্গে বিবাহ। চাকরি ছেড়ে দুবাই যায় সোহেল। ফিরে আসে ৭ লাখ টাকাসমেত। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেয় মামাশ্বশুর সিরাজকে। ব্যবসার জন্য। শ্বশুর টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা করে। শ্বশুর সাহেব ব্যাংক ডাকাতির অভিনব কায়দা শিখিয়ে দেয় জামাই বাবাজিকে। নঘুয়া নামের এক জায়গায় থাকত সোহেল। সোনালী ব্যাংকের লোকেশন হচ্ছে রথখোলায়। ভিকটিম ব্যাংকের পাশেই একটা টিনশেড বাড়ি সে ভাড়া করে মাসিক আড়াই হাজার টাকায়। সোহেল কাঠের কাজ করে বলে এলাকায় প্রচার করা হয়।

বাসা তো ভাড়া নেয়া হলো। এবার মূল কাজ শুরু। মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে সময় লাগল দীর্ঘ ২৩ মাস। সোহেল ভালোই জানে, সবুরে মেওয়া ফলে। ধৈর্য হারায়নি তাই। বাসা ভাড়া নেয়ার এক মাস পর সুড়ঙ্গের খনন কাজ শুরু হয় (খাল কেটে কুমির আনার মতো কি?)। দিনের বেলা খোঁড়াখুঁড়ি চলে। রাত্রিকাল নঘুয়ার বাসায়। প্রতিদিন কোদাল, শাবল, বেলচা দিয়ে কাজকাম সারা হয়। ব্যাংকের বারান্দার নিচে তৈরি করা হয় এই সুড়ঙ্গ পথ। সোহেল ভয় পেয়ে যায়, বারান্দা ধসে গেলে ধরা খেতে পারে সে। বারান্দা থেকে ব্যাংকের ভেতরে কেমন করে বানানো যায় সুড়ঙ্গ পথ? এই গুরুদায়িত্ব বর্তায় গিয়ে তার সম্পর্কিত মামাশ্বশুরের স্কন্ধে। শ্বশুরের বুদ্ধিতে ব্যাংকের এমএলএসএস আবু বক্করের সঙ্গে খাতির করে সোহেল। বক্করের কাছ থেকে জানা যায় ব্যাংকের ভল্ট ঠিক কোন্ জায়গায় অবস্থিত।

পুনর্বার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু। ভল্টের ঠিক কাছটায় পৌঁছানো গেল শেষতক। এবার জানা প্রয়োজন ব্যাংকের খোলা থাকা ও বন্ধ থাকার তথ্য (এটা কী তথ্য অধিকারের মধ্যে পড়ে? মালুম নেহি)। আবু বক্কর তো আছেই, সে তথ্য সাপ্লায়ার। মামাশ্বশুরের কাছ থেকে নেয়া হয় ড্রিল মেশিন ও কাটার মেশিন। ভল্ট ভাঙার জন্য যেগুলো অতীব প্রয়োজনীয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় শনিবার ভল্ট ভেঙে টাকাকড়ি বাগানো হবে। শনিবার বোধকরি শুভদিন! রাত ১২টায় সোহেলের সানন্দ প্রবেশ ভল্ট রুমে। টেবিলে রাখা ছিল ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ৫টি বস্তায় ভরা হলো সেসব। একটা একটা করে বস্তাগুলো সরায় সোহেল নিজে, একাই। একদিন পর একটি পিকআপ ভ্যান ভাড়া করা হলো। গন্তব্য ঢাকার শ্যামপুর। পিকআপ ভ্যানের চালককে সে বলে, ঢাকায় বাসা বদল করবে।

শ্যামপুরে পৌঁছানো গেল। পরদিন আটরশির ওরস শরিফের জন্য তিনশ’ বস্তা চাল কিনে দেয় সোহেল। এ জন্য খরচা হয় ৬ লাখ টাকা। এ আর এমন কী! সোহেল তো এখন আর হেঁজি-পেঁজি লোক না। রীতিমত কোটিপতি। দুই-চার-ছয় লাখ টাকা তো তার হাতের ময়লা!

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার কিছু চমকপ্রদ তথ্য আমরা পেয়েছি। সেদিকে যদি একটু চোখ না বুলাই, পুরো মজাটা আমরা পাব না। সেটি হবে ৫ জানুয়ারির প্রায় ভোটারশূন্য এবং ঐতিহাসিক (!) জাতীয় নির্বাচনের মতন বেহুদা ও নিরামিষ অভিজ্ঞতা। ও রকম ‘মফিজ’ বা হরিদাস পাল হওনের খায়েশ আমাদের এক্কেবারেই নাই, বাহে। তথ্যাদি—সোহেল এ পর্যন্ত ১৯টি সিমকার্ড ও ৯টি মোবাইল সেট পরিবর্তন করে। ওইসব মোবাইলের কল লিস্টের সূত্র ধরে তাকে বাগে আনা হয়। সুড়ঙ্গটি ২২ ফুট লম্বা। কমপক্ষে ৩৬৫ সিএফটি মাটি সরাতে হয়েছে তাকে, এই অপারেশনে। যে কাজে দরকার হতো কমপক্ষে তিনটি ট্রাক্টর।

পরিকল্পনা সফল হওয়ার খুশিতে ডগোমগো হয়ে উঠেছিল সে। হওয়ারই কথা। এত মেহনত, এত রঙিলা স্বপ্ন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা। বৃথা কী যেতে পারে এই সমুদয় প্রচেষ্টা? নিশ্চয়ই না। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়েই নফল নামাজ আদায় করে মসজিদে। শেষ রক্ষা হলো না। র্যাব সব ভ ুল করে দিয়েছে।

ঘটনা এমনই, শুনে, জেনে, টিভির পর্দায় চাক্ষুষ করে টাসকি লেগে গেছে আমাদের। বাউ রে! যার তবদা লাগেনি, সে স্বাভাবিক মানুষ না। র্যাবের লোকজন বড়ই বেরসিক। এত বড় তাজমহল সাইজের একখান স্বপ্ন কিনা তারা বেআক্কেলের মতো ভেঙেচুরে খানখান করে দিল। তবে জনাব, এই চাঞ্চল্যকর অপারেশনের পজিটিভ দিকও কিছুমিছু রয়েছে। সোনালী ব্যাংক ফোকলা করে ফেলার যে ‘মহাপরিকল্পনা’ বঙ্গদেশে বর্তমানে চলমান— সুড়ঙ্গবাজ সোহেল সেই মিশন কমপ্লিট করে দিল। অলিম্পিকে সুড়ঙ্গ খনন ইভেন্ট যুক্ত করা গেলে সোহেল নিশ্চয়ই সোনা জিতবে। উজ্জ্বল করবে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মুখ। গত ৫ জানুয়ারির প্রহসন মার্কা নির্বাচন যেমন বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমর্যাদাকে স্বর্ণখচিত করেছে, তারচেয়েও বেশি।