মানুষ নই, যেন রোবট

ঘুম থেকে জাগি ফজরের আজানের সময়। ভোর ৬টার মধ্যে গায়ে পোশাক লাগাই (ইউনিফর্ম)। তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আসি সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে। ডিউটি ভাগ হলে ৮টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি। নির্দিষ্টস্থানে দাঁড়িয়ে ডিউটি চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখন ডিউটি শেষ হবে তা সবসময়ই থাকে অজানা। তবে অধিকাংশ দিনই সকালের শিফটে এলে রাত ৮টার আগে ডিউটি শেষ হয় না। তারপর আবার রাজারবাগে গিয়ে অস্ত্র-গুলি জমা দিয়ে আনুষঙ্গিক কাজ শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেজে যায় রাত ১১টা থেকে ১২টা। তখন স্ত্রী-সন্তান থাকে ঘুমিয়ে। কোনো রকম হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যাই। ডিউটি প্রায় ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা। বাকি সময়গুলোর মধ্যে ঘুম হয় সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। একইভাবে পরের দিনও ছুটতে হয় ডিউটিতে। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। আমরা পুলিশরা যেন মানুষ নই রোবট।’

রোববার দুপুরে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকালে কষ্টের সঙ্গে কথাগুলো বলেছেন এক পুলিশ কনস্টেবল। তার বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। এ কনস্টেবলসহ আরও অন্তত ১০ থেকে ১২ জন পুলিশ সদস্য রোববার সকাল থেকে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুপুর ২টার দিকে সেখানে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে ডিউটির বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এ প্রতিবেদকের কাছে তাদের নানা ক্ষোভ ও কষ্টের কথা বলতে থাকেন। কথা বলতে গিয়ে আবেগে-কষ্টে কারও কারও চোখে পানি চলে আসে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধে দেশের জন্য প্রথমেই অস্ত্র ধরেছিল পুলিশ। সেই চেতনাধারী পুলিশ সদস্যরা নানা সমস্যা-সীমাবদ্ধতার মাঝেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দেশের স্বার্থে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের উৎসর্গ করছে। এজন্য আইজিপি হিসেবেও আমি সব পুলিশ সদস্যের কাছে কৃতজ্ঞ। হরতাল-অবরোধসহ সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক নানা কর্মসূচি-সহিংসতা মোকাবিলায় এ পুলিশ সদস্যরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। দিন-রাত নিরলস ডিউটিতে তাদের ব্যক্তিগত জীবন প্রায় বিপর্যস্ত। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে হতাহতের শিকার হচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌখিক বাহাবা মিললেও এত পরিশ্রমের মূল্য তারা পাচ্ছেন না। তবুও কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে ডিউটি করছেন পুলিশের নিম্নস্তরের সদস্যরা।

পুলিশ সদস্যরা বলেন, ব্যক্তিগত-পারিবারিক প্রয়োজনেও এখন মিলছে না ছুটি। হরতাল-অবরোধ ও জাতীয় নির্বাচনসহ নানা কারণে চার মাস পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল ছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে খুব সীমিত সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে ছুটি দিতে শুরু করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রাজনৈতিক কোনো উত্তেজনার আশঙ্কায় রোববার থেকে আবারও ছুটি দেয়া বন্ধ করা হয়েছে।

রোববার মৎস্য ভবনের সামনে ডিউটিরত অপর একজন ময়মনসিংহের পুলিশ সদস্য (হাবিলদার) এ প্রতিবেদককে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কথা বলে কী হবে? আমাদের কথা কে শুনবে? বরং পত্রিকায় আমাদের ক্ষোভের কথা নামসহ প্রকাশ হলে অফিসাররা আমাদের ঝামেলায় ফেলবেন। আমরা কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যত্ম কতটা কষ্ট করি তা কি উপরের অফিসাররা জানেন না? অবশ্যই জানেন। কিন্তু লাভ নেই। কারণ আমরা তো নিম্নপদের। সমস্যা আমাদের, তাদের (ঊর্ধ্বতন) তো নয়।

রোববার মৎস্য ভবন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ডিউটিরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানান, কি বিশেষ দিনের ছুটি আর কিংবা সরকারি সাপ্তাহিক ছুটির দিন সবদিনই তাদের কাছে একই রকম। সপ্তাহের একটি দিনও এসব পুলিশ সদস্যের ছুটি নেই। একই নিয়মে প্রতিদিন সেই ভোরে ঘুম থেকে জাগা এবং গভীর রাতে বাসায় ফেরা। এর বাইরে তাদের আর সামাজিক-পারিবারিক কোনো জীবন নেই। সাধ-আহ্লাদ তো দূরের কথা নিজেদের অধিকার বা সমস্যার কথা বলার সুযোগও নেই নিম্নপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের। গণমাধ্যমের কাছেও কোনো কষ্টের কথা বললে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আক্রোশের শিকার হতে হয়। কোনোভাবেই দুর্ভোগ-ভোগান্তির নিরসন হচ্ছে না। পুলিশ কনস্টেবলরা বলেছেন, প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ডিউটি করতে হচ্ছে। কিন্তু এর কোনো হিসাব নেই। ওভারটাইম ডিউটি হিসেবে কোনো সম্মানী ভাতাও নেই। এ পরিশ্রমের মূল্য পেলেও ক্লািত্ম, অবসাদ অনেকটা দূর হতো।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পুলিশের ঝুঁকিভাতাসহ বেশকিছু ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা বা ওভারটাইমের বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ডিউটিরত আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী এক কনস্টেবল বলেন, ৯ বছর আগে পুলিশের চাকরিতে যোগদান করি। সর্বসাকুল্যে বেতন পাচ্ছি বর্তমানে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে দীর্ঘদিনের সেই বাসস্থানের সমস্যা। একটি সিঙ্গেল খাটে পালাক্রমে ঘুমাতে হয় দু-তিনজন। বাধ্য হয়ে শাহজাহানপুরে এক কক্ষের বাসা ভাড়া নিয়েছি ৬ হাজার টাকায়। স্ত্রী ও এক সন্তানের ভরণপোষণসহ সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছি প্রতিনিয়তই। একদিকে ডিউটির চাপ, অন্যদিকে সাংসারিক চাপ সব মিলে দারুণ কষ্টে দিন কাটছে আমাদের মতো পুলিশ কনস্টেবলদের।

সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ