আসমানের দিঘি

freedom of joy by madart megan
শুরু হলো রহিমের নতুন জীবন। সে এখন ঝাঁকের কই। যেন থাডার পড়েছে আর ধানের গন্ধমাখা জীবন থেকে উঠে আসতে হয়েছে তাকে। খুব একলা সে। সারা দিন দাঁড়িয়ে চাকরি করে।

গার্মেন্টসের মেয়েগুলোকে মাঝেমধ্যে মনে হয় ধানগাছ। কখনো লাউয়ের ডগা, কখনো বা ঝিঙে ফুল। সে প্রায় ভুল করে। ভুল করে ধানগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সুপারভাইজারকে মনে হয় ধানের পোকা। তাকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। রাতে ঘুমের ঘোরে বিষ খোঁজে। দিনে জড়িয়ে যায় আরও বেশি পরিশ্রমে। মনে মনে পান্তাভাত খায়, মায়ের বকুনি খায় আর ধান ফুলের গন্ধ শুঁকে দিন পার করে।

নিজেকে ইদানীং ধানগাছ মনে হয়। ধানগাছ ঠিকই কিন্তু এখনো ফুল আসেনি। মনের মধ্যে ধানের শাঁস আর আঁশ আসছে। মন কোণঠাসা হলেও শহরের ঢং ভালো লাগছে। ওকে দেখার পরই পাল্টে গেল সব।

চাষার বেটা চাষা সে। বাবা অনেক কষ্টে ম্যাট্রিক পাস করিয়েছে। পড়তে পড়তে চাষবাস থেকে মন উঠে গিয়েছিল। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল, সে কিছু একটা হবে। অথচ সে কী করল? মা ঠিকই বলত, তার মধ্যে একটা হারামি আছে।

তারপর তো রুনার বাচ্চা এসে গেল। তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ আসে। কিন্তু সে পালিয়ে পালিয়ে থাকে। শেষে একদিন শহরে চলে গেল। যাওয়ার সময় মা যা বলেছিল তা এ রকম: ‘শোন, শয়তানের তো কোনো জাত নাই। যদি মানুষ হতে পারিস তাহলে আসিস। না হয় মুখ দেখাবি না।’—বলে দৃঢ় পদক্ষেপে ভেতরের ঘরে চলে যায়।

উহ্! কী ঘৃণা। নিজেকে চিটা ধান মনে হতো। মনে হতো, পোকায় খাওয়া ধানপাতা। কীভাবে যে একেকটি দিন পার করেছে, আল্লাহ জানেন।

মাস খানেক পর গার্মেন্টসের চাকরিটা পেল। আরও এক মাস পর দেখল তাকে। শেষ ভাদ্রের ধানগাছের মতো সে, গভীর সবুজ। সকালে বা সন্ধ্যায় ধানপাতায় শিশির জমে, ওই শিশিরের মতো তার চোখ। কোথাও একটা গান শুনেছিল—পিরিতি গভীর জল…| তার চোখ আসমানের দিঘির গভীর জলের মতো। ওই চোখের কোনায় ভরসা আছে। ওখানে ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে।

সারাক্ষণ দেখে তার নড়াচড়া, হাত, মুখ, আঙুল। সে শ্যামলা মেয়ে। মাঝেমধ্যে ছোট কালো টিপ পরে। দেখতে খুবই ভালো লাগে।

একদিন দুপুরে পায়ের দিকে চোখ গেল। দেখল দুই পায়ে নূপুর। সালোয়ারের কারণে পুরো দেখা যাচ্ছে না। আশ্চর্য এক নূপুর বেজে উঠল। সারা দিন তার মনে শুধু নাচ আর নাচ। কত নাচল!

দুয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছে। সাহসে কুলায়নি। কথা বলার জন্য কয়েকবার পথে ও ফ্যাক্টরিতে কাছাকাছি গিয়েছিল। যতবার বলতে গেছে, মনে পড়েছে রুনার বেদনাময় মুখ।

মেয়েটাকে দেখার পর একদিন টের পেল, তার দৃষ্টি পাল্টে যাচ্ছে। কোনো মেয়ের দিকে খারাপ চোখে তাকাচ্ছে না। কারও দিকে তাকালেই মেয়েটার চোখের কথা মনে পড়ে।

নাম জানতে চলে গেল আরও এক মাস। এক দুপুরে ভাত খাওয়ার পর নিচে নামল। চা খাবে। রফিকও এসেছে। রফিকের সঙ্গে তার মেলে ভালো। একটু সংকোচ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই মেয়েটাকে চিনিস?’

‘কোন মেয়ে?’

বুঝিয়ে বলল সে।

‘ওর কথা বলছিস?’ নাক কুঁচকে বলে, ‘প্রেম করে তিনজনের সাথে। চারজনকে নাকে দড়ি বেঁধে ঘোরায়।’

রহিমের মনে হলো, কোথাও কেউ নেই। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার। সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন সে। কান্না আসে। ভেউ ভেউ করে কাঁদতে চায়। চা-টা না খেয়ে রেখে দেয়।

একটু পর শুনতে পায়, কে যেন গলা ফাটিয়ে হাসছে। তাকিয়ে দেখে রফিক। সে বিস্ময় নিয়ে তাকায়। হাসতে হাসতে রফিক তার বাহুতে ঘুষি মারে। বলে, ‘কিছুদিন পর একটা বিয়ে খাব।’

‘মানে?’

‘মানে লাইন ক্লিয়ার।’

বুক থেকে পাথর সরে যাওয়ার মতো স্বস্তি পায় রহিম।

রফিক চায়ের কাপ নাচিয়ে হাসে। পিঠ চাপড়ে বলে, ‘চালিয়ে যা, দোস্ত। মেয়েটা খুব ভালো।’

সে মনে মনে বলে, ‘আমার আলো।’

চৌদ্দগ্রামের মেয়ে রুমানা। নামটা শুনেই চমকে ওঠে। বুকের ভেতর পুরোনো ধুকপুকটা ফিরে আসে। মনে পড়ে অমাবস্যার সেই রাতের কথা। ধানে দুধ এসে ঘন হওয়ার পর যেমন হয়, চাচাতো বোন রুনা তাকে সেভাবেই দেখত। কিন্তু সে হয়েছিল দৈত্য।

রুনা—রুমানা, কেমন মিল দেখো। মনটা এখন রুনার অশ্রুর মতো। সেই রাতে সে অনেক কেঁদেছে। চেনা রহিম অচেনা হয়ে যাওয়ায় কষ্টটা ছিল আরও বেশি। কীভাবে তা করলাম? এখন ভাবে। দুপুরের রোদ ও দ্রুতগামী গাড়ির হর্ন পোকা হয়ে কুটুস কুটুস কামড়ায়। তেতো হয়ে যায় সব।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে রুমানার সঙ্গে দেখা। চোখাচোখি হয়। তার চোখ দেখে পাল্টে যায় মন। চোখে কী যেন আছে। মুছে দেয় সব কষ্ট। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগোয়। ভাবে, তাকে না দেখে থাকতে পারব না।

রাতে বিছানায় শুয়ে নীরবে ছাদের দিকে চেয়ে থাকে। কত কত ভাবনা আসে! গার্মেন্টসের মেয়েদের হাঁটার মতো ঘুমগুলো হেঁটে আসে। ঘুমগুলো আলপথ দিয়ে হাঁটে। আসমানের দিঘির পাড়ে যায়। বিলের মাঝখানে একা দিঘি। সবাই মনে করে, আকাশের সঙ্গে তার সখ্য। তাই আসমানের দিঘি বলে ডাকে। চাঁদের আলোয় হাসছে রাত। দিঘি থেকে জোনাকির আলোর মতো উড়ে আসে রুমানা। এসে তার সামনে দাঁড়ায়। সে ধরতে গেলে আলো নিভে যায়। হাত গুটালে আলো জ্বলে। চাঁদের আলো ছাড়া এদিকে আর কিছু নেই। জোনাকির আলো বলে, পৃথিবীতে এত ছোট জীবন—জীবনে বেশি অন্যায় সয় না। সয় শুধু ভালোবাসা। যার মনে যত ভালোবাসা, সে তত রয়।

সে ভাবে, চাঁদের আলোর মতো অথবা রুমানার চোখের মতো একটা ব্রাশ কিনব। ব্রাশ দিয়ে ঘষে-মেজে সব কালো মুছে ফেলব। আমি কোথাও কিচ্ছু চাই না। বড় আপার মতো হতে চাই। আমি শুধু তাকে পেতে চাই।

সকালে ওঠে। মনের মধ্যে তবু তাই-ই। আলো লেগে চাওয়াটা আরও ঝকঝকে হয়।

স্বপ্নের কথা বলতে পারবে কি না, জানে না। তবে প্রতিমুহূর্তে স্বপ্ন সাজায়। কোনো কোনো গভীর রাতে ঘুম না এলে রুনার কথাও মনে পড়ে। লাঙলের ফলা যেভাবে জমি ফালা ফালা করে, তেমন দৃঢ়তায় ভাবে, তার সামনে যাব। পায়ের কাছে পড়ে মাফ চাইব। কিন্তু লজ্জা এসে তাকে ঘিরে ধরে। লজ্জা না, আসলে তার মুখোমুখি হতে পারবে না সে। কখনো এ রকম ভাবনাও এসে যায়—সুন্দর একটি ঘর বানাব, সব কষ্ট মুছে রুনাকে ওই ঘরে নিয়ে যাব। এ কথা ভেবে নিজেকে জলের মতো নমনীয় মনে হয়।

সকালে শুরু হয় মানুষের জীবন। সারা দিন নানাভাবে চলে সন্ধ্যায় তা অন্ধকারে ডুবে যায়। অন্ধকারের কত কাহিনি! কতজনে তার হিসাব রাখে? কারও জীবন শেষ হয়ে যায়, কারও বা নতুন করে ফোটে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ মনে হলো, মেঘের গায়ে একটু একটু নুন জমবে। নুনের জন্য খুন হবে আসমান। সে তখন আসমানের দিঘিতে ঘুরে বেড়াবে। দিঘির পাড়ে বসে ভিজবে। ভাববে, গোলা ও গোয়ালভরা এক ঘরের কথা। সেই ঘরের বউ হবে রুমানা।

ফ্লোরে অনেক আলো। মেশিনগুলো একসঙ্গে চলে। সুইয়ে সুইয়ে কত ফোঁড় পড়ে! প্রতি ফোঁড়ে যেন মেয়েটার গল্পই বলা হয়।

সারা দিন মেশিনের আওয়াজে, সুইয়ের ফোঁড়ে তার মন সেলাই হয়। সেলাই করা মন নিয়ে তাকে দেখে। তাকে দেখলে বড় আপার কথা মনে পড়ে। বড় আপাটাও মায়ের মতো। মনে কোনো ভেজাল নেই। আপা তাকে খুব দেখতে পারত। রুনাকে ধর্ষণের পর থেকে তার সঙ্গে কথা বলে না। চোখ জ্বালা করে। আপার হাঁটুতে মাখা রেখে চিৎকার করে কাঁদতে পারলে মনে হয় কিছুটা হালকা হতো।

ভাবতে ভাবতে চারপাশে তাকায়। এখানে সারা দিন বন্দিজীবন। সূর্যের আলো দেখা যায় না। মেয়েদের শ্রম, মেশিনের আওয়াজে গমগম করে চারতলার ফ্লোর। বিরক্তি লাগলে কাছের মেশিনে সেলাই হওয়া কাপড়ের দিকে চেয়ে থাকে। ফোঁড়ে ফোঁড়ে গাঁথা হয় কাহিনি। তখন ওর কাহিনি জানতে ইচ্ছে করে। মেহেদি রাঙানো হাতে সে নিপুণভাবে মেশিন চালাচ্ছে। মনে হয়, মেশিনের সঙ্গে তার নিবিড় বন্ধুত্ব। ভালো লাগে তা।

ভাবে, বহুদূরে সুন্দর একটা গ্রামে রুমানার বাড়ি। বিলের মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা আছে। রাস্তার দুপাশে সবুজ ধানখেত। খেত আর সবুজের গন্ধ গায়ে মেখে মেয়েটা বাড়ি যায়। বাবার মুখ হাসি হাসি। কারণ, দুই মাস পর মেয়ের দেখা পেয়েছে। আজ জবাই করা হয়েছে রাতাটা। অনেক দিন থেকে মা মোরগটা রেখেছিল।
সন্ধ্যার পর জানতে পারে, প্রিয় রাতা জবাই হয়েছে তারই জন্য। সে খুব মন খারাপ করে। মা, এটা কেন করলে? মাংস খাওয়ার জন্য আমি এতই পাগল? আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারলে না? মনের দুঃখ মনে চেপে উঠানে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকা রাতাটার কথা ভাবে। কক কক করে কোনা চোখে তার দিকে তাকাত। তখন লাল ঝুঁটি নড়ত সুন্দর ভঙ্গিতে। সে মন খারাপ করে বসে থাকে। হয়তো ভাবে, লাল ঝুঁটির নাচের মতো সুন্দর এক পুরুষের সঙ্গে তার পরিচয় হবে। তাদের মধ্যে অনেক মায়া জন্মাবে। একজন আরেকজনকে গভীরভাবে চাইবে। একসময় তারা ঘরও বাঁধবে। ঘরের কথা ভাবতে ভাবতে ছোট ভাইটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাইয়ের একটা কথায় প্রাণ খুলে হাসে। মন খারাপ ভাবটা চলে যায়। স্বপ্নের এক টুকরো রং মনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

রহিম আনমনা। নিজেকে ওর স্বপ্নের পুরুষ ভাবছিল। ভাবতে ভালো লাগছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকায় সুপারভাইজার বকা দেয়।

সে তখন রুমানার দিকে তাকায়। এত এত মেয়ে—সবাইকে আপন মনে হয়। তাদের কোলাহলকে মনে হয় ধানের ফুল। তারা যখন সেলাই করে, মেশিনগুলো দ্রুতগতিতে চলে, মনে হয়, ধান রোপণ করছে।

সন্ধ্যায় গড়ায়। তার কিচ্ছু ভালো লাগে না। খোলা বাতাস গায়ে না লাগলে, প্রাণ খুলে হাসতে না পারলে জীবনে আর থাকে কী! ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

বাসা থেকে ফ্যাক্টরির দূরত্ব প্রায় এক মাইল। বেশির ভাগ সময় হেঁটেই আসে। মেয়েরা লাইন ধরে হাঁটে। প্রায় প্রত্যেকের কাঁধে ব্যাগ। অনেকের হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। তাদের হেঁটে যাওয়াকে মনে হয় বাঁশির সুর। কোনো রাখাল এক মনে বাজাচ্ছে সেই বাঁশি। হাসিমুখ, গল্পমুখ, দ্রুত হাঁটা দেখতে ভালো লাগে। তাদের মধ্যে খোঁজে একটি মুখ। পরে জানতে পারে, সে আসে উল্টো দিক থেকে। ফ্যাক্টরির গেটে তাকে দেখার জন্য প্রতিদিন সকাল সকাল চলে যায়।

রুমানার কথা ভেবে হাঁটছিল রহিম। হাঁটতে হাঁটতে মাকে মনে পড়ে। ভাবে, আমার মনে-মুখে কেউ কালি মেখে দিয়েছিল। তাই আমি অন্ধকারের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। এখন সকালের মানুষ হব, বাবার লাঙলের ফলার মতো হব। আপন মনে বলে, ‘দেখ, তাই-ই হব।’ কাকে বলে বোঝা যায় না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, ধানপোকা মনের মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। সেই পোকা দূর করবে রুমানা!