হিন্দুস্থানী রিমোট কন্ট্রোলে ওয়ানওয়ে রাজনীতি

Oliullah Noman
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ওয়ানওয়েতে। তা ও আবার অদৃশ্য জায়গা থেকে রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ন্ত্রিত। ৫ জানুয়ারীর ভোটার বিহীন নির্বাচনের আগে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খোরশিদ তাঁর দেশের একটি পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা এবং ভারতের মতপার্থক্যের বিষয়টি উঠে আসে। তখন সালমান খোরশিদ জানিয়েছেন ভারতের চোখে বাংলাদেশ দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে আমেরিকার প্রতি। ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে কেমন দেখায় সেই দৃশ্যের কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে ইদানিং।

আওয়ামী লীগ চাইলে সভা-সমাবেশ করা যাবে। আওয়ামী লীগ না চাইলে সভা-সমাবেশ করা যাবে না। আওয়ামী লীগ চাইলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অফিস খোলা যাবে। আওয়ামী লীগ না চাইলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অফিস খোলা যাবে না। আওয়ামী লীগ চাইলে কারাগারে আটক বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের জামিন মিলবে। আওয়ামী লীগ না চাইলে আদালতে জামিন না মঞ্জুর হবে। আওয়ামী লীগ চায়নি, তাই ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমক্রেসি সফল হয়নি। সফল হয়নি কথাটা ভূল। একেবারে নিষ্ফল বলা যায়। বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির গেইটের সামনে বালু ভর্তি ট্রাকের সারি। অবরুদ্ধ করে রাখা হয় টানা ১৫ দিন বিরোধী নেত্রীকে। ভারতের চোখে বাংলাদেশের রাজনীতির কিঞ্চিৎ চিত্র এটি।

দেশের কোন প্রান্ত থেকে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকামুখি একটি মিছিলও দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগ চেয়েছে বলেই ২০ জানুয়ারী সোমবার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সমাবেশ করতে পেরেছে ১৮ দলীয় জোট। তাও আবার আওয়ামী লীগের প্রেসকিপশন অনুযায়ী ১৮ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত একটি দলকে বাদ দিয়ে। একটি দলের অনুপস্থিতি নিয়ে নানা কথা চাউড় হয়েছে দেশে-বিদেশে। ১৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে জোটের রাজনীতি। হঠাৎ করে একটি দলের অনুপস্থিতি দৃশ্যকটু লাগারই কথা। নানা প্রশ্ন তৈরি হবে, জনমনে বিভ্রান্তির জাল বিস্তার করবে এটাই স্বাভাবিক। দিল্লী ওয়ালারা এটাই চায়। ১৯৯৫-৯৬ সালে একবার এমনটা হয়েছিল। ভারত ও আওয়ামী বিরোধী ভোটে ফাঁটল ধরানো হয়েছিল তখন। এই সুযোগে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ১৪৭ সীটে বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি এবং জাসদ রব-এর সমর্থনে সরকার গঠন করেছিল তখন। ১৯৯৬ সালে ভোটের এই ফাঁটল না থাকলে হয়ত বা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ভিন্ন হতো। আজকের চিত্র এরকম হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো না। আবারো সেই ফাঁটল চায় হিন্দুস্থান। ভোট এবং জোটের শক্তি খন্ডিত করতে চায়। যাতে ওয়ানওয়ে রাজনীতি বড় ধরনের কোন বিড়ম্বনায় না পড়তে হয়।

একমুখি পথে উঠলে গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলে। বিপরীত দিক থেকে গাড়ি আসার কোন সুযোগ থাকে না। তেমনি বাংলাদেশের ওয়ানওয়ে রাজনীতির চালক এখন শেখ হাসিনা। সামনে বড় ধরনের কোন গতিরোধক ইঙ্গিত নেই। রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে হিন্দুস্থান থেকে। যেমনটা বলেছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমান খুরশিদ। হিন্দুস্থানের চোখেই সাম্প্রতিক বাংলাদেশকে দেখছে বিশ্ববাসী। ভোটার বিহীন নির্বাচন। বিশ্ব রেকর্ড গড়া অনুপস্থিতি। ৫০টির মত কেন্দ্রে কোন ভোটার যায়নি। খাস হিন্দুস্থানপন্থি পত্রিকা দৈনিক সমকালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৪৩ কেন্দ্রে কোন ভোটার যায়নি। একশত কেন্দ্রে ভোট পড়েছে মাত্র ৫০-এর নিচে। এক হাজার কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১০০এর নিচে। আড়াই হাজার কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ২০০এর নিচে। শেখ হাসিনার নিজের জেলা গোপালগঞ্জে ভোট পড়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। তারপরও হিন্দুস্থানী চোখে রকিব কমিশনের তথ্য হলো ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই হলো হিন্দুস্থানী চোখে বাংলাদেশের ভোটের দৃশ্য।

৫ জানুয়ারীর পর ওয়ানওয়ে রাজনীতির হানিমুন পিরিয়ড চলছে এখন। হানিমুন পিরিয়ডেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ গুলো সেরে নিতে চায় তারা। এরশাদের ভেলকিবাজি, আর রওশনের ক্যারিশমায় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের গর্বে। এরশাদ এবং রওশনকে নিয়ে রাজনীতির আলোচনা করা আর অযথা সময় নস্টের মাধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ভোট বর্জনাকারীদের দাবী অনুযায়ী ৫ ভাগ ভোটারের অংশ গ্রহনের নির্বাচনে বিজয়ী সরকার জাতিকে একের পর এক লাশ উপহার দিচ্ছে হানিমুন পিরিয়ডে। রাজনৈতিক বিরোধী নেতাদের টার্গেট কিলিং-এর মাত্রা বেড়েছে আগের ধরাবাহিকতায়। বরং এখন সেই কিলিং-এর মাত্রা ভিন্নরুপ ধারন করেছে। ধরে নেয়ার পর যেখানে সেখানে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। বাড়ছে লাশের স্তুপ।

অবরোধ আন্দোলনের সময় নীলফামারিতে আসাদুজ্জামান নূরের গাড়ি বহরে হামলা হয়েছিল। সেই হামলার জের ধরে দায়ের হওয়া মামলার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় নম্বরে থাকা আসামী ৩ জন ইতোমধ্যে খুন হয়েছেন। তাদেরকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে খুনের পর লাশ ফেলে রাখে। একই ভাবে মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারিকে ধরে নিয়ে খুন করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সীতাকুন্ডে এক শিবির নেতাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে যাওয়ার ২ দিন পর রাস্তার পাশে গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। খুলনায় ১৩ বছরের এক স্কুল ছাত্রকে রেহাই দেয়া হয়নি। প্রাণ রক্ষার জন্য পালিয়ে চিংড়ি ঘেরে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখান থেকে ধরে এনে খুন করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ২১ দিনে এভাবে ৫৭জন প্রাণ হারায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখতে এসব হত্যাকান্ডকে হিন্দুস্থান পন্থি মিডিয়ায় প্রচার করা হয় রাজনৈতিক সহিংসতা হিসাবে। এসব হত্যাকান্ডে মানবতা বলতে কিছু নেই।

মানবাধিকার বেপারীরা একেবারে নীরব। হিন্দুস্থানের চোখে দেখতে হলে যাদের খুন করা হচ্ছে তাদের মানবতা নেই। নতুবা নীরব থাকা কথা নয়। সামান্য কিছুতে যারা হৈ চৈ করতো, মানবাধিকার নিয়ে যাদের চিৎকারে কান ঝালাপালা করতো তাদের এখন দেখাই যায় না। হিন্দুস্থানী চশমা তাদের চোখে। তাই এখন যারা নিহত হচ্ছেন, যাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে এখানে-সেখানে তারা মানুষ নন।

হানিমুন পিরিয়ডে সরকার আরেকটি বিষয় জানান দিয়েছেন। ওয়ান ওয়ে রাজনীতির কোন সমালোচক প্রকাশ্যে রাখা হবে না। ওয়ান ওয়েতে চলার পথে কোন বিঘœ যাতে না ঘটে সেই সতর্ক দৃস্টি রয়েছে। অর্থাৎ হিন্দুস্থানের চোখ দিয়ে দেখতে হবে বাংলাদেশের মিডিয়াকেও। এজন্য সম্প্রতি শেখ হাসিনার দীর্ঘ ৮ বছরের সঙ্গী দৈনিক ইনকিলাব বন্ধ করে দেয়া হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার এক পাশে ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, আরেক পাশে নাস্তিক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বসা ছিলেন এক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল এ এম এম বাহাউদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ জমিয়তুল মোদাররেছিন। উপলক্ষ্য ছিল পক্ষ শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানো। শেখ হাসিনার সরকার এ এম এম বাহাউদ্দিনের দাবী অনুযায়ী বাংলাদেশে আরবী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইন পাস করেন। ওই অনুষ্ঠানে জমিয়তুল মোদাররেছিনের অন্যতম নেতা এবং দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক রুহুল আমিন খান শেখ হাসিনাকে ইসলামের একজন বিশেষ খাদেম হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছিল শেখ হাসিনা, এ এম এম বাহাউদ্দিন এবং নূরুল ইসলাম নাহিদ সহ সকলে হাত তুলে মোনাজাত করছেন। সেদিনের পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী অনুষ্ঠানে জমিয়তুল মোদাররেছিনের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ইসলামের খাদেম হিসাবে আখ্যায়িত করে ধন্যবাদ দেয়া হয়। এরকম সুন্দর দৃশ্যের পরও ইনকিলাব বন্ধ করে দেয়ার ঘটনায় অবাক লেগেছে। স্বার্থের দ্বন্দে দীর্ঘ ৮ বছরের সুন্দর সংসার-এ হয়ত: অমিল হয়েছে। কিন্তু কাল বিলম্ব না করে শেখ হাসিনা ইনকিলাব বন্ধ করে দিয়েছেন। জানান দিয়েছেন যত সম্পর্কই থাকুক কোন সমালোচনা সহ্য করা হবে না। সব দেখতে হবে হিন্দুস্থানের চোখ দিয়ে।

২০০৪ সাল থেকেই ইনকিলাব শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। ইনকিলাবের প্রতিষ্ঠা কালীন থেকে সেখানে কর্মে থাকা অনেক সাংবাদিক চাকুরিচ্যুত হয়েছেন তখন। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে বাধ্যতা মূলক ছুটির নামে অপসারণ করা হয় প্রতিষ্ঠা কালীন অনেক সাংবাদিক। তাদের জায়গায় নিয়োগ দেয়া কট্রর আওয়ামী পন্থি সাংবাদিকদের। সেই কট্রর আওয়ামী পন্থি সাংবাদিকদের নেতৃত্বে ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন, নির্বাহী সম্পাদক রুহুল আমিন খান সহ একটি প্রতিনিধি দল ২০০৪ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার সঙ্গে সুধা সদনে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকেই শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনকিলাবের দহররম মহররম ছিল। কিন্তু এত দহররম মহররমের পরও সিলগালা হল ইনকিলাবের ছাপাখানা। এই ঘটনায় ওয়ান ওয়ে রাজনীতি অশুভ ইঙ্গিত দেয় জাতিকে। যার সঙ্গে যত দহরম মহররম-ই থাকুক, ওয়ান ওয়ে রাজনীতির পথে কোন কাঁটা থাকবে না। সেটাই সাফ জানিয়ে দেয়া হল ইনকিলাব ছাপাখানা সিলগালা করার মাধ্যমে।

এর আগে দৈনিক আমার দেশকে ২০১০ সালের ১ জুন একবার বন্ধ করা হয়। তখন আইনি লড়াই করে আবার প্রকাশনায় ফিরে আসে আমার দেশ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আবারো কৌশলে বন্ধ করা হয় আমার দেশ। ২০১০ সালের মত আর ভূল করেনি। এবার সরাসরি পুলিশি অ্যাকশন। ছাপা খানায় তালা লাগিয়ে দেয়া হল। বাইরে কোথায়ও ছাপতে দেয়া হচ্ছে না। একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ইনকিলাবের ক্ষেত্রে। ইনকিলাবেও ছাপা খানায় তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। ডিক্লারেশনে কোন রকমের ঝামেলায় যাওয়া হয়নি। ডিক্লারেশন ঝামেলায় গেলে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ থাকে। এখানে সোজা সাফটা জোর যার মুল্লুক তার। পুলিশ প্রেসে তালা ঝুলিয়ে দিল। ব্যাস, এক ওষুধে রোগ সারা। পুলিশি অ্যাকশনে সুইচ অপ করা হয়েছে দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশনের।

ওয়ান ওয়ে রাজনীতির আরেক কৌশল হলো উপজেলা নির্বাচন। হানিমুন পিরিয়ডে সরকার উপজেলা নির্বাচন সেরে নিতে চায়। দেখে শুনে যা মনে হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনে না গেলেও উপজেলা নির্বাচনে অসহায় আত্মসমর্পনের পথে যাচ্ছে ১৮ দলীয় জোট। সেই প্রস্তুতি দেখে ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ বলছেন বিএনপি লোকাল ট্রেনে উঠছে। কেউ বলছেন থুথু ফেলে সেটাকে চেটে খেয়ে নাকে খত দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম দিকে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট স্থানীয় নির্বাচনে সরাসরি অংশ নেয়নি। শেষ দিকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তাতে রেজাল্ট খারাপ আসেনি। যেসব সিটি কর্পোরেশনে সরাসরি অংশ নেয়নি সেখানেও বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। উপজেলায়ও সেই আশা রয়েছে ১৮ দলীয় জোটের।