সন্ত্রাসের রাজত্বে

নাজিব ওয়াদুদ

নাজিব ওয়াদুদ

মূল: অনরে দ্য বালজাক
অনুবাদ: নাজিব ওয়াদুদ

১৭৯৩ সালের ২২শে জানুয়ারী, সন্ধ্যা আটটার দিকে, এক বৃদ্ধা মহিলা এলো এবড়োখেবড়ো সড়ক পেরিয়ে যেটা শেষ হয়েছে ফঁবুর্গ সেইন্ট মার্টিনে সেইন্ট লরেন্ট চার্চের উল্টো দিকে। সারাদিন এমন ঘন বরফ পড়েছে যে, মহিলার পদশব্দ শোনাই যায় না; রাস্তাগুলো ফাঁকা, এবং নীরবতার মধ্যে, অস্বাভাবিক নয় এমন একটা মারাত্মক ভীতিকর অনুভূতি আরো বাড়ছিলো সেই মহাসন্ত্রাসের ব্যাপ্তির কারণে, যার কবলে পড়ে সে সময় কাতরাচ্ছিলো ফ্রান্স; উপরন্তু, পথিমধ্যে এ পর্যন্ত কারো সাক্ষাৎ পায়নি মহিলা। তার দৃষ্টি পড়ে গেছে অনেক আগেই, সে জন্যে ফঁবুর্গের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া প্রশস্ত সড়কের ওপর লণ্ঠনের আলোয় দূরে ছায়ার মতো বিক্ষিপ্ত গুটিকয়েক পথিক তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। যখন সে রিউ দ্য মর্তজ্ অতিক্রম করলো তখন তার খেয়াল হলো তার পেছন পেছন হেঁটে চলা একজন মানুষের কঠিন, ভারি পদশব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। তার মনে হলো এই শব্দ সে এর আগেও শুনেছে, এবং কেউ তার পিছু নিয়েছে এই আতঙ্কে সে দ্রুত হেঁটে আলোকোজ্জ্বল দোকানের জানালার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলো, আশা- তার মন যে সন্দেহের কবলে পড়েছে তা যাচাই করে নেয়া।

যখনি সে রাস্তা পার হয়ে বয়ে আসা আলোর মধ্যে এসে দাঁড়ালো, তখনি, হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়ালো, এবং কুয়াশার মধ্য দিয়ে একটা মানবিক চেহারা তার দৃষ্টিতে ধরা দিলো। সেই আবছা দর্শনই যথেষ্ট ছিলো। মুহূর্তেকের জন্যে আতঙ্কের চাপে সে থরথর করে কাঁপলো, কারণ তার আর সন্দেহ রইলো না যে মানুষটা তাকে তার নিজের দরোজা থেকে শুরু করে গোটা রাস্তা ধরেই অনুসরণ করেছে; তখন এই স্পাই-এর কবল থেকে বাঁচার আকাক্সক্ষা তাকে শক্তি দান করলো।

পরিষ্কার ভাবে চিন্তা করতে না পেরে, সে দু’বার আগের মতো দ্রুত হাঁটলো, ভাবখানা এমন যেনো তার চেয়েও দ্রুতগামী লোককে টেক্কা দিয়ে সে পালাতে পারবে। পেস্ট্রি প্রস্তুতকারী এই দোকানটায় পৌঁছানো পর্যন্ত সে কয়েক মিনিট দৌড়েছে। সে এলো এবং কাউন্টারের পাশের চেয়ারে বসলো, যেনো বসলো না, ডুবে গেলো চেয়ারটায়। একজন তরুণী, যে ব্যস্ত ছিলো কাপড়ে নকশা তোলার কাজে, দরোজার হুড়কো খোলার কচকচ শব্দে উঠে দাঁড়ালো, এবং জানালার কাঁচের মধ্য দিয়ে তাকালো। মনে হলো সে পুরনো কেতার খয়েরী সিল্কের আঙরাখা পরা মানুষটাকে চিনতে পারলো, কারণ সে তৎক্ষণাৎ ড্রয়ারে আগন্তুকের জন্যে রাখা কিছু একটা যেনো খুঁজতে লাগলো। মেয়েটির এই ত্রস্ততা এবং মুখের ভাব শুধু এটাই প্রমাণ করছে না যে সে এই অনাকাক্সিক্ষত অতিথির কাছ থেকে যত দ্রুত সম্ভব নিস্তার পেতে চাচ্ছে, বরং ড্রয়ার শূন্য দেখে তার মুখে অস্থির বিস্ময় ফুটে উঠলো। মহিলার দিকে না তাকিয়ে সে তার ডেস্ক থেকে উঠে দ্রুত দোকানের পেছনে গেলো, এবং তার স্বামীকে ডাকলো, যে তৎক্ষণাৎ এসে হাজিরও হলো।

‘কোথায় রেখেছিলে? …’ সে অস্পষ্টভাবে বললো, প্রশ্ন শেষ করার ফাঁকে খদ্দেরকেও দেখে নিলো।

বৃদ্ধা মহিলার মাথায় বড়ো-সড়ো কালো রেশমের কাপড়ের ওপর চারদিকে গিঁঠ দেয়া খয়েরী ফিতা জড়ানো ঢাকনাটাই কেবল পেস্ট্রি বিক্রেতা লোকটি দেখতে পেলো, কিন্তু সে তার স্ত্রীর দিকে এমন ভাবে তাকালো যেনো প্রশ্ন করতে চাইলো, ‘তুমি কি মনে করো তোমার ড্রয়ারে পড়ে থাকা জিনিসগুলোর মতো এ রকম একটা জিনিস হেলায় ফেলে রাখবো?’ তারপর সে চলে গেলো।

বৃদ্বা মহিলা যে ভাবে মূর্তির মতো স্থির ও নিরব হয়ে থাকলো তা দেখে দোকানীর স্ত্রী অবাক হলো। সে তার পাশে গেলো, এবং কাছ থেকে দেখে সহসাই কৌতুহল মিশ্রিত করুণাধারা সঞ্চারিত হলো তার মধ্যে। বৃদ্ধা মহিলার মুখ প্রাকৃতিকভাবেই বিবর্ণ; তাকে এমন দেখাচ্ছিলো যেনো তার গোপন কৃচ্ছতার অভ্যাস আছে; কিন্তু এটা সহজগোচর ছিলো যে, সাম্প্রতিক কোনো ক্ষোভ-উদ্বেগ তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ম্লান করে তুলেছে। তার মাথার কাপড় এমন ভাবে বিন্যস্ত করা যে তা তার শাদা চুলগুলোকে প্রায় পুরোটাই আড়াল করে রেখেছিলো, সন্দেহ নেই বয়সের কারণেই তা শাদা হয়েছে, কারণ তার পোশাকের কলারে পাউডারের ছিটেফোঁটাও ছিলো না। তার পোশাকের খুবই সাদামাটা ধরন তার মুখে ফুটিয়ে তুলেছিলো কৃচ্ছতার ছায়া, এবং তার অবয়বে ছিলো আভিজাত্য ও রাশভারি ভাব। আগেকার সময়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের আচরণ ও স্বভাব এতোই পৃথক ছিলো যে একজন সম্ভ্রান্ত মানুষকে সহজেই চেনা যেতো, এবং দোকানীর স্ত্রী নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারলো যে মহিলা তার পুরনো খদ্দের, এবং সে রাজ দরবারের মানুষ।

‘মাদাম,’ সে শুরু করলো অনিচ্ছাকৃত শ্রদ্ধার সঙ্গে, ভুলে গেলো যে খেতাবটা বেআইনী।

কিন্তু বৃদ্ধা মহিলা কোনো উত্তর করলো না। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো জানালার দিকে, ভাবখানা এমন যেনো জানালার কাঁচের ওপারে ভয়ানক কিছু একটা সংঘটিত হচ্ছে। পেস্ট্রি বিক্রেতা সে সময় ফিরে এলো, এবং মহিলার সংবিত ফেরালো, সামনে ধরলো নীল কাগজে জড়ানো ছোট একটা কার্ডবোর্ড বাক্সো।

‘কী ব্যাপার, বলুন তো?’ সে জিজ্ঞেস করলো।

‘না, কিছু না বন্ধুগণ,’ সে নম্রস্বরে উত্তর করলো। কথা বলার সময় সে লোকটার দিকে তাকালো, যেনো সে দৃষ্টির মাধ্যমে তাকে ধন্যবাদ জানাতে চায়; কিন্তু সে দেখলো তার মাথায় লাল টুপি, এবং একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে, ‘আহ! তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ!’

উত্তরে লোকটা এবং তার তরুণী স্ত্রী তাচ্ছিল্য দেখালো, তাতে মহিলার মুখে রং ফুটে উঠলো; সম্ভবতঃ তার নিস্তার লাভের অনুভূতি হলো, এটাও হতে পারে যে তার সন্দেহের জন্যে সে লজ্জা পেলো।

‘আমাকে ক্ষমা করবেন!’ সে বললো, কণ্ঠে শিশুসুলভ মিষ্টতা। তারপর, পকেট থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে পেস্ট্রি বিক্রেতার সামনে ধরলো। ‘এই দামই ঠিক হয়েছিলো,’ সে বললো।

এক ধরনের অভাব আছে যা সহজাত ধারণা থেকে শুধু তারাই অনুভব করতে পারে যারা জানে অভাব কী। লোকটা এবং তার স্ত্রী পরস্পরের দিকে তাকালো, তারপর সামনের মহিলার দিকে, এবং পরস্পরের চোখে একই চিন্তা পাঠ করলো। এই সোনার টুকরোটাই তার শেষ সম্বল। সেটা বের করে দেয়ার সময় তার হাত মৃদু কাঁপছিলো, তাকিয়েছিলো দুঃখিত কিন্তু অকাতর দৃষ্টিতে, এমন একজনের মতো যে এই ত্যাগের পূর্ণ মাত্রা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। ক্ষুধা এবং নিদারুণ দারিদ্র্য তার মুখমণ্ডলে কঠোর কৃচ্ছতা এবং আতঙ্কের রেখা খোদাই করে দিয়েছে যা সহজেই পড়া যায়। তার পোশাকে বিগত আভিজাত্যের অবশিষ্ট এখনো বিদ্যমান। তিনি পরে ছিলেন জীর্ণ রেশমের পোশাক, পরিষ্কার কিন্তু অতিব্যবহারে মলিন আঙরাখা, আর সুনিপুণভাবে মেরামত করা লেস্, … সংক্ষেপে বলা যায় পুরনো জাঁকজমকের ন্যাকড়া। দোকানী এবং তার স্ত্রী, করুণা এবং স্বার্থের টানাপড়েনের মধ্যে, তাদের বিবেককে প্রশমিত করতে শুরু করলো কথার দ্বারা।

‘আপনাকে খুব অসহায় বলে মনে হচ্ছে, …’

‘মনে হয় মাদাম কিছু খেতে পছন্দ করবেন,’ স্ত্রীটি বললো।

‘আমাদের কাছে খুবই সুন্দর ক্কাথ আছে,’ পেস্ট্রি বিক্রেতা যোগ করলো।

‘আজ খুবই ঠাণ্ডা,’ তার স্ত্রী বললো, ‘মনে হচ্ছে আপনার ঠাণ্ডা লেগেছে, মাদাম, এখানে আসতে গিয়ে। আপনি এখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে উষ্ণ হতে পারেন।’

‘আমরা শয়তানের মতো অতোটা কালো নই।’ লোকটা বললো।

পরোপকারী দম্পতির কথা ও কণ্ঠের আন্তরিক সদিচ্ছা মহিলার আস্থা অর্জন করলো। সে বললো একজন অপরিচিত লোক তাকে অনুসরণ করছে, এবং একাকী বাড়ি ফিরতে তার ভয় হচ্ছে।

‘এই ব্যাপার?’ মহিলার কাছে গিয়ে লোকটা বললো; ‘একটু দাঁড়ান তো দেখি।’

সোনার মুদ্রাটি সে স্ত্রীর হাতে দিলো, তারপর টাকাটার যথেষ্ট বিনিময় দানের চিন্তার দ্বারা তাড়িত হয়ে সে তার ন্যাশনাল গার্ডের ইউনিফরম পরতে গেলো; চিন্তাটা এমন যে তেমন একটা মূল্য নেই এমন কিছুর জন্যে অতিরিক্ত দাম পেলে ব্যবসায়ীর মাথা থেকে তা ফসকে যায়। টুপিটা নিলো সে, খাপে তলোয়ার পরিয়ে কোমরে বাঁধলো, তারপর পূর্ণসজ্জিত হয়ে বেরিয়ে এলো। কিন্তু তার স্ত্রীর চিন্তা করার ফুরসত ছিলো, যা সচরাচর ঘটে, চিন্তাটা বন্ধ করে দিলো তার হাত যা খুলেছিলো দয়ার্দ্র সদিচ্ছার কারণে। পাছে তার স্বামী কোনো ঝামেলায় পড়ে এই ভয় ও অস্বস্তিতে সে তার কোটের স্কার্ট ধরার চেষ্টা করলো, তাকে নিরস্ত করার জন্য, কিন্তু সে, পূণ্যাত্মার মতো, তার প্রথম পরহিতকর চিন্তার অনুসরণ করলো, এবং তার স্ত্রী তাকে থামানোর আগেই সে মহিলাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব দিলো।

‘যে লোকটার ভয় উনি করছেন, মনে হচ্ছে সে এখনো দোকানটার পাশে ঘুরঘুর করছে,’ স্ত্রী মেয়েটি বেশ তীক্ষè স্বরে বললো।

‘আমিও সেই ভয়ই করছি,’ সরল মনে বললো মহিলা।

‘কী হবে যদি সে স্পাই হয়? … ফাঁদ হয়? … যেও না। তার কাছ থেকে বাক্সোটা নিয়ে নাও …’

ফিসফিস কথাগুলো পেস্ট্রি বিক্রেতার কানে ঢুকে তার সাহসের উত্তেজনাকে শীতল করে শূন্যে নামিয়ে দিলো।

‘ওহ! আমি কেবল যাবো আর দুটো কি একটা কথা বলবো। আমি তার কবল থেকে আপনাকে খুব শিগগিরই উদ্ধার করবো,’ ঘুরে দোকানের দিকে যেতে যেতে সে বললো।

এর মধ্যে বৃদ্ধা মহিলাটি শিশুর মতো উদাসীন এবং প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে আবার চেয়ারটায় বসে পড়লো। কিন্তু সৎ পেস্ট্রি বিক্রেতা সোজাসুজি ফিরে এলো। তার মুখের লালাভ ভাব, যা আরো বেড়ে গিয়েছিলো পেস্ট্রি তৈরির আগুনের কারণে, তা হঠাৎ শাদা হয়ে গেছে; এমন এক আতঙ্ক তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যে, হাঁটার সময় সে কাঁপছিলো, এবং তাকাচ্ছিলো মাতাল মানুষের মতো।

‘হে দরিদ্র অভিজাত! আপনি কি চান যে আমার মাথা কাটা যাক?’ সে ভীষণ ভাবে চিৎকার করে উঠলো। ‘এই মুহূর্তে আপনি চলে যান এবং আর কখনো আপনাকে যেনো এখানে আর না দেখি। আপনার ফাঁদ তৈরির জিনিসের জন্যে আমার কাছে আর আসবেন না।’

কথা বলার সময় ছোট বাক্সোটা নেয়ার চেষ্টা করলো যা সে মহিলার পকেটে রেখে দিয়েছিলো। কিন্তু একটা অপবিত্র হাতের স্পর্শ পেয়ে মুহূর্তের জন্য মহিলার যৌবন এবং কর্মতৎপরতা ফিরে এলো, যার জন্যে দাম পরিশোধ করেছে তা হারানোর চেয়ে, এবং কোনো ত্রাণকর্তার চেয়ে, খোদা রহম করুন, রাস্তার বিপদকেই সে বেছে নিলো। সে লাফ দিয়ে দরোজার কাছে গেলো, সেটা খুললো, এবং হারিয়ে গেলো, হতবাক স্বামী-স্ত্রী আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে থাকলো।

বাইরে এসে দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগলো সে; কিন্তু শিগগিরই তার শক্তি পরাস্ত হলো। সে শুনতে পেলো ভারি পায়ের বরফ মাড়ানোর শব্দ, বুঝতে পারলো সেই নির্দয় স্পাইটা তার পিছু নিয়েছে। সে থামতে বাধ্য হলো। সে-ও একই ভাবে থামলো। আতঙ্কে, অথবা মেধার অভাবে, তার সঙ্গে কথা বলা কিংবা তার দিকে তাকানোর সাহস তার হলো না। সে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো; লোকটা তার গতি কমালো এবং কিছুটা পেছনে সরে গেলো, এমন ভাবে, যেনো সে দৃষ্টির মধ্যে থাকে। সে তার ছায়াই হবে হয়তো।

নিশ্চুপ লোকটা এবং মহিলাটি যখন আবার সেইন্ট লরেন্ট চার্চ পেরুলো তখন ন’টা বাজার ঘন্টা পড়লো। এটাই বস্তুর স্বভাবধর্ম যে, জঙ্গী বিক্ষোভের ওপর অবশ্যই শান্তিপন্থার সাফল্য নিশ্চিত, এমনকি দুর্বল হৃদয়েও; কারণ, অনুভব যদি হয় অনন্ত, আমাদের অনুভব করার ক্ষমতা সীমিত। সুতরাং, যাকে তার ওপর নির্যাতনকারী বলে মনে হচ্ছে তার দিক থেকে কোনো ক্ষতির দেখা না পেয়ে সে চেষ্টা করলো এ রকম ভাবতে যে সে তার নিরাপত্তা-চিন্তায় উদ্বিগ্ন একজন অচেনা বন্ধু। যেভাবে এই আগন্তুকের আগমন এবং তাদের একত্র হওয়া তার পেছনের সমস্ত পরিস্থিতি সে খতিয়ে দেখতে লাগলো, যেনো সে এই আরামদায়ক তত্ত্বের জন্য কিছু ভিত্তি খুঁজছে, এবং তার ভেতর খারাপের চেয়ে বরং সদিচ্ছাই ছিলো বলে ভাবতে উদ্বুদ্ধ হলো সে।

পেস্ট্রি বিক্রেতাকে যে ভয় এই লোকটা দেখিয়েছে তার কথা ভুলে গিয়ে সে ফঁবুর্গ সেইন্ট মার্টিনের ওপর প্রান্ত দিয়ে দৃঢ় পায়ে হেঁটে চললো; এবং আরেক আধা ঘন্টা হাঁটার পর, যেখান থেকে ব্যারিয়ার দ্য প্যান্টিনগামী রাস্তাটা প্রধান সড়ক থেকে বেরিয়ে গেছে, সেই কোণের বাড়িটায় গিয়ে পৌঁছলো। এমন কি আজ এই দিনের বেলাতেও এই জায়গাটা প্যারিসের সবচেয়ে নির্জন এলাকা। উত্তুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে বুত্তিস-চমন্ট এবং বেলিভিলির ওপর দিয়ে, বাড়িগুলোর (কুটির বলাই ভালো) ভেতর দিয়ে বাঁশি বাজাতে বাজাতে, বাড়িগুলো প্রায় বসতিশূন্য পতিত নিচু আবর্জনাস্তুপের ওপর ছড়ানো-ছিটানো, যেখানে মাটি আর হাড়ের স্তুপ দিয়ে চালানো হচ্ছে বেড়ার কাজ। জায়গাটা দেখতে জনমানবশূন্য, হতাশা ও দুঃখের উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। এই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে এক অসহায় প্রাণীর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার অদম্য ইচ্ছা যা তাকে নিস্তব্ধ রাতে রাজপথ দিয়ে একাকী চলার দুঃসাহস জুগিয়েছে।

কী ভেবে সে দাঁড়ালো, মনে হয় তার কারণ তার দ্বিধান্বিত ভাব। মহিলাটি তাকে এখন সড়কবাতির কুয়াশা ভেদ করে আসা অনুজ্জ্বল কাঁপা কাঁপা আলোয় আবছাভাবে দেখতে পাচ্ছে। ভয় তাকে চোখ দিয়েছে। সে দেখলো, অথবা ভাবলো সে দেখছে আগন্তুকের চেহারা সম্পর্কে অশুভ কিছু। তার পুরনো ভয় আবার জেগে উঠলো; তার দ্বিধার সুযোগে সে ছায়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত নিঃসঙ্গ বাড়িটার দরোজা ঠেলে ঢুকে পড়লো, চোখের পলকে হারিয়ে গেলো ভূতের মতো।

কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকলো আগন্তুক, চোখ নিবদ্ধ বাড়িটার দিকে। উপশহর এলাকায় এটা একটা দুর্দশাগ্রস্ত আবাস; ভগ্নপ্রায় কুটির, বাজে পাথরের তৈরি, হলুদ রঙের প্রলেপ দেয়া, তাতে এমন বড়ো বড়ো ফাটল যে ভয় হয় মৃদু দমকা বাতাসেই এটা উড়ে যাবে। বাদামী শ্যাওলা পড়া টাইলের ছাদের কতকগুলো জায়গা ফাঁকা, দেখে মনে হয় তুষারের ভারে সেটা ভেঙ্গে পড়বে। প্রত্যেক তলার তিনটি করে জানালার ফ্রেম রোদ-বৃষ্টিতে পচে গেছে; নিশ্চিত যে শীত এর মধ্য দিয়ে ভেতরে ঢোকার পথ করে নেবে। বাড়িটা এভাবে নিজে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে কোনো পুরনো অট্টালিকার মতো যাকে ধ্বংশ করতে ভুলে গেছে মহাকাল। চিলেকোঠার জানালার মৃদু আলো ছাদের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে ঠিকরে বেরুচ্ছে, এছাড়া গোটা দালানটাই পুরো অন্ধকারে ঢাকা।

এদিকে বৃদ্ধা মহিলা দড়ির হাতল ধরে ধরে কষ্টে-সৃষ্টে এবড়ো-খেবড়ো জেবড়া-জোবড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো। মহিলা চিলেকোঠার ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে রহস্যজনকভাবে টোকা দিলো; একজন বৃদ্ধ লোক তার জন্যে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলে সে তৎক্ষণাৎ তার ওপর ধপাস করে বসে পড়লো।

‘লুকান! লুকান!’ লোকটার দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে উঠলো মহিলা। ‘আমরা যে মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরে যাই, আমরা যা কিছু করি সবই জানা, প্রত্যেকটা পদক্ষেপের ওপর নজর রাখা হচ্ছে…’

‘এখনকার ব্যাপারটা কী?’ আগুনের পাশে বসা আরেক বয়স্কা মহিলা জিজ্ঞেস করলো।

‘যে লোকটা গতকাল এবং আজ বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করেছে, সে আজ রাতে আমাকে অনুসরণ করেছে…’

এসব কথা শুনে জীর্ণ গুহার তিন বাসিন্দা পরস্পরের মুখের দিকে তাকালো এবং যে গভীর আতঙ্ক তারা অনুভব করছে তা লুকোনোর চেষ্ট করলো না। সামলে উঠতে বৃদ্ধ পাদ্রীর সময় লাগলো সবচেয়ে বেশি, সম্ভবতঃ তিনিই সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে রয়েছেন। যদি কোনো সাহসী লোককে ওজন করা হয় ভীষণ দৃর্দশা বা নির্যাতনের বোঝা দিয়ে, তাহলে সে শুরু করে নিজেকে কুরবানি করার মধ্য দিয়ে, এটাই হয়; এবং তারপরে তার জীবনের প্রত্যেকটা দিন হয় ভবিতব্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা এক একটা বিজয়। কিন্তু যেভাবে মহিলারা তাঁর দিকে তাকালো তাতে বোঝা গেলো যে তাদের তীব্র উদ্বেগ তাঁরই জন্যে।

‘ঈশ্বরের ওপর আমাদের বিশ্বাস কেন ব্যর্থ হচ্ছে, প্রিয় বোনেরা?’ তিনি বললেন, নিচু কিন্তু উদ্দীপ্ত কণ্ঠে। ‘কার্মেলিতিস-এ ঘাতক এবং তাদের শিকারের তীব্র চিৎকারের মধ্যে আমরা ঈশ্বরের প্রশংসা কীর্তন করেছি। এটাই যদি তাঁর ইচ্ছা হয় যে আমি সেই কসাইখানা থেকে বেঁচে আসবো, তাহলে সেটা ছিলো, সন্দেহ নেই, এই জন্য যে আমাকে নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে অন্য কোনো পরিণতির জন্য যা কোনো রকম উহ-আহ ছাড়াই সহ্য করতে আমি বাধ্য। ঈশ্বর নিজেই তার লোকদের রক্ষা করবেন; তাদেরকে নিয়ে তিনি যা-ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। এটা তোমাদের ব্যাপার, আমার নয়, যা নিয়ে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে।’

‘না,’ মহিলাদের একজন উত্তর করলো। ‘একজন পাদ্রীর জীবনের তুলনায় আমাদের জীবনের কীই বা মূল্য?’

‘এ্যাবেই দ্য চেলিস-এ বাইরে আসার পর আমি আমার দিকে মৃতের মতো তাকিয়েছিলাম,’ বললো নানটি, যে ঘরের বাইরে যায়নি, আর যে সিস্টার বাইরে থেকে ফিরলো সে ছোট বাক্সোটা বের করে পাদ্রীর সামনে ধরলো।

‘কেকগুলো এর মধ্যে … কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছি কেউ যেনো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে।’

এতে, তিনজনই কান পেতে শুনতে লাগলো। শব্দটা মিলিয়ে গেলো।

‘যদি কেউ ভেতরে আসতে চেষ্ট করে তাহলে ভয় পেও না,’ পাদ্রী বললেন।

‘একজন বিশ্বাসভাজন লোককে সীমান্ত পেরোবার সমস্ত ব্যবস্থা করার জন্য বলা হয়েছে। তার চিঠি নিতে আসার কথা, চিঠিটা আমি লিখেছি ডিউক দ্য ল্যাঞ্জেয়াঁস এবং মার্কুয়িস দ্য বসঁকে, এই ভয়ঙ্কর দেশ থেকে, এবং যে মৃত্যু বা দুঃখ তোমাদের সামনে অপেক্ষমান, তার কবল থেকে তোমাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় তারা করতে পারে কিনা।’

‘আপনি কি তাহলে আমাদের সাথে যাচ্ছেন না?’ নান দু’জন শ্বাস চেপে চিৎকার করে উঠলো, ভেঙ্গে পড়লো তারা।

‘আমার কাজ সেখানে, যেখানে রয়েছে ভুক্তভোগীরা,’ সহজ ভাষায় বললেন পাদ্রী, মহিলারা আর কিছু বললো না, কিন্তু সশ্রদ্ধ প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকালো তাদের অতিথির দিকে। কেকওয়ালা নানের দিকে ঘুরলেন তিনি।

‘সিস্টার মার্থা,’ তিনি বললেন, ‘হোসান্না শব্দের উত্তরে পত্রবাহক বলবে ফিয়াত ভলান্তাস।’

‘কেউ একজন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে!’ অন্য নানটি চিৎকার করে উঠলো, ছাদের সঙ্গে তৈরি করা লুকোনোর জায়গাটা খুললো সে।

গভীর নৈঃশব্দের মধ্যে এবার শোনা সহজ হলো, সিঁড়িতে একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; কাদা দিয়ে লেপা সিঁড়িতে এটা একজন মানুষের ভারি পদশব্দ। বেশ কষ্ট করে একটা আলমারির মধ্যে ঢুকে পড়লেন পাদ্রী, আর নানটি তার ওপর কাপড় বিছিয়ে দিলো।

‘তুমি দরোজাটা বন্ধ করতে পারো, সিস্টার আগাথা,’ তিনি চাপা কণ্ঠে বললেন।

তিনি লুকিয়ে সেরেছেন কি না, অমনি দরোজায় তিনবার খটখট শব্দ হলো। পবিত্র মহিলারা পরামর্শের জন্য পরস্পরের চোখের দিকে তাকালো, এবং একটা কথাও বলবে না বলে সাহসে বুক বাঁধলো।

দু’জনেরই বয়স ষাট বছরের কাছাকাছি বলে মনে হয়। তারা দুনিয়াবী জীবনের বাইরে বাস করেছে চল্লিশ বছর, এবং কনভেন্ট জীবনের অভ্যস্ততায় এমন ভাবে বেড়ে উঠেছে যে তারা অন্যদের সম্পর্কে খুব কমই কল্পনা করতে পারে। তাদের কাছে, উষ্ণ-ঘরে রাখা গাছের মতো, বাতাসের পরিবর্তন মানেই মৃত্যু। এবং সেজন্যেই, একদিন সকালে যখন গরাদ ভেঙ্গে পড়লো, তারা কাঁপতে কাঁপতে জানলো যে তারা মুক্ত। বিপ্লব তাদের সরল হৃদয়ে যে প্রভাব তৈরি করলো তা কল্পনা করা সহজ; তাদের জন্যে স্বাভাবিক নয় এমন জড়বুদ্ধি হয়ে গেলো তারা। জীবন এবং তার সমস্যার সঙ্গে কনভেন্টে শেখা ধারণাগুলোকে তারা মেলাতে পারলো না; এমনকি নিজেদের অবস্থানও বুঝতে পারলো না। তারা হয়ে উঠলো ঐ রকম শিশুদের মতো মায়েরা যাদের যতœ নিয়েছে সব সময়, এখন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে মাতৃসুলভ দূরদর্শিতায়। আর যে-ই শিশু কাঁদে, অমনি তাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রার্থনা করতে। এখন, অত্যাসন্ন বিপদের মুখে, তারা মূক ও অসাড়, তারা জানে যে কোনো প্রতিরক্ষা খ্রীষ্টিয় সমর্পণকে রক্ষা করতে পারে না।

দরাজার লোকটা, অনুমতির জন্য কিছুক্ষণ নিরব অপেক্ষার পর, উদয় হলো, আর মহিলাগুলো কাঁপতে লাগলো। এই সেই ঘুরঘুর করা লোক যে কিছুক্ষণ আগে তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু তারা তার দিকে ভয়ার্ত কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকলো, যে রকম লাজুক শিশুরা নিরবে তাকিয়ে থাকে অচেনা আগন্তুকের দিকে; এবং তাদের কেউ একটু নড়লোও না।

নবাগতটি লম্বা, হৃষ্টপুষ্ট মানুষ। তার ব্যবহারে, আচরণে, কিংবা অভিব্যক্তিতে ক্ষতিকর কোনো আভাস ছিলো না, নানদের অনুসরণ করে সে-ও নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো, শুধু তার চোখগুলো ঘরের চারদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগলো।

কাঠের তক্তার ওপর বিছানো দুটো খড়ের মাদুর দিয়ে বিছানার কাজ চালানো হয়। ঘরের মধ্যিখানে বসানো একটা টেবিলের ওপর দণ্ডায়মান একটা বাতিদানি, কয়েকটা থালা, তিনটা ছুরি আর একটা গোল রুটি। উনুনের ঝাঁঝরিতে জ্বলছে এক টুকরো আগুন। ঘরের কোণে গাদা করে রাখা কিছু কাঠ নির্জনবাসী মানুষগুলোর দারিদ্রের আরো সাক্ষী। আপনি তাকাবেন শুধু দেয়ালগুলোর রঙের আস্তরণের দিকে তাহলেই আবিষ্কার করতে পারবেন ছাদের করুণ অবস্থা, এবং ছাদের তলায় বৃষ্টির পানির তৈরি বাদামী রঙের সত্যিকারের জাল। একটা ধ্বংশাবশেষ, সন্দেহ নেই যে সেটা এ্যাবেই দ্য চেলিস-এর ধ্বংশযজ্ঞ থেকে বেঁচে গেছে, চিমনির ওপর সেটা একটা অলঙ্কারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তিনটা চেয়ার, দুটো বাক্সো, আর একটা রিকেট রোগীর মতো বাঁকা-কোকা চেস্টার-ড্রয়ার, আসবাব বলতে এই, কিন্তু উনুনের পাশে একট দরোজা নির্দেশ করে যে ওপারে আরো একটা কক্ষ আছে।

এ রকম ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে তাদের ভেতর ঢুকে পড়া এই লোকটা দ্রুত এই সংক্ষিপ্ত আবিষ্কার সেরে নিলো। সমবেদনার দৃষ্টিতে সে দুই মহিলার দিকে ঘুরলো; তাদের দিকে তাকালো উপকারীর দৃষ্টিতে, এবং মনে হলো, সে অন্ততঃ তাদের মতোই বিব্রত। কিন্তু এই আশ্চর্য নিরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, কারণ আগন্তুক উপলব্ধি করতে শুরু করলো, দেখলো দরিদ্র প্রাণী দু’টি কতোই না অনভিজ্ঞ ও অসহায়, এবং সে কথাগুলো মৃদুভাবে বলার চেষ্টা করলো।

‘ভদ্রমহিলাগণ, আমি শত্র“ হিসেবে আসিনি …’ সে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ থামলো, এবং বলতে থাকলো, ‘বোনেরা, যদি আপনাদের ওপর কিছু ঘটেই, বিশ্বাস করুন, তাতে আমার কোনো হাত নেই। আমি আপনাদের অনুগ্রহ প্রার্থনা করতে এসেছি।’ তারপরেও মহিলারা নির্বাক।

‘যদি আমি আপনাদের বিরক্ত করে থাকি …যদি …যদি আমি অনধিকার চর্চা করে ফেলি, খোলাখুলি বলছি, আমি চলে যাবো; কিন্তু আপনাদের অবশ্যই বোঝা উচিৎ যে আমি পুরোপুরিভাবে আপনাদের সেবা করতে এসেছি; যদি আমি আপনাদের কোনো কাজে আসি তাহলে আমাকে আপনাদের কাজে লাগাতে ভয় করার দরকার নেই। আমি, এবং একমাত্র আমিই, সম্ভবতঃ, আইনের উর্ধে, যেহেতু এখন কোনো রাজা নেই।’

কথাগুলোয় এতো আন্তরিকতা ছিলো যে সিস্টার আগাথা তড়িঘড়ি করে একটা চেয়ারের দিকে ইশারা করলো, যেনো সে তাদের অতিথিকে বসার জন্যে অনুরোধ করছে। সিস্টার আগাথা ল্যাঙ্গগঁ থেকে আসা মানুষ; তার আচরণ থেকে বোঝা যায় এক সময় সে চমৎকার সব দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলো, এবং রাজকীয় বাতাসে শ্বাস নিয়েছে। আগন্তুক অর্ধেকটা সন্তুষ্ট, অর্ধেকটা দুর্দশাগ্রস্ত হলো, যখন সে তার আমন্ত্রণ বুঝতে পারলো; মহিলারা না বসা পর্যন্ত সে বসলো না।

‘শপথ নিতে অস্বীকারকারী এক রেভারেণ্ড ফাদারকে আপনারা আশ্রয় দিয়েছেন, এবং অলৌকিকভাবে কার্মেলিতিস-এর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে এসেছেন …’

‘হোসান্না!’ সিস্টার আগাথা সোৎসাহে ফিসফিস করে উঠলো, আগন্তুককে থামিয়ে, কৌতুহলী চোখে তাকে পর্যবেক্ষণ করলো সে।

‘এটা সে নাম নয়, আমার মনে হয়.’ সে বললো।

‘কিন্তু, জনাব,’ সিস্টার মার্থা তাড়াতাড়ি বললো, ‘আমাদের এখানে কোনো পাদ্রী নেই, এবং …’

‘সেক্ষেত্রে আপনাদের আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিলো, এবং আপনাদের তত্ত্বাবধানে,’ সে মৃদু স্বরে উত্তর করলো, টেবিলের ওপর রাখা প্রার্থনা-পুস্তকটা নেয়ার জন্য হাত বাড়াতে বাড়াতে। ‘আমি মনে করি না যে আপনারা ল্যাটিন জানেন, এবং …’

সে থামলো; কারণ, দুই অসহায় নানের মুখে উদ্বেগের আতিশয্য দেখে তার ভয় হলো সে বোধ হয় খুব বেশি বলে ফেলেছে। তারা কাঁপছিলো, এবং চোখে অশ্র“ টলটল করছিলো।

‘ভয় করবেন না,’ সে মুক্ত মনে বললো। ‘আমি আপনাদের নাম জানি এবং আপনাদের অতিথিরও। আপনাদের দুর্দশার কথা আমি তিন দিন আগে শুনেছি এবং আপনাদের ভক্তি শ্রদ্ধেয় এ্যাবেই দ্য…’

‘হুশ্!’ সিস্টার আগাথা প্রায় কেঁদে ফেললো, তার হৃদয়ের সরলতায়, সে তার ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ধরলো।

‘আপনারা দেখছেন, সিস্টারগণ, যে, যদি আপনাদের ঠকাবার দুরভিসন্ধি আমার থাকতো, তাহলে আমি এতোক্ষণে তা করে ফেলতে পারতাম, একাধিকবার…’

একথায় পাদ্রী তার লুকোনোর জায়গা থেকে বেরিয়ে এলেন এবং তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।

‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, মশিয়েঁ, যে আপনি আমাদের ওপর নির্যাতনকারীদের একজন হতে পারেন,’ তিনি বললেন, আগন্তুকের উদ্দেশে, ‘এবং আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আমাকে নিয়ে আপনি কী করতে চান?’

প্রত্যেকটি কথায় পাদ্রীর মুখে যে পবিত্র আস্থা ও মহত্ত্ব ফুটে উঠলো তা একজন ঘাতককেও নিরস্ত্র করে ফেলতে পারতো। রহস্যময় আগন্তুক, যে দুঃখ ও হতাশার জীবনে উত্তেজনার উপাদান যোগ করেছে, মুহূর্তের জন্যে তাকালো ছোট্ট দলটির দিকে; তারপর সে পাদ্রীর দিকে ঘুরলো এবং বললো, যেনো আস্থা তৈরি করার জন্য, ‘ফাদার, একজন মহিমান্বিত ব্যক্তির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান উদযাপন করার জন্য, যার দেহ কখনো পবিত্র স্থানে সমাহিত হতে পারবে না…

অনিচ্ছাকৃতভাবে কেঁপে উঠলো যাজক। তখনো পর্যন্ত সিস্টারদের কেউ বুঝতে পারলো না আগন্তুক কার উদ্দেশে কথা বলছে; তারা ঘাড় টান করে বসে আছে, মুখ আগন্তুকের দিকে ঘোরানো, তাদের পুরো ভঙ্গিতে কৌতুহল। এর মধ্যে পাদ্রী আগন্তুককে খুঁটিয়ে দেখে নিলেন; লোকটার মুখমণ্ডলের উদ্বেগ এবং চোখের আকুল অনুরোধ ভুল নয়।

‘খুব ভালো,’ ফিরে এলেন যাজক। ‘মাঝরাতে এসো। যে অপরাধের কথা তুমি বলছ তার প্রায়শ্চিত্য করার জন্যে আমাদের সাধ্যে যতোটুকু কুলায় তা দিয়ে এই দাহ-সেবা উদযাপন করতে আমি প্রস্তুত।’

আগন্তুকের মধ্যে একটা শিহরণ বয়ে গেলো, কিন্তু একটা মিষ্টি এবং কোমল সন্তুষ্টি তার গোপন ক্ষোভকে প্রশমিত করলো। সে সশ্রদ্ধ ভাবে বিদায় নিলো, এবং তিনটি মহৎ হৃদয় তার অকথিত কৃতজ্ঞতা অনুভব করলো।

দু’ঘন্টা পরে সে ফিরে এলো এবং কুঠরির দরোজায় টোকা দিলো। মাদমোয়াজেল দ্য বোসাঁ তাকে পথ দেখিয়ে তাদের দীনহীন বাসস্থান দ্বিতীয় কক্ষে নিয়ে গেলো। সব কিছু প্রস্তুত ছিলো। সিস্টাররা পুরনো চেস্টার ড্রয়ারটা সরিয়ে রেখেছে দুই চিমনির মাঝখানে, এবং তার কোণাগুলো চমৎকার সবুজ রঙের সিল্ক কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। খোলা দেয়ালগুলো একেবারে উদোম লাগছিলো, কারণ তাতে একমাত্র যা ঝুলছিলো তা হলো আবলুশ কাঠ আর হাতির দাঁতের তৈরি ক্রুশ, যা দৃষ্টি আকর্ষক। চারটা সরু ছোট ছোট বেদি-মোমবাতি, যেগুলো সিস্টাররা বুদ্ধি করে মোম গলিয়ে স্ব-স্থানে বসিয়েছে, সেগুলো মৃদু মলিন আলো দিচ্ছিলো যার প্রায় সবটাই শুষে নিচ্ছিলো দেয়ালগুলো; কক্ষের বাকি অংশ অন্ধকার-ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে ছিলো। কিন্তু পবিত্র জিনিসগুলোর ওপর ঘনবদ্ধ মৃদু ঔজ্জ্বল্য দেখে লাগছিলো যেনো অসজ্জিত তীর্থস্থানের ওপর পতিত স্বর্গালোক জ্বলজ্বল করছে। মেঝে থেকে ভেঁপসা দুর্গন্ধ উঠছিলো। চিলেকোঠার ছাদের ঢং-এ তৈরি দু’দিকে ঢালু ছাদের ফাটলগুলো দিয়ে বরফ-শীতল বাতাস ভেতরে ঢুকছে। কোনো কিছুই তেমন অসাধারণ নয়; তারপরেও, সম্ভবতঃ, এই শোকাবহ অনুষ্ঠানের চেয়ে আর কিছুই তেমন জাঁকজমক হতে পারে না। একটা নীরবতা, তা এতোই গভীর যে রুট দ্য আলামাগনা সড়কের অস্পষ্টতম কণ্ঠস্বরও তারা শুনতে পাচ্ছিলো, তা রাতের এই মুহূর্তটিকে এক ধরনের রাজকীয় মহিমা দান করেছিলো; আর এই সেবার জাঁকজমক …দীনহীন পরিবেশের সঙ্গে প্রবল বৈসাদৃশ্যের সকল মোহনীয়তা … তৈরি করেছিলো এক সশ্রদ্ধ বিস্ময়।

ভেজা ইঁটের মেঝের মরণ-শীতের কামড় উপেক্ষা করে সিস্টাররা বেদির দু’পাশে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনায় রত, অন্যদিকে পাদ্রী, ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে, রতœখচিত সোনার পেয়ালা বের করলো; সন্দেহ নেই এটি এ্যাবেই দ্য চেলিস-এ লুটতরাজ থেকে রক্ষা পাওয়া পবিত্র পাত্রগুলোর একটি। রাজকীয় দানশীলতার নিদর্শন ঢাকনাওয়ালা পানপাত্র ছাড়াও, পবিত্র পিণ্ড বলি দেয়ার জন্যে মদ ও পানি প্রস্তুত রাখা আছে এমন দুটি গ্লাসে যা ছোটখাট পানশালায় ক্কচিত মেলে। কর্মসূচী নির্দেশিকার অভাবে পাদ্রী তার প্রার্থনা-পুস্তকটি বেদির ওপর স্থাপন করেছেন, এবং মাটির তৈরি একটি সাধারণ থালা রাখা আছে হাত ধোয়ার জন্যে যা বিশুদ্ধ এবং রক্ত দ্বারা কলুষিত নয়। এর সব কিছুই এমন বিপুল বিশাল, আবার এতো ছোট, দারিদ্র্যপীড়িত, অথচ মহান, পবিত্রতা এবং অপবিত্রতার এক মিশেল।

আগন্তুক দুই নানের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসার জন্য এগিয়ে এলো। কিন্তু পাদ্রী ক্রুশের পাত্রটিকে রেশমী কাপড় দিয়ে চারদিক থেকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছেন যে, পিণ্ডটিকে শেষকৃত্য-সেবা বলে দাগানোর আর কোনো পথ ছিলো না; এমন যেনো স্বয়ং ঈশ্বরই শোক করছেন। লোকটি হঠাৎ এটি লক্ষ্য করলো, এবং দৃশ্যটি তার কোনো ভয়ানক স্মৃতি জাগিয়ে তুললো, কারণ তার প্রশস্ত কপালে ঘামের বড়ো বড়ো ফোঁটা দেখা দিলো।

তারপর এই দৃশ্যের চার অভিনেতা রহস্যময় দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো; এবং তাদের আত্মারা একই ভাবে আলোড়িত হলো এবং নিজেদের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদান করলো যতোক্ষণ না সবাই বিস্ময় ও করুণার একই অনুভূতিতে আপ্লুত হলো। তাদের মনে হলো, রাজকীয় শহীদ, যার দেহাবশেষ কলিচুন দিয়ে ধ্বংশ করা হয়েছে, তিনি যেনো তাদের আকুল আহবানে এখন তাদের মাঝে দণ্ডায়মান একটা ছায়ার ছায়ার মতো, একজন রাজার সকল মোহনীয়তা সমেত। তারা মৃত ব্যক্তিটির জন্য বার্ষিকী পালন করছিলো যার দেহ পড়ে আছে কোথাও। ভাঙ্গা কাঠ এবং টাইলের ছাদের নীচে চার খ্রীষ্টান কফিন ছাড়াই শেষকৃত্যানুষ্ঠান করছে, ফ্রান্সের একজন রাজার আত্মার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা পেশ করছে। কোনো নিবেদন এর চেয়ে খাঁটি হতে পারে না। কোনো ভবিষ্যৎ-চিন্তা ছাড়াই অর্জিত বিশ্বাসের এক চমৎকার কাজ এটা। নিশ্চিত যে, এটা ঈশ্বরের দৃষ্টিতে মহিমান্বিত গুণাবলীর সমকক্ষতায় শীতল পানির পেয়ালার মতো। দুই দুর্বল নান ও পাদ্রীর পেশকৃত প্রার্থনা গোটা রাজতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে, এবং সম্ভবতঃ একই সঙ্গে, বিপ্লব প্রকাশিত হচ্ছে আগন্তুকের মধ্য দিয়ে, কারণ তার মুখে মনস্তাপের ছায়া এতো গভীর যে এটা না ভাবা অসম্ভব- সে এক সীমাহীন অনুশোচনার প্রতিজ্ঞা পালন করছে। পাদ্রী যখন ল্যাটিন ভাষায় শুরু করলো, ইন্দ্রোয়বু এ্যাদ অলতেয়ার দি, তখন অকস্মাৎ এক স্বর্গীয় প্রেরণা তাঁকে আপ্লুত করলো; তিনি হাঁটু গেড়ে বসা তিন মানবমূর্তির দিকে তাকালেন, খ্রীষ্টিয় ফ্রান্সের প্রতিনিধি তারা, এবং, যেনো কুঠরির দারিদ্র্য মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে, বললেন, ‘আমরা ঈশ্বরের পবিত্র ঘরে পৌঁছতে যাচ্ছি।’

এই কথাগুলো, রোমাঞ্চকর আন্তরিকতায় উচ্চারিত, নান ও আগন্তুকের মধ্যে পবিত্র বিস্ময়ের উদ্রেক করলো। এখানকার দরিদ্র আশ্রয়ে এই খ্রীষ্টানদের চোখের সামনে যেভাবে ঈশ্বর স্বয়ং আবির্ভূত হলেন রোমের সেইন্ট পিটার্স গীর্জার গম্বুজওয়ালা ছাদের নীচে তার চেয়ে বেশি মহিমান্বিত ভাবে তিনি দেখা দিতেন না; এটাও সে রকমই সত্যি যে ঈশ্বর ও মানবাত্মার মাঝখানে কোনো মাধ্যম অনাবশ্যক, এবং ঈশ্বরের সকল মহিমা খোদ তার কাছ থেকেই বিচ্ছুরিত হয়।

আগন্তুকের উৎসাহ ছিলো আন্তরিক। ঈশ্বরের চার বান্দার প্রার্থনা এবং রাজার সঙ্গে আবেগ মিলে তৈরি হয়েছে একই সনির্বন্ধ আবেদন। পবিত্র শব্দগুলো নিরবতার মধ্য দিয়ে অনুরণিত হচ্ছিলো স্বর্গীয় সঙ্গীতের মতো। এক সময়, আগন্তুকের চোখে অশ্র“ জমলো। এটা হলো প্যাতার নস্তার-এর সময়; কারণ পাদ্রী তখন ল্যাটিন ভাষায় একটা নিবেদন পেশ করছিলেন, এবং স্রোতারা সন্দেহাতীত ভাবে তা বুঝতে পারলো যখন তিনি বললেন: ‘এট রেমিট্টি স্কেলাস রেজিসাইডিস সিকাট লুডোভিকাস ইজ রেমিসিট সিমেটিপসি’ … রাজহত্যাকারীদের ক্ষমা করো যেমন লুই স্বয়ং তাদের ক্ষমা করেছিলেন।’

সিস্টাররা দেখলো দু’টি অশ্র“ধারা আগন্তুকের পুরুষালি গাল বেয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়লো। তারপর মৃতের জন্যে অনুগ্রহ আবৃত্তি করা হলো; ‘দ্য ডোমিনি স্যালভাম ফ্যাক রিজেম’ এমন নীচুগ্রামে পঠিত হলো যে তা বিশ্বাসী রাজসমর্থককের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছলো, কারণ তারা ভাবলো, যে শিশু-রাজার জন্যে তারা প্রার্থনা করছে তিনি তখনো শত্র“দের হাতে জিম্মি; এবং আগন্তুকের শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেলো, যেহেতু তার মনে হলো একটা নতুন অপরাধ সংঘটিত হবে, এবং না চাইলেও তাকে তাতে অংশ নিতে হবে।

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে এলো। পাদ্রী সিস্টারদের দিকে ইঙ্গিত করলেন, এবং তারা উঠে চলে গেলো। যেই মাত্র আগন্তুকের সঙ্গে তিনি একাকী হয়ে গেলেন, তিনি তার দিকে এগিয়ে গেলেন গম্ভীর, বিনম্র মুখে, এবং পিতৃসুলভ কণ্ঠে বললেন: ‘পুত্র, যদি তোমার হাত রাজকীয় শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে থাকে, তাহলে তা আমার কাছে স্বীকার করো। এমন কোনো পাপ নেই যা ঈশ্বর মাফ করেন না, যদি কেউ বিবেকদগ্ধ প্রায়শ্চিত্ত করে, যেমন আন্তরিক ও মর্মস্পর্শী অনুশোচনা তুমি করছ।’

প্রথম কথাগুলোয় লোকটা আতঙ্কে কেঁপে উঠলো। তারপর সে আত্মসংবরণ করলো, এবং বিস্ময়বিদ্ধ পাদ্রীর দিকে শান্তভাবে তাকালো। ‘ফাদার,’ সে বললো, এবং অন্যজন তার কণ্ঠের কাঁপুনি টের পেতে ভুল করলো না, ‘সেই রক্তপাতের জন্যে আমার চেয়ে নির্দোষ আর কেউ নয় …’

‘আমি তোমার কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য।’ পাদ্রী বললো। সে মুহূর্তখানেক থামলো, এবং পুনরায় তার মনস্তাপ পরখ করে দেখলো। কিন্তু, তার সামনের লোকটি সেই কনভেনশনের একজন সদস্য, সেই ভোটারদের একজন যারা নিজেদের মাথা রক্ষা করার জন্যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন একজনের সঙ্গে যিনি পবিত্র ও ঈশ্বরের প্রতিনিধি: এই ভাবনা ক্রিয়াশীল হওয়ায় পাদ্রী আবার গম্ভীর ভাবে বললেন: ‘মনে রেখো, হে পুত্র আমার, যে, সেই গুরুতর অপরাধ-কর্মে সক্রিয় অংশ না নেয়াই যথেষ্ট নয়; এই সত্য তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করে না। যে লোকদের দায়িত্ব ছিলো রাজাকে রক্ষা করা অথচ তারা তাদের তরবারি খাপে পুরে রেখেছিলো, তাদেরকে স্বর্গের প্রভুর কাছে মহা অপরাধের বোঝা নিয়ে দাঁড়াতে হবে …আহ! হ্যাঁ,’ তিনি আরো বললেন, পটুতার সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে, ‘বাস্তবিকই গুরুতর! … কারণ কিছুই না করে তারা সেই বিস্ময়কর শয়তানির সহযোগী হয়ে গেছে …’

‘কিন্তু আপনি কি মনে করেন যে অপ্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের জন্য শাস্তি দেয়া হবে?’ হতভম্ব দৃষ্টিতে আগন্তুক জিজ্ঞেস করলো। ‘বেসরকারী সৈন্যটিকেও অভিযানে ডাকা হয়েছিলো… সে কি প্রকৃত পক্ষে দায়ী?’

পাদ্রী দ্বিধাগ্রস্ত হলেন। তা দেখে আগন্তুক খুশি হলো; কারণ সে রাজভক্ত ব্যক্তিটিকে উভয়সঙ্কটে ফেলে দিতে পেরেছে, একদিকে পরোক্ষ আনুগত্যের ধারণা (রাজতন্ত্রের প্রবক্তারা মনে করে আনুগত্যই সামরিক আইনের প্রথম নীতি), এবং অন্যদিকে সমান গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ যা একজন রাজার প্রতি শ্রদ্ধাকে ধর্মীয় বিষয়ে পরিণত করে। পাদ্রীর সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেই সে সন্তোষজনক সমাধান পেতে চাচ্ছিলো ঐ সন্দেহগুলোর যা তাকে পীড়ন করছে। জ্যনসেনিস্ট যাজকের দীর্ঘ গভীর ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্যে সে বললো: ‘রাজার আত্মার সদগতি এবং আমাকে বিবেক-দংশন থেকে মুক্ত করার জন্যে আপনি এইমাত্র যে শেষকৃত্যানুষ্ঠান করলেন তার বিনিময়ে আপনাকে পারিশ্রমিক দেবার প্রস্তাব করতে লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। অপরিমাপযোগ্য মূল্যের জন্য একমাত্র সম্ভাব্য বিনিময় হচ্ছে সে রকমই অমূল্য কিছু দেয়া। একটা পবিত্র পুরানিদর্শন উপহার গ্রহণ করে আপনি কি সন্তুষ্ট হবেন, মশিয়েঁ? এমন একদিন হয়তো আসবে যেদিন আপনি এর মূল্য বুঝতে পারবেন।’ কথা বলার ফাঁকেই আগন্তুক একটা বাক্সো হাতে নিলো; সেটা খুবই ছোট আর হালকা। পাদ্রী সেটা যন্ত্রের মতো গ্রহণ করলো, লোকটির বিনম্র কথা, তার কণ্ঠের সুর, এবং যে রকম শ্রদ্ধার সঙ্গে সে উপহারটি এগিয়ে ধরলো, তাতে সে অবাক না হয়ে পারলো না। লোক দু’জন একসঙ্গে প্রথম কক্ষটিতে ফিরে গেলো। সিস্টাররা তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলো।

‘এই বাড়িটা, যেটায় আপনারা বাস করছেন, তার মালিক দোতলার বাসিন্দা মিউকিয়াস স্কেভোলা,’ সে বললো। ‘দেশপ্রেমের জন্যে সমাজে তার সুনাম আছে, কিন্তু বাস্তবে সে বুরবনদের লোক। সে তার প্রভু প্রিন্স দ্য কন্টি-র শিকারীর চাকরী করতো, এবং সে তার সব কিছুর জন্যে তার কাছে ঋণী। এই বাড়িতে যতো দিন আপনারা থাকবেন, ফ্রান্সের যে কোনো জায়গার তুলনায় এটা আপনাদের জন্যে হবে অধিকতর নিরাপদ। বাইরে যাবেন না। ধর্মভীরু লোকরা আপনাদের প্রয়োজন মেটাবে, এবং আপনারা অপেক্ষাকৃত সুদিনের জন্যে অপেক্ষা করতে পারেন। পরের বছর, ২১শে জানুয়ারী,’ … সে এ কথা বলার সময় এক অনিচ্ছাকৃত শিহরণ লুকোতে পারলো না, … ‘পরবর্তী বছর, যদি আপনারা ততো দিন পর্যন্ত এই নির্জন আশ্রয়ে অবস্থান করেন, আপনার সঙ্গে প্রায়শ্চিত্য সভা উদযাপন করতে আমি আবার আসবো …’

সে চলে গেলো, মাথা নোয়ালো তিনজনের উদ্দেশে, উত্তরে তারা একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না, দারিদ্র্যের নিদর্শন চিলেকোঠার দিকে শেষ বারের মতো দৃষ্টি বুলিয়ে সে অন্তর্হিত হলো।

এ রকম একটি অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা নিষ্পাপ নানদের জীবনে রোমান্সের কৌতুহল সৃষ্টি করলো। তাই, যখনি শ্রদ্ধেয় যাজক তাদেরকে রহস্যজনক উপহারের খবর দিলো, তখনি সেটাকে টেবিলের ওপর রাখা হলো, এবং চর্বি-ডোবা বাতির মৃদু আলোয় তিনটি উদ্বিগ্ন মুখে এক অবর্ণনীয় অনুসন্ধিৎসা ফুটে উঠলো। মাদমোয়াজেল দ্য ল্যাঙ্গিস বাক্সোটা খুললো, এবং লিনেন কাপড়ের খুবই সুন্দর একটা রুমাল দেখতে পেলো, সেটা ঘামে ভেজা; ভাঁজ খুললে তাতে কালচে রং দেখা গেলো।

‘রক্ত!’ আঁৎকে উঠলেন পাদ্রী।

‘এতে রাজকীয় মুকুট আঁকা!’ সিস্টার আগাথা কেঁদে ফেললো।

মূল্যবান স্মৃতিচিহ্নটি পড়ে গেলো, নারী দু’জন, আতঙ্কে হতবুদ্ধি, সেটিকে পড়ে যেতে দিলো। রহস্যটি এমন যে তাদের মতো সরল মানুষের কাছে আগন্তুক লোকটি ব্যাখ্যাতীত হয়ে উঠলো; আর পাদ্রীর ব্যাপারটা হলো এ রকম যে, সেদিনের পর থেকে আর কখনো তিনি এটি বোঝার চেষ্টাও করেননি।

বন্দীদের বুঝতে খুব বেশি দিন লাগলো না যে, মহা আতঙ্ক সত্ত্বেও, কোনো ক্ষমতাশালী লোক তাদের জন্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। এটা বোঝা গেলো যখন তারা জ্বালানী কাঠ আর খাদ্যদ্রব্য পেতে লাগলো; পরে সিস্টাররা জানতে পারলো যে তাদের রক্ষাকর্তা একজন নারীর পরামর্শে তাদের কাছে লিনেন রুমালটি পাঠিয়েছে, আর দিয়েছে কিছু পোশাক যা তারা পরতে বাধ্য হয়েছে, যা পরে তারা বাড়ির বাইরে যেতে পারে, যে অভিজাত পোশাক দেখে কেউ মন্তব্য করবে না। কিছু দিন পরে মিউকিয়াস স্কিভোলা তাদেরকে দু’টি নাগরিক কার্ড দিলো: এবং মাঝে মাঝে বিকল্প পথে পাদ্রীর নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় খবরাদি আসতে লাগলো। বিপদসঙ্কেত এবং পরামর্শগুলো এমন যথা সময়ে আসতো যে সেগুলো পাঠানো একমাত্র তেমন কারো পক্ষেই সম্ভব রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা যার আয়ত্তাধীন। এবং, এক সময় যখন প্যারিসে দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিলো, তখন অদৃশ্য হাতের কল্যাণে জীর্ণ চিলেকোঠায় নির্বাসিত মহিলাদের কাছে ‘শাদা রুটি’র রেশন এসে পৌঁছতে লাগলো। তারা আরো কল্পনা করলো যে, নাগরিক মিউকিয়াস স্কিভোলা পরোপকারিতার রহস্যজনক হাতিয়ার মাত্র, যদিও সে সর্বদাই উদ্ভাবনীশক্তি সম্পন্ন, এবং বুদ্ধিমান।

সম্ভ্রান্ত মহিলাদের আর সন্দেহ রইলো না যে ১৭৯৩ সালের ২২শে জানুয়ারীর রাতে প্রায়শ্চিত্য সভায় যোগদানকারী আগন্তুকই তাদের রক্ষাকর্তা; এবং তাদের মধ্যে তার জন্যে এক প্রকার ভক্তি জন্মালো। সে ছিলো তাদের একটা ভরসা; তার জন্যেই তারা বেঁচে ছিলো। তারা তাদের প্রার্থনায় তার জন্যে বিশেষ আবেদন যোগ করলো; দিন-রাত ধার্মিক মানুষগুলো তার সুখ, উন্নতি ও নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা করতে লাগলো; ঈশ্বরের কাছে আকুল আবেদন জানাতে লাগলো যেনো তার পথ থেকে সকল বিপদ দূরীভূত হয়, যেনো শত্র“রা তার কোনো ক্ষতি করতে না পারে, যেনো একটা দীর্ঘ ও শান্তিময় জীবন সে যাপন করতে পারে। এবং বলা চলে, এই নিত্য নতুন কৃতজ্ঞতা নিবেদনের মধ্যে দিন দিন একটা কৌতুহল জেগে উঠতে লাগলো। তার প্রথম অকস্মাৎ আগমন পরিস্থিতি নিয়ে তারা কথা বললো, তাদের অনুমান শেষহীন; তাদের মনকে ভিন্নমুখী করে দিয়ে আগন্তুক তাদের আর একটি লাভ করে দিয়েছে। আবার, এবং বারবার, তারা বললো, পরে, তার প্রতিশ্র“তি মোতাবেক, যখন তিনি ষোড়ষ লুই-এর দুঃখদায়ক মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে আসবেন, তখন তিনি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে পারবেন না।

আকুল আকাক্সক্ষার রাতটি অবশেষে এলো। মধ্য রাতে পুরনো কাঠের সিঁড়িতে আগন্তুকের ভারি পদধ্বনি শোনা গেলো। তার আগমন উপলক্ষে তারা তাদের ঘরটি সাধ্য মতো সজ্জিত করেছে; বেদি প্রস্তুত, এবং এবার দরোজা খুলে রাখা হয়েছে, আর দুই সিস্টার বাইরে সিঁড়ির মুখে অপেক্ষমাণ রাস্তায় আলো দেখানোর জন্যে। দ্রুত তাদের উপকারককে অভ্যর্থনা জানাতে মাদমোয়াজেল দ্য ল্যাঙ্গিস এমনকি সিঁড়ির কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেলো।

‘আসুন,’ সে বললো, দরদময়, কম্পিত কণ্ঠে, ‘ভেতরে আসুন; আমরা আপনার জন্যে প্রতীক্ষা করছি।’

সে তার মুখ তুলে তার দিকে দুর্বোধ্য ভাবে তাকালো, এবং কোনো উত্তর করলো না। সিস্টারের মনে হলো বরফের পোশাক যেনো পড়লো তার ওপর, আর কিছু বলতে পারলো না সে। তার দৃষ্টির সামনে তাদের হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা ও কৌতুহলের আলো নিভে গেলো। তাদের কাছে যতোটা মনে হলো সম্ভবতঃ ততোটা শীতল, বাককৃচ্ছ, কিংবা কঠোর সে ছিলো না, তারা মানসিক ভাবে এতোটাই উদ্দীপ্ত হয়ে ছিলো যে তারা তাদের বন্ধুত্বের অনুভূতি উজাড় করে দেয়ার জন্যে তৈরি হয়ে ছিলো। কিন্তু তিন অসহায় বন্দী বুঝতে পারলো যে লোকটি তাতের কাছে আগন্তুক হয়েই থাকতে চায়; এবং সেটা তারা মেনে নিলো। পাদ্রীর মনে হলো তার আগমন উপলক্ষে তাদের প্রস্তুতি দেখে লোকটির ঠোঁটে হাসি দেখা গেলো, কিন্তু শিগগিরই তার ভুল ভাঙলো। সে সভা শুনলো, প্রার্থনা পাঠ করলো, তার জন্যে সাজিয়ে রাখা সামান্য কিছু খাবার গ্রহণের জন্য মাদমোয়াজেল দ্য ল্যাঙ্গিসের অনুরোধ ভদ্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করলো, এবং তারপর চলে গেলো।

৯ই থারমিডরের (ফরাশি বিপ্লব পঞ্জিকার ১১তম মাস) পর, সিস্টাররা এবং এ্যাবেই দ্য মারোলেস ন্যুনতম বিপদ ছাড়াই প্যারিসে যেতে পারলেন। প্রথমে যখন যাজক বাইরে বেরুলেন, তিনি দ্য কুইন অফ রোজেস লেখা সুগন্ধিবিক্রেতার দোকানে গেলেন, সেটা রাজকীয় সুগন্ধিবিক্রেতা সিটিজেন র্যাগন ও তার স্ত্রীর। র্যাগনরা রাজতন্ত্রের বিশ্বস্ত ভক্ত ছিলো; বিপ্লববিরোধী নেতারা এদের মাধ্যমে রাজপুত্রদের সাথে এবং প্যারিসের রাজতন্ত্রী কমিটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো। যাজক, সে সময়ের সাধারণ পোশাক পরিহিত, দাঁড়িয়ে ছিলো দোকানের চৌকাঠের ওপর … দোকানটা অবস্থিত সেইন্ট রচ এবং রিউ দেস ফ্রনদুরস-এর মাঝখানে …তিনি দেখলেন রিউ সেইন্ট অনার-এ মানুষের ভিড় এবং সামনে এগুনো যাচ্ছে না।

‘কী হয়েছে?’ মাদাম র্যাগনকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

‘কিচ্ছু না,’ সে বললো; ‘শিরোচ্ছেদের জন্যে জল্লাদ বন্দীদের নিয়ে যাচ্ছে। আহ! আমরা এ দৃশ্য গত বছর প্রায়ই দেখেছি; কিন্তু আজ, ২১শে জানুয়ারীর বার্ষিকীর চার দিন পর, এই ভয়ঙ্কর মিছিল দেখে কেউ দুঃখ পায় না।’

‘কেন?’ যাজক প্রশ্ন করলো। ‘এটা কোনো খ্রীষ্টানের মতো কথা হলো না।’

‘এহ! এবার শাস্তি হচ্ছে রবেসপিয়েরের সঙ্গীদের। তারা যতো দিন পেরেছে নিজেদের রক্ষা করেছে, কিন্তু নির্দোষ লোকগুলোকে তারা যেখানে পাঠিয়েছে এবার তাদের নিজেদের পালা এসেছে সেখানে যাবার।’

জনতার ঢল নেমেছে বন্যার মতো। যাজক, কৌতুহল চাপতে না পেরে, মাথাগুলোর ওপর দিয়ে তাকালেন, এবং দেখতে পেলেন বন্দীবাহী গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটি যে তিন দিন আগে তাদের চিলেকোঠায় প্রায়শ্চিত্য সভায় যোগ দিয়েছিলো।

‘কে ও?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি; ‘কে ঐ লোকটা, যে …’

‘ঐ লোকটাই জল্লাদ,’ মিস্টার র্যাগন উত্তর দিলো, উচ্চারণ করলো ঘাতকের সেই উপাধিটা …এগজিকিউটিয়্যার দেস হটেস উর্ভস … যা সে পেয়েছিলো প্রশাসনযন্ত্রের কাছ থেকে।

‘ওহ! মাই ডিয়ার, মাই ডিয়ার! মিস্টার এ্যাবেই যে মরে যাচ্ছে!’ বৃদ্ধা মাদাম র্যাগন চিৎকার করে উঠলো। সে ভিনেগারের ফ্লাস্ক ধরলো, এবং বৃদ্ধ পাদ্রীর হুঁশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলো।

‘শহীদ হতে যাওয়ার সময় রাজা তার কপাল মুছেছিলেন যে রুমালে সেটাই বোধ হয় সে আমাকে দিয়েছে,’ বিড়বিড় করে বললেন তিনি। ‘… হায় রে অসহায় মানুষ! … গোটা ফ্রান্স খুঁজে যখন একটা হৃদয়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন তা ছিলো ইস্পাতের ফলার মধ্যেই …’

সুগন্ধি-বিক্রেতারা ভাবলো দুর্ভাগা যাজক রাগে প্রলাপ বকছেন।