লুটেরাদের রুখে দাও

ইংরেজরা লুটছে ২০০ বছর, ডাচ-ফিরিঙ্গিরাও নিয়ে গেছে অনেক। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো লুটে নতুন সভ্যতা গড়ার ইতিহাস অনেক পুরাতন। এই লুটেরারা কখনো ইউরোপের কোন রাজার সেনাদল, সভা করার জন্য পাঠানো শাষক বর্গ আবার কখনো এরা বহুজাতিক কোম্পানি(বক)- যে রুপেই যে সংগঠনের চেহারাতেই আসুক, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এরা এনেছে অনাহার, দুর্ভিক্ষ, রোগ-মহামারী ও মৃত্যু। আর প্রতিবাদ করলে তাদের নির্যাতনে জনপদ প্লাবিত হয়েছে রক্তের বন্যায়। রক্ত বয়ে গেছে সুমাত্রায়, জাভায় (আজকের ইন্দোনেশিয়া), ইন্দোচিনে (ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোড়িয়া), বার্মায়, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। সে রক্তের স্রোত আজো থামেনি, বইছে নতুন তালে নতুন ছন্দে।

সোনার বাংলা একটি প্রাচীন সমৃদ্ধ সভ্যতার নাম। মুসলমানদের সাড়ে পাঁচ শত বছরের শাষণ আমলে বাংলা পৃথিবীর কাছে পরিচিতি পায় ’দুনিয়ার জান্নাত নামে ’। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাকে বলেছেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ”। চীনা রাজ প্রতিনীধিরা বলেছেন, “সপ্ত স্বর্গ এই রাজ্যে পৃথিবীর স্বর্ণরাজি ছড়িয়ে রেখেছে”। সম্রাট বাবর বলেছেন, “বাংলা মুলক অঢেল প্রাচুর্যের দেশ”। সম্রাট হুমায়ুন গৌড়ের প্রাচুর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে নগরীর নাম রাখেন “জান্নাতাবাদ”। মানরিক বলেন, “বাংলায় তখন স্বর্ণ-রৌপ মুদ্রার ছড়াছড়ি ছিল”। ফরাসি পর্যটক বার্ণিয়ার লিখেছেন, “বাংলা মুলক হিন্দুস্থানের সর্বাপেক্ষা সম্পদশালী অঞ্চল এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ”। মধ্যযুগে বাংলার এই সৌন্দর্য আর সম্পদ আকৃষ্ট করেছে বহু বণিক ও লুটেরাদের। ডাচ, ওলন্দাজ, ইংরেজ ছাড়াও দেশের অভ্যান্তরেই বহু লুটেরা গোষ্ঠির শোষণে বাংলা আজ ভিখারীর দেশে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জনগণের রক্ত চোষার ক্ষেত্রে ভিন দেশীদের চেয়ে দেশীয় লুটেরাদের ভূমিকাই বেশী ঘৃণ্য ও বর্বর তম।

বাংলা লুটের সুচনা বলতে গেলে আজকের সুসভ্য ইংরেজদের হাতেই। পলাশীযুদ্ধের প্রহসনমুলক নাটক শেষ হতে না হতেই লুণ্ঠিত হয় মুর্শিদাবাদের রাজকোষ। সে সময় রাজকোষে কি পরিমান সম্পদ ছিল? যদ্দুর জানা যায় মুর্শিদকুলী খাঁর শাষনকাল থেকে দীর্ঘ ৫৫ বছরের সঞ্চয় একত্রিত হয়ে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার কোষাগারে ছিল। পূর্নিয়ার যুদ্ধের পর সার্জন ফোর্থের প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী সঞ্চিত সম্পদের মধ্যে মণিমুক্তা ও হিরা জহরতের মূল্য বাদ দিয়ে, তৎকার্লীন মুদ্রায় ৬৮ কোটি টাকা[ S.C.Hill.Bengal in 1757-67, P.108 ], যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের সাথে তুলনীয়।

পলাশীর নাটক শেষ করে সিরাজ-উদ-দৌলারই দেওয়ান রামচাঁদ বাবু, মুনশী নবকিষোণ, লর্ড ক্লাইভ ও মীর জাফরকে নিয়ে নবাবের কোষাগারে হাজির হন বিত্তসম্পদ লুট করার জন্য। প্রসাদে ও অন্দরমহলে সংরক্ষিত সম্পদ ভাগ করে নেয় দেওয়ান রামচাঁদ, মুনশী নবকিষোণ, মীরজাফর ও আমীর বেগ(সিয়ারে মতাযেলি অুনুবাদ পৃ. ২৩)। মুর্শিদাবাদের রাজকোষ থেকে পাওয়া যায় পনের লক্ষ পাউন্ড অর্থাৎ ৩০ কোটি টাকার সম্পদ। ক্ষতিপুরণ হিসেবে বৃটিশ নৌবাহিনী ও স্থল বাহিনীর ছয় জন সদস্যকে দিতে হয় ৮ কোটি টাকা, সিলেক্ট কমিটির ছয় জনকে ১৮কোটি, ক্লাইভ তার নিজের জন্য আদায় করেন প্রায় ৩ কোটি এবং কাউন্সিল মেম্বাররা পান জন প্রতি এক থেকে দেড় কোটি টাকা করে।

ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ছোট বড় সব কর্মচারী এবং তাদের দলগত চক্রের শোষণ লুণ্ঠণে দু:সহ পরিতস্থিতি সৃষ্টিকরে সমগ্র বাংলা ব্যাপী। আর উচ্চবিত্ত আমীর উমরার দল শিখন্ডী নবাব হওয়ার খায়েশে তাদের সম্পদ উজার করে ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য ব্যায় করতে থাকে। মীর কাশিম এই উদ্দেশ্যে তৎকালীন টাকায় ৪ কোটি এবং মীরজাফরের ছেলে প্রায় ৩ কোটি টাকা কোম্পানীর হাতে তুলে দেয়। ওদিকে বাংলার জনপদ তাদের স্বাধীনতা হারিয়ে নৈরাশ্য, হতাশা ও চরম বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়। বাংলার অর্থনৈতিক চরম বিশৃঙ্খলা ও শোষণযজ্ঞের কথা শিকার করেন লর্ডক্লাইভ, যিনি কিনা ছিলেন এই শোষনযজ্ঞের প্রধান পুরোহিত(মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ সংস্কৃতির রুপান্তর, আব্দুল ওয়াদুদ,পৃ ৬০-৬২)।

বৃটিশ আমলে বাংলার অর্থনীতি মানেই হলো সুপরিকল্পিত শোষনের মর্মভেদী ইতিহাস। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭৫৭ থেকে ১৭৮০ পর্যন্ত মাত্র তেইশ বছরেই বাংলা থেকে ইংলেন্ডে পচার হয়েছে প্রায় তিন কোটি আশি লক্ষ পাউন্ড। যা ১৯০০ সালের মুল্যমান হিসাবে প্রায় তিনশ কোটি টাকা, আর বর্তমানের হিসেবে তা দুই থেকে তিন লক্ষ কোটি টাকা [ Miller quoted by Misra. P-15.]। লুটপাট আর শোষনের ফলে মাত্র ১৩ বছরের মাথায় এক সময়ের সমৃদ্ধ বাংলায় নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

ইংরেজদের ২০০ বছরের শাষণ আমল সাধারণ জনগণের জন্য আরো বেশী দূর্বিসহ করে তোলে এদেশেরই এক শ্রেণীর জমিদাররা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশের আপমর কৃষকশ্রেণী তাদের জমির মালিকানা হারিয়ে গোলামে পরিণত হয়। এই জমিদার শ্রেণীর অত্যাচার নির্যাতন আর শোষনে এক সময়ের সমৃদ্ধ সোনার বাংলা রিক্ত হয়ে পরে। পুর্ব বাংলার এই অবহেলিত জনপদ যেন মাথা তুলে দাড়াতে না পারে জমিদার বাবুদের সে চেষ্টার কোন কমতি ছিল না। বাবুদের জুলুম থেকে পরিত্রাণ পেতে পুর্ব বাংলার জনগণের বঙ্গ ভঙ্গের দাবীকে তারা দেশ প্রেমের দোহাই দিয়ে ভন্ডুল করে দেন। যুগ যুগ ধরে শোষণ করার সুবিধার্থে এ অঞ্চলের জনগণ যাতে শিক্ষিত হতে না পারে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বিরোধিতা করে রবীন্দ্র বাবুদের সভা সমাবেশের ইতিহাসও ভোলার নয়।

আপরদিকে মারোয়ারীদের ব্যাবসায়ীক নীতি পুর্ব বাংলাকে আরো বেশী বঞ্চিত করে। অবস্থাটি এমন যে বাংলাদেশের পুরো অঞ্চল ছিল কোন এক গৃহস্থের ফসলি জমি আর পশ্চিম বঙ্গ হচ্ছে সেই গৃহস্থের পরিপাটি বাড়ি। দেশ ভাগের আগে যদিও বিশ্বের ৮০ শতাংশ পাটের উৎপাদন হতো পূর্ব বঙ্গে অর্থাৎ বাংলাদেশে, কিন্তু পুরো ব্যাবসার নিয়ন্ত্রণ মারোয়ারীদের হাতে থাকায় সমস্ত পাটকল গুলো স্থাপিত হয় পশ্চিম বঙ্গে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ প্রায় সমস্ত জমিদারের বসবাস ছিল পশ্চিম বঙ্গে। বাংলার কৃষকের হাড় জল করা ফসলে টাকায় তারা গড়েছেন অট্টালিকা আর আমাদের ভাগ্যে জোটেছে দূভিক্ষ, মৃত্যু ও অপমান।

দেশ ভাগের পর এদেশের জনতা ভাগ্যন্নোয়নের যে সপ্ন দেখেছিল পাকিস্তানের অপরিনাম দর্শী শোষক শ্রেণী সেটিও বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। অবশেষে জনতার প্রতিরোধের মধ্যদিয়ে আসে স্বাধীনতা।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। জনতার ভোট বর্জনের যে স্বতস্ফুর্ততা বিশ্ববাসী দেখেছে, তাতে করে এই সরকারের বৈধতার প্রশ্নটি অবান্তরই বটে। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সুশিল সমাজ, দাতাগোষ্ঠী এমন কি জাতিসংঘ কে পাশ কাটিয়ে পেশী শক্তির মাধ্যমে যা হয়েছে তাকে নাটক বলা যায় মাত্র নির্বাচন নয়। আওয়ামী সরকারের শক্তির উৎস যে ভারত তা আগেও কয়েক বার বলেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ১৬ কোটি মানুষের দায়ভার ভারত নিতে পারবে কি?

ভারতের মত চরম আধীপত্যবাদী দেশ বিগত দিনগুলোতে আমাদের সাথে যে আচরণ করেছে তাকে অন্তত গিভ এন্ড টেইক বলা যায় না। শুধু টেইক। ৭১ সালে যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ থেকে সম্পদ লুটের ইতিহাস এখনো ভূলেনি এ দেশের মানুষ। সেক্টর কমান্ডার এম.এ জলিল তার “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” বইয়ে যুদ্ধ পরবর্তী সম্পদ লুটের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা পাঠককে রিতিমত অবাক করে। ভারতীয় সেই লুটপাটের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কারা বরণও করতে হয়েছিল তাকে। সিরাজের পতনের পর ইংরেজদের শোষণ লুণ্ঠনের পরিণতিতে দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হতে ১৩ বছর সময় লেগেছিল, কিন্তু ৭১এ হিন্দুস্থানী লুণ্ঠনের মাত্র ৩ বছরের মাথায় বাংলার জনগণকে দুর্ভিক্ষে পড়তে হয়েছিল।

সরকারের হটকারীতায় ইতি মধ্যেই দাতা গোষ্ঠী তাদের কঠোর মনোভব ব্যক্ত করেছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনাও প্রবল। শুধু মাত্র গার্মেন্টস সেক্টরের নিষেধাজ্ঞা দেশের অর্থনীতি কোথায় নিয়ে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ড. দেব প্রিয় ভট্টচার্যের মতে, ”একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে দেশ”। এ ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ভারতের মত রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশের বোঝা বহন করা কতটা সম্ভব? যেখানে ভারতের আর্থ সামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকাংশেই নিচে। বাংলাদেশে দারিদ্র সীমা প্রায় ২৬ পার্সেন্ট অপর দিকে ভারতে তা ৪০ পার্সেন্টের উপরে।

ডিপ্লমেটিকেলি ইতি মধ্যেই বাংলাদেশ বন্ধু শুন্য বলা চলে, যার পুরো সুযোগ নিতে চায় ভারত। এতে করে একরোখা আওয়ামী সরকার আরো বেশী করে ভারতের দিকে ঝুকতে বাধ্য হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভারত কোন স্বার্থে এত বড় বোঝা মাথায় নিতে যাচ্ছে? সম্পদ তো লুট হয়েছে অনেক আগেই অপর দিকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। তা হলে কি এবার কৌশল গত ভাবে অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ বাংলাদেশের ভূমির উপর তাদের নজর?

গ্রাম অঞ্চলে সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো নিজেদের জমি বিক্রি করে উচ্চবিত্তের জীবন ধারণের ঘটনা হর হামেশাই চোখে পড়ে। শেখ হাছিনা সরকার ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের নামে ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের কিছু কিছু অংশ যদি বিক্রি করে দেশ চালাতে থাকে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। করিডোরের চুক্তি ইতি মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, এবার শুধু জমি মাপযোক করে দখলে নেয়ার পালা।

ইতিহাসে ঘৃণ্য লুটেরাদের চেহারায় আজ রুহানী ছাপ, তারা এখন পুত-পবিত্র মানবতার ফেরিওয়ালা। শত বছরের শোষণে রিক্ত বাংলায় আবারো তাদের নজর পরেছে। রক্তশেষ তো কি হয়েছে? হাড় মাংস যা আছে এবার সেটিও চাই। এবার বাংলার মাটি চাই।