যে ছেলেবেলা আমাকে অপরাধী করে দেয়

বছরখানেক আগের কথা। এক শুক্রবার ভোরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাচ্ছিলাম, তরুপল্লবের গাছ চেনানোর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। বৃক্ষপ্রেমী মোকারম হোসেনের এই গাছ চেনানোর বেশ কয়েকটা কর্মসূচিতে আমি অংশ নিয়েছি। কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হওয়া এই শহরে এ ধরনের একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাবেন। তবে শুধু মোকারম হোসেনের ভালো কাজে উৎসাহ দিতেই যে আমি ছুটির সকালের ঘুম মাটি করে ছুটে যাই, তা নয়। আমাকে টেনে নেয় আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা বৃক্ষের জন্য, প্রকৃতির জন্য হাহাকার করে মরা অন্য এক আমি। আমি সেখানে খুঁজি আমার শৈশব, কৈশোর; যা আমি ফেলে এসেছি অনেক পেছনে।

যা বলছিলাম। যেতে যেতে মনে হলো বন্ধু খালেদ মুহিউদ্দিনের বাসা তো বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই। তার মেয়ে শব্দিতাও আমার অনেক প্রিয়। তাদের সঙ্গ পেলে মন্দ হয় না। ফোন করলাম খালেদকে। সে বললো, দাঁড়ান, শব্দিতাকে জিজ্ঞেস করে নেই। একটু পরে খালেদ রিং ব্যাক করে বললো, শব্দিতাকে জিজ্ঞেস করেছি। ঘুম ঘুম চোখে সে খুব বিরক্ত হয়ে আমাকে বলেছে, বিরক্ত করো না তো বাবা। সারা সপ্তাহ আমি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করি। একটা ছুটির দিনে একটু ঘুমাতে দাও। পাঁচ বছরের শব্দিতার কণ্ঠে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আপনারা নিশ্চয়ই হাসছেন। আমি কিন্তু হাসতে পারিনি, আমার কান্নাই পাচ্ছিল। শব্দিতা কী খুব ভুল বলেছে? আমার ১০ বছরের ছেলে প্রসূন আমিনের রুটিন দেখে তো আমার প্রতিদিনই কান্না পায়। সকাল সাড়ে ৭টায় ঘুম থেকে উঠে যুদ্ধ শুরু। ঘুম চোখেই নাস্তা সারতে হয়; তাও নিজের পছন্দে নয়, মায়ের পছন্দে। প্রচণ্ড অনিচ্ছায় গিলতে হয় এক গ্লাস দুধ। তারপর ব্যাগ নিয়ে দৌঁড়। সেই ব্যাগেও থাকে নিজের নয়, মায়ের পছন্দের টিফিন। তবে প্রসূন সেই টিফিন কতটা খায় তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। স্কুল ছুটি হয় দুপুর ২টায়। দৌঁড়ে বাসায় এসে গোসল-খাওয়া শেষ করতে করতে কোচিং-এর সময় হয়ে যায়। ৩টা থেকে ৬টা কোচিং খোয়াড়ে বন্দী। সেখান থেকে বাসায় ফিরে স্বাভাবিক হতে হতে দিনের ১২ ঘণ্টা শেষ। তারপর হোমওয়ার্ক। হোমওয়ার্ক করতে করতে টায়ার্ড হয়ে গেলে এসে বলে, মামনি আমি একটু রেস্ট নেই। রেস্ট মানে কিন্তু রেস্ট নয়, রেস্ট মানে কম্পিউটার গেমস। এই কম্পিউটারই তার প্রধানতম বিনোদন। এরই মধ্যে ঢুকে যায়- টিনটিন, হূমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, ব্রাজিল, লা লিগা, রোনালদো, দিলশান, রেসলিং।

আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাই শুক্রবার সকালে। সারা সপ্তাহ হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরও মুক্তি নেই। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় কোচিং। যেদিন কোচিং থাকে না, সেদিনও বাসায় টিচার আসে। ছেলেকে হেল্প করতেই বাসা নেয়া হয়েছে স্কুলের ৩ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। আমি ভাবি বাসা যদি অন্য অনেকের মত দূরে হতো, তাহলে কী হতো আমার ছেলেটার। কিন্তু অনেককে জানি যারা যাত্রাবাড়ি থেকে প্রতিদিন মোহাম্মদপুরে আসে স্কুল করতে, তাও পাবলিক বাসে। সেই ছেলেটার কষ্টটাও আমি অনুভব করার চেষ্টা করি। প্রসূনকে নিয়ে স্কুল বা কোচিংয়ে যাওয়ার সময় ইকবাল রোডের মাঠের পাশ দিয়ে যেতে হয়। মাঠে অনেককেই খেলতে দেখি। প্রসূনের মনে কী হয় জানি না, আমার বুক ফেটে কান্না আসে। আমার মনে পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা ‘লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা, ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব…’। অবশ্য প্রসূন মাঝে মাঝে সেই রাস উৎসবে যোগ দেয়ার সুযোগ পায়। সেই সুযোগও অনেক নিয়ন্ত্রিত- সঙ্গে কে যাবে, কতক্ষণ মাঠে থাকা যাবে, নানান বিষয়ে প্রমিজ করে তবেই যেতে হয়। এমনও হয় খেলা জমে ওঠার সময়ে বাসায় টিচার চলে আসে। প্রসূনকেও সব ফেলে ছুটে আসতে হয়। প্রসূনদের কোনো বিশ্রাম নেই। তার ভাষায় রেস্ট মানে কম্পিউটার গেমস। শুধু ছুটে চলা। কিসের পেছনে? আমি নিশ্চিত নই। পড়াশোনা? আসলে কি পড়াশোনা, নাকি, রোল নাম্বার আর সার্টিফিকেট। ক্লাশের লাস্ট বয় মানেই কী জীবন ব্যর্থ হয়ে যাওয়া? আপনারা সবাই বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার ক্লাশের ফার্স্ট বয় এখন কী করছেন?

আমার ক্লাশের ফার্স্ট বয় আতাউর এখন কিছুই করেন না, বিকালে গ্রামের চায়ের দোকানের সামনে বসে আড্ডা মারেন। অথচ স্কুলে এই আতাউর ছিল আমাদের বিস্ময়। কী অবলীলায় স্যারদের সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে; অঙ্ক, টেনস, জটিল জটিল গ্রামার কেমন পানির মত বুঝে ফেলছে। কোনটা সাফল্য, কোনটা ব্যর্থতা, আমি নিশ্চিত নই। তাহলে আমরা কিসের পেছনে ছুটছি, সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছি কিসের রেসে। সাফল্য মানে আসলে কী? জীবনে আমরা আসলে কী চাই। জীবন তো একটাই এবং সেটাও খুব বড় নয়। আমরা যে আমাদের সন্তানদের শৈশব চুরি করছি, কিসের জন্য। জীবনের শুরুতেই রেসে নামিয়ে দিচ্ছি কেন? কোথায় গন্তব্য। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর এক স্কুলের নবম শ্রেনীর ছাত্র হাসিন আনজুম খান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মাত্র নবম শ্রেনীর ছাত্রের হার্ট অ্যাটাক হবে কেন? তার বন্ধুরা বলেছে, অতিরিক্ত চাপেই মারা গেছে হাসিন। এই বয়সে এত চাপ কিসের। এই বয়স তো হবে হাসির, আনন্দের, খেলার। অসম্ভব মেধাবী হাসিনকে বন্ধুরা ডাকতো ক্ষুদে আইনস্টাইন। বরাবরই ক্লাসে প্রথম হতো। প্রথম হওয়ার এই চাপই কী তার জন্য কাল হলো? হাসিনের মৃত্যুর জন্য কেন জানি নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। আমরাই তো সন্তানদের শৈশব থেকে আনন্দ কেড়ে নিয়ে সেখানে ভর্তি করে দিচ্ছি অনন্ত চাপ। সাফল্য চাই, আরো সাফল্য। বোঝো আর না বোঝো সব মুখস্ত করতে হবে। তারপর পরীক্ষার খাতায় সব উগড়ে দিতে হবে। অমুক কেন তোমার চেয়ে ভালো, তমুক কেন নাম্বার বেশি পেলো। যে হতে পারতো গানের পাখি, আমরা তাকেই বানাতে চাই তোতা পাখি। হাজার হাজার তোতা পাখি কিচির মিচির করছে আমাদের চারপাশে।

আমরা বলি, শুধু পড়ো আর পড়ো। আমরা জানতে চাই না বা জানাতেও চাইনা, আমাদের সন্তান গান শুনতে চায় কিনা, ফুল ভালোবাসে কিনা, প্রকৃতি তাকে টানে কিনা, শীতের সকালে শিশিরে পা ভেজাতে চায় কিনা, বৃষ্টিতে ভিজতে তার কেমন লাগে, গাছপালা-নদীনালার সৌন্দর্য্য আবিস্কারের আনন্দ সে পেতে চায় কিনা। অনেক যুদ্ধ করে আমার সন্তানকে আমি ভর্তি করেছিলাম আমার প্রিয় নালন্দা স্কুলে। সেখানে পরীক্ষা নেই, প্রতিযোগিতা নেই; তাই বদলে নেয়া হলো ফাউন্ডেশন স্কুলে। সেখানেও প্রতিযোগিতা কম, ক্লাশে মাত্র ২৫ জন ছাত্র। আবার বদলাও। এবার সেন্ট যোসেফ স্কুল। এখানে অনেক ছাত্র, টাফ কম্পিটিশন। হায়রে কিসের কম্পিটিশন, কার সঙ্গে, কেন?

আমার ছেলেটা খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করে না। দেখতেও একটু শুটকা-পুটকা। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার মায়ের প্রবল আফসোস। সারাক্ষণ চেষ্টা কিভাবে তাকে আরো বেশি গেলানো যায়। আর খালি বলে অমুকের ছেলেটা দেখতে কী চমৎকার। এটা ঠিক প্রসূনের সঙ্গে স্কুলে গেলে আমিও দেখি স্কুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেমন হৃষ্টপুষ্ট সব ছেলে। একদল বাচ্চা ছেলে হইচই করছে, দুষ্টামি করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে- এই দৃশ্যটা আমার কাছে এত চমৎকার লাগে যে শুধু এই জন্যই আমি মাঝে মাঝে স্কুলে যাই এবং প্রসূনকে পৌছে দেয়ার পরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখি। কিন্তু নাদুস নুদুস সেই ছেলেগুলোকে দেখলে আমার ভালোও লাগে আবার তাদের জন্য মায়াও লাগে। এদের বেশির ভাগেরই স্বাস্থ্য আসলে ভালো নয়। কারণ এরা চিকেন ফ্রাই, চিকেন নাগেট আর হট ডগ খেতে খেতে মুখের রুচি নষ্ট করেছে আর মুটিয়ে গেছে। এই মুটিয়ে যাওয়া সন্তানদের দেখে আমরা আপাতত খুশী হই বটে, কিন্তু ঘন ঘন অসুখে পড়তে দেখলে আফসোস করি, কেন আমার ছেলেটার বারবার অসুখ করে। করে, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। কারণ তারা পুষ্টিকর খাবার খায় না। কারণ তারা ভেজাল খাবার খায়। তুলনামুলক ভাবে গ্রামের শুকনো ছেলেটাও তাদের তুলনায় অনেক শক্ত, রোগে পড়ে কম। কারণ তারা যা খায় সব খাঁটি। আমরা নিজেরা ফিট থাকার জন্য কতকিছু করি, সকালে হাটো রে, জিমে যাওরে, সাতরাও রে।

গ্রামের লোকদের কিন্তু ফিট থাকতে কিছুই লাগে না। ৮/১০ মাইল দূরত্বের কোথাও যেতে তাদের গাড়ি ঘোড়া লাগে না। যখন তখন গাছে চড়ে, নিজের যা লাগে পেড়ে নিয়ে আসে। দুপুরে গোসলের সময়, পুকুরে মনের আনন্দে সাতরে নেয়। তারা ফিট থাকবে না তো আমরা থাকবো। জিম-সুইমিং পুলের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করেও আমরা কি সেই ফিটনেস পাই। শহরে এই শুনি ব্যাক পেইন, এই শুনি গ্যাস্ট্রিক, এই শুনি ডায়াবেটিস। ক্যান্সার তো যেন আজ সাধারন অসুখে পরিণত হয়েছে। অথচ গ্রামে একজন ক্যান্সারের রোগী দেখতে ১০ গ্রামের লোক আসে। আমরা এত বেশি ভেজাল খাই, আমাদের রোগ-শোক হবে না তো কার হবে। প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে না। আমের মৌসুমে ঢাকায় ‘বিষমুক্ত আমের মেলা’র মেলা বসে যায়। আমি দেখি আর হাসি। হায় রে বিষমুক্ত আম। হয়তো গাছ থেকে পাড়ার পর দয়া করে আর কোনো বিষ মেশানো হয়নি। কিন্তু আমের মুকুল আসার পর থেকেই তো শুরু হয় কীটনাশক ছিটানো, তারপর পর্যায়ক্রমে চলতেই থাকে। ব্যবসায়ীদের চেষ্টা থাকে একটা আমও যেন নষ্ট না হয়। তথাকথিত বিষমুক্ত আমে আপনি কখনো পোকা দেখেছেন? বিষ না থাকলে তো পোকা থাকতো। শুধু আম নয়, সব গাছ থেকেই সর্বোচ্চ ফল পাবার চেষ্টায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকে কঠোর ব্যবসায়িক নজরদারি। তাই তো লিচু খেয়েও শিশুরা মরে যায়। তাহলে এরা খাবে কী? অথচ আগে গ্রামে দেখতাম কোনো গাছে একশোটা আম ধরলে তার ২০টা ঝড়ে পড়ে যেতো, ২০টা দুষ্টু ছেলের ঢিলের কবলে পড়তো, গিন্নীর আচার বা ডালের দেয়ার কাজে যেতো ১০টা, বাদুরে খেতো ১০টা। বাকি ৪০টার মধ্যে ১০টায় পোকা থাকতো। বাকি ৩০টা আম পেকে টুপ করে পড়তো। সেই আমের সঙ্গেই মানুষ তুলনা করতো অমৃতের। আর এখন একশোটা আমের একশোটাকে পাকিয়ে বাজারে আনতে হবে। নইলে ব্যবসায় লস। শুধু ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়ে লাভ কী। আমাদের জনসংখ্যাও তো অনেক বেড়েছে। একশোটা আমের মধ্যে ৩০টা আম টিকলে তো তার কেজি হবে দুই হাজার টাকা। সে আম অমৃতের মতনই হবে, তবে সাধারন মানুষের ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে তা।

গ্রামের কথাই যখন এলো তখন একটু ছেলেবেলার কথা বলে নেই। আমাদের ছেলেবেলা ছিল আনন্দে ভরপুর। দুপুরের পর থেকে মাগরিব নামাজ পর্যন্ত পুরো সময়টা আমার। যা ইচ্ছা তাই করো, খেলে বেড়াও, কোনো অসুবিধা নেই। মায়ের কড়া নির্দেশ, মাগরিবের আজান শেষ হওয়ার আগে ঘরে ঢুকতে হবে। ব্যস। এমনও হয়েছে খেলা চলছে, আজান শুরু হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে খেলা বন্ধ, তারপর উসাইন বোল্ট হয়ে যাওয়া- আজান শেষ হওয়ার আগেই যে ঘরে ঢুকতে হবে। আহা, আজানটা যে কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। রানআউট থেকে বাঁচার জন্য ব্যাটসম্যান যেমন পড়িমরি ব্যাট প্লেস করেন, আমরাও তেমনি কোনোরকমে হাচড়েপাচরে ঘরের দরজাটা ছুঁয়ে দিয়ে হাফাতে থাকতাম। আহা কত আনন্দের ছিল সেই দিনগুলো। তারপর পড়তে বসার প্রস্তুতি। হারিকেনের গ্লাস-সলতে পরিস্কার, কেরোসিন তেল ভরে, মুছে চকচকে করে জ্বালিয়ে পড়তে বসা। আর কী ঝামেলা, পড়তে বসলেই চোখজুড়ে নামে রাজ্যের ঘুম। সারা বিকাল খেলার ধকলে ক্লান্ত শরীরে ঘুম নামাটাই স্বাভাবিক। মাঝেমধ্যে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ বন্ধ হয়ে আসতো। মাঝে মধ্যে মাথা নুয়ে আসতো টেবিলে। কিন্তু সদাসতর্ক আম্মার চোখ ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকতো না। তবে এই সদাসতর্ক চোখকে ফাঁকি দিয়েও পাঠ্যবইয়ের নিচে লুকিয়ে মাসুদ রানা, ফাল্গুনী, নিহার রঞ্জন পড়াও চলতো। কোনোরকমে ১০টা বাজিয়ে ছুটি মিললেও বিছানায় গেলেই ঘুম উধাও। ভাইবোনদের খুনসুটিতে রাত বেড়ে যেতো। আগে ছুটি পেলে কাড়াকাড়ি করে ছোট্ট রেডিও বুকে নিয়ে রেডিও ম্যাগাজিন উত্তরণ শুনতে শুনতে হারিয়ে যেতাম ঘুমের রাজ্যে। গরমের দিনে ঘুমাতাম জানালা খুলে। ঠিক জানালার পাশেই ছিল একটা হাস্নাহেনার ঝাড়। বাতাসের সাথে উড়ে আসতে সুবাস। ফুলের গন্ধের ঘুম আসেনা…। সেই যে আরাম, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রুমে কী কখনো পাওয়া সম্ভব? একটু দূরেই ছিল একটা বাতাবি লেবুর গাছ। বাতাবি লেবু মানে যেটা জাম্বুরা নামে পরিচিত, তার ফুলের গন্ধ এখনও চোখ বুজলে আমাকে মাতাল করে দেয়।

ফুলের গন্ধের কথাই যখন এলো, বর্ষাকালে বৃষ্টি ভেজা গন্ধরাজ বা বেলির স্নিগ্ধ পরশ পুরো চেতনায় কেমন আবেশ সৃষ্টি করতো। বর্ষাকালে টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দ শুনতে শুনতে ঘুমানোর যে আনন্দ তা কি আর কোনোদিন পাবো এই জীবনে। বা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে, কাদায় গড়াগড়ি খেতে খেতে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার সৌভাগ্য কি আর কোনদিন হবে?
শীতের সকালে লেপের ওম থেকে ওঠা খুব কষ্টকর। আম্মা ডেকে ডেকে তুলতে পারতেন না। কিন্তু আম্মা সুবেহ সাদেকের সময় কানে কানে বলতেন, মাছ ধরতে যাবি। ব্যস, যত শীতই থাকুক এক লাফে তৈরি। আমার ছোট বোন নাজনীনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম মাছ ধরতে। শীত বলতে কিন্তু ঢাকার এই শহুরে শীতের সঙ্গে মেলাবেন না। ঢাকায় কখনো আমার কাছে শীত লাগে না। ঢাকায় বড় জোর ৩/৪ দিন লেপ গায়ে দেয়ার মত শীত পড়ে। আর গ্রামে কমপক্ষে দুই মাস। সেই কনকনে শীতে কুনি জাল নিয়ে দুই ভাই বোন বেরিয়ে পড়তাম। ভিজে শীতে হাত কুকড়ে যেতো, অবশ হয়ে যেতো। কিন্তু মাছে যখন পাত্র ভরে যেতো, আহা কী যে আনন্দ। সূয্যি মামা জাগার আগেই ঘরে ফিরতাম মাছভর্তি পাত্র নিয়ে। মাছ খাওয়ার চেয়ে ধরার আনন্দটাই ছিল বেশি। বড়শিতে মাছ ধরতে ধরতে কিভাবে যে সময় পেড়িয়ে যেতো টেরই পেতামনা। শুধু পথের পাচালীর পাতায় নয়, গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে আছে অপু আর দুর্গার গল্প।

সকালে নাস্তার আনন্দটা ছিল আরো অনেক বেশি। আম্মা মাটির চুলায় রুটি বানাতেন। আমরা সব ভাই বোন সেই চুলার পেছনে লাইন ধরে বসতাম। একসঙ্গে আগুন পোহানো আর রুটির জন্য অপেক্ষা। যেহেতু ভাই বোন বেশি ছিলাম তাই অপেক্ষাটা হতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার। কে আগে নেবে এই নিয়ে কাড়াকাড়ি। একজন আরেকজনকে নিবৃত্ত করার জন্য বলতাম, প্রথম রুটি খেলে বউ বা স্বামী মারা যাবে। তখন বউয়ের জন্য এত মায়া ছিল না। বউয়ের চেয়ে রুটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বউ মারা গেলে মারা যাবে। এভাবেই কাড়াকাড়ি করে রুটি খেতাম, সঙ্গে আলু ভাজি। রুটি কখনো গুণে খেতাম না। গরম গরম রুটি আর আলুভাজি- আহ স্বাদটা যেন এখনও লেগে আছে মুখে। আর এখন আমার ছেলেকে একটা রুটি খাওয়াতে আমার স্ত্রীর কত সাধনা করতে হয়। প্রতিদিন টেবিল সাজানো থাকে নানা আইটেমে। কিছুই যেন মুখে রোচে না। আমার ছেলেকে আমি ডাকি- তেলাপোকা। আমার ধারণা তার বুদ্ধি তেলাপোকা পর্যায়ের। কারণ সে শুধু সাদা ভাত খায়। আর আমি কখনো লাউশাককে বলি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার, কখনো পাট শাক, কখনো বা মুলা শাক। আসলে যেটা যেদিন খাই সেটাই শ্রেষ্ঠ মনে হয়। কোনোদিন পেয়ারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফল হয়, কোনোদিন আমড়া, কোনোদিন লটকন, কোনোদিন টেপা। আমার ছেলে রাগ করে বলে, তোমার কাছে তো সবই পৃথিবীর সেরা। আমি বলি তাই, আমার দেশের সবই আমার কাছে সেরা।

আমি কখনো ফার্মের মুরগি খাই না। গ্রামের মুরগি যেটা সারাদিন ঘুরে ঘুরে খুটে খুটে খায় সেটার মাংসের যে স্বাদ তা তো ফার্মের মুরগিতে পাওয়া যাবে না। আগে গ্রামে অতিথি এলেই আম্মা বলতেন, একটা মুরগি ধর। তারপর চলতো মুরগি ধরার কসরত। আমাদের সব ভাই বোনের আলাদা আলাদা মুরগি ছিল, তাদের আলাদা নাম ছিল। যেদিন যার মুরগি জবাই হতো, সেদিন সারাদিন তার মন খারাপ থাকতো। শীতের সকালে আরেকটা মজার খাবার ছিল- গুড় আর মুড়ি। চাদরে সারা গা ঢেকে একটি পাত্রে মুড়ি আর গুড় দিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো আমাদের। আমরা ঘুরে ঘুরে রোদ পোহাতাম আর মুড়ি খেতাম। শীতের সকালের নাস্তায় মাঝে মধ্যে আসতো পিঠা- নানারকমের পিঠা। কখনো কখনো রুটির সঙ্গে আলু ভাজির বদলে থাকতো জ্বাল দিয়ে ঘন করা খেজুরের রস। রুটি-ভাজি-ভাত-মাছ-মাংস তো খেতামই; এর বাইরে কারো গাছের পেয়ারা, কারো গাছের আম, জাম, ডেউয়া, তালশাষ, কাউ, বেতফল, আতা, শরিফা- কত রকমের যে ফল; সবগুলোর নামও মনে নেই। এখন মাঝে মাঝে কোথাও দেখলে অবাক হয়ে যাই, আরে এই ফলটা তো আমরা ছোটো বেলায় খেয়েছি। তারপর কোন ফুলে মধু আছে, একটু চুষে বের করে ফেলা। চাচি, জেঠিদের বানানো পিঠার স্বাদের তো কোনো তুলনাই নেই।

আরেকটা খুব মজার সময় ছিল ধান ওঠার মৌসুম। আমাদের কোনো জমি জিরাত ছিল না। কিন্তু আমাদের পাশের বাড়ির উঠানেই ধান ওঠার মৌসুমে রাত জেগে ধান মাড়াই চলতো। এখন তো সব মেশিনে হয়, তখন গরু দিয়ে ধান মাড়াই হতো। উঠানের মাঝখানে একটি খুঁটি গেড়ে তার চারপাশে ধান গাছ ছড়িয়ে রাখা হতো। আর চার পাঁচটা গরু মাঝখানের খুঁটিকে ঘিড়ে বৃত্তাকারে ঘুরতো। এভাবেই চলতো রাতভর। আমাদের আনন্দ আর দেখে কে। গরুর সঙ্গে আমরাও রাত জাগতাম। গাছ থেকে ধান আলাদা হওয়ার পর দিনের বেলায় বাড়ির দক্ষিণ দিকে বাতাসে দাড়িয়ে কুল দিয়ে ধান থেকে অন্যান্য ময়লা আলাদা করা হতো। তারপর সেই ধান সিদ্ধ করা, শুকানো, ঢেকিতে ভাঙ্গানো পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল উৎসবমুখর। তারপর ঘরে ঘরে পিঠা বানানো, মুড়ি বানানো, খই (এখনকার শহুরে ছেলেরা খই চেনে না, পপ কর্ন চেনে) বানানো চলতেই থাকতো। মেয়েরা ফিরতো বাপের বাড়িতে। পুরো গ্রামটাই যেন একটা পরিবার। দিনের বেলা কোনো ঘরের দরজা বন্ধ দেখিনি কখনো। সব ঘরই যেন নিজের ঘর। ধান মাড়াইয়ের পর গাদা করে রাখা খড় ছিল আমাদের লাফালাফি খেলার স্টেডিয়াম। সেইখানে লাফাতে লাফাতে গা কুট কুট করতে না করতেই পুকুরে ঝাপ। এই সময় গ্রামে গ্রামে ওয়াজ মাহফিল আর যাত্রা সবই চলতো। আসলে ঐ সময়টায় মানুষের পকেটে টাকা থাকতো। তাই মাহফিলের নামে হুজুর চাইলেও টাকা পেতেন, যাত্রার আয়োজনে টাকা দিতেও কারো আপত্তি থাকতো না। রাত জেগে মাহফিলে ওয়াজ শোনা বা যাত্রা দেখা দুটিই তখন আমাদের কাছে আনন্দের ছিল। পাপ পূণ্য বিচার করার মত সময় ছিল না। মাহফিল মানে রাতভর স্বাধীনতা, যাত্রা মানেও স্বাধীনতা। তবে আম্মার কাছ থেকে যাত্রার স্বাধীনতাটা আদায় করতে একটু বেশি কষ্ট করতে হতো। কিন্তু পাশের বাড়ির বড় ভাইটাই যখন যাত্রা মঞ্চ কাঁপাতেন রাজার ভূমিকায়, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যেতাম। পাশের বাড়ির মান্নান ভাই এখনও আমার কল্পনার হিরো। অবসরে কত তার মত হওয়ার প্র্যাকটিস করেছি, পাগলের মত বিরবির করে সংলাপ আউড়েছি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কয়েকদিন আগে আমার ছেলের স্কুলে স্কাউটসের ক্যাম্প হয়েছে। সেখানে রাতে থাকতে হবে, সারাদিন নানা কাজ করতে হবে; শুনে আমি তো মহা উত্তেজিত। অফিস শেষে বাসায় না ফিরে চলে গেলাম সেন্ট যোসেফ স্কুলে। বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েরা যোগ দিয়েছে ক্যাম্পে। দেখে আমার আনন্দ আর ধরে না। মহা উৎসাহে তাদের সঙ্গে লেগে গেলাম কাজে। কিন্তু আমার গাধা ছেলেটা সেখানে থাকতে পারলো না। তাকে নিয়ে মন খারাপ করে বাসায় ফিরলাম। স্কাউট থেকেই একবার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যালের সুইমিং পুলে বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর আয়োজন হলো। আমি মহা উৎসাহে প্রসূনকে নিয়ে গেলাম। কয়েকদিনে সে মোটামুটি শিখেও গেলো। কিন্তু হঠাৎ তার মায়ের আপত্তি, আমার ছেলে রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। আর এত সাঁতার শিখে কী হবে? আমার ছেলে সাদাই থাক বাবা, সাঁতার শেখার দরকার নেই। সাঁতার শিখে হবেটা কি, সাঁতারের জন্য কি পরীক্ষায় নাম্বার আছে? আসলেই ঢাকায় সাঁতার শেখার দরকারটা কি? ঢাকায় কোনো কূলবধূ চাইলেও গলায় কলসি বেধে ডুবে মরতে পারবে না। ঢাকায় তেমন পুকুর কই? প্রসূন এবার ক্লাশ ফাইভে উঠছে। তার মানে সামনের বছর তার সমাপনী পরীক্ষা। আগামী একবছর যে তার ওপর দিয়ে কী স্টিম রোলার যাবে তা ভেবে আমি রীতিমত আতঙ্কিত।

আসলে ছেলেবেলার কথা বলতে গেলে আমি একটু প্রগলভ হয়ে যাই। নানা কারণে দেশে-বিদেশে অনেক ঘুরেছি। কিন্তু এখনো আমার সবচেয়ে প্রিয় আমার গ্রামের বাড়ি, কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির শহীদনগরের চাঁদগাও। তবে এখন আর সেই হাস্নাহেনা ঝাড় নেই, বাতাবি লেবুর গাছ কবে জ্বালানি হয়ে গেছে। গ্রাম আর গ্রাম নেই, উন্নয়নের জোয়ারে আধা শহর। কিন্তু সেখানে গেলেই ফিরে আসে সেই দিনগুলো, সেই গ্রাম। এখানে সেখানে অনেক বেড়াতে যাই, কিন্তু প্রিয় সেই গ্রামেই যাওয়া হয় না। ঢাকা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্ব, তবু কেন যাওয়া হয় না? আমার না হয় সেখানে শিকড় আছে, কিন্তু আমার স্ত্রী আর সন্তানের কাছে সেটি নিছকই একটি গ্রাম, যেখানে কোনো নাগরিক সুবিধা নেই। থাকার ভালো জায়গাও নেই এখন। তারা কেন যাবে সেখানে। আমার আবেগ আর তাদের আবেগ তো সমান্তরাল নয়। এক বেলা থাকার মত সুবিধা না থাকলেও আম্মা সুযোগ পেলেই ছুটে যান সেখানে। তার যত টেনশন এই বাড়ি নিয়ে। আমি তো বুঝি আমার মত তার শেকড়টাও সেখানে। আহারে আমার ছেলেটার কোনো গ্রামের বাড়িই নেই। সে তো বড় হয়ে নস্টালজিক হওয়ার জন্যও গ্রামের বাড়ির কোনো স্মৃতিই পাবে না।

ছেলেবেলার কথা বলতে দেখি ভালোই লাগছে। পাঠকের ভালো লাগছে না জানি। আমার লিখতে ভালো লাগছে, তাই লিখছি। সুযোগ যখন পেয়েছি আরো দুয়েকটা প্রসঙ্গ বলেই ফেলি। পুরো ছেলেবেলা লিখতে গেলে তো বিশাল বই লিখতে হবে। আমার মত অভাজনের ছেলেবেলা পাঠক পড়বে কোন দুঃখে। আমি যখন ক্লাশ সেভেনে পড়ি তখন আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে। এই কথা যখন বলি, তখন আমার বোকা ছেলেটা বলে, বাবা আইপিএস চালালেই পারতে। তার কৌতুহল তখন এসি ছিল না? আমি শুনি আর হাসি। অনেক চেষ্টা করেও তাকে হারিকেন বা কুপি জিনিসটা কী সেটা বোঝাতে পারিনি। আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না বলে টিভি দেখতে আমরা ৭/৮ কিলোমিটার দূরে যেতাম। টিভি দেখা মানে বাংলা সিনেমা দেখা। তখন বিটিভিতে বিশেষ দিনে মানে ঈদ, নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। আম্মার অনুমতি নিয়ে আমরা বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে যেতাম। সিনেমা শেষ হতো গভীর রাতে। হেঁটে হেঁটে ফিরতাম। যখন আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এলো তখন মাঝে মাঝে অনুমতি নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যেতাম ‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান’ বা ‘টারজান’ দেখতে। আর জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন দুই ঘণ্টার সিনেমা দেখানো হতো ১২ ঘণ্টায়। তাই আমরা দেখতাম বসে বসে। আসলে সিনেমা দেখাটা উপলক্ষ্য মাত্র, আমরা বন্ধুরা মিলে হইচই করতাম, মজা করতাম, সেটাই আসল।

কয়েকদিন আগে প্রসূনের কয়েকজন বন্ধু এসেছিল বাসায়। দুপুরে খাওয়া শেষে সবাই আবদার করলো তারা ইকবাল রোডের মাঠে যাবে খেলতে। হৈ হৈ করে উঠলো মায়েরা, চেনা নেই, জানা নেই, মাঠে যাবে কেন? বাচ্চাগুলো আবদার নিয়ে এলো আমার কাছে। আমি সবার দায়িত্ব নিয়ে বললাম, আমি যাবো তাদের সঙ্গে। তাতে মায়েরা আশ্বস্ত হলো। মাঠে গিয়ে তারা ঘণ্টা দুয়েক মনের আনন্দে খেললো। আমি তাদের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ নিয়ে দেখলাম। আর ফিরে গেলাম আমার শৈশবে। মাঠ থেকে ফিরে এসে দেখলাম, রাইয়াত নামে প্রসূনের একটা বন্ধু মাঠে যায়নি। কেন যায়নি? তার মাঠ ভালো লাগে না, ভালো লাগে কম্পিউটার গেমস। অন্যরা নাকি মাঠে যাওয়ার সময় তাকে অনেক সাধাসাধিও করেছে। কিন্তু সে রাজি হয়নি। একসঙ্গে যথন ১০টা বন্ধু মাঠে যায়, তখনও রুমে বসে কম্পিউটার খেলছে একটি ছেলে- আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। যখন বিশ্বাস হলো, তখন কষ্টে আমার বুকটা ভেঙ্গে গেলো। ইচ্ছা হচ্ছিল রাইয়াতকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদি। অনেকদিন খাঁচায় বন্দী করে রাখা পাখিকে মুক্ত করে দিলেও সে যেতে চায় না। ঘুরে ঘুরে খাঁচার পাশেই উড়তে থাকে। রাইয়াত আমাদের সেই খাঁচার পাখি।

আমার নিজেকে মাঝে মধ্যে অপরাধী মনে হয়। ভয়ে কুকড়ে যাই। এখনও প্রসূনের কাছে কম্পিউটার গেমসই সবচেয়ে আনন্দের। আমরাও চাই সে কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। কারণ তাহলে সে নিরাপদে থাকলো, আমাদের চোখের সামনে থাকলো। কিন্তু সে তো জানতেও পারছে না, বাইরে কী বিশাল আনন্দময় জগত আমরা তার কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছি। সে যদি বড় হয়ে আমার কাছে জানতে চায়, বাবা তোমার ছেলেবেলা এত বর্ণময়, আমার ছেলেবেলা এত বিবর্ণ কেন? আমি কী জবাব দেবো, আমি জানি না। শুধু প্রসূন নয়, এমন হাজারো, লাখো প্রসূনের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, বেটারা আমরাও তোদের অনেক ভালোবাসি। কিন্তু চারপাশের পরিবেশটাই এমন নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করে যে আমরা সন্তানদের হাতছাড়া করতে চাই না। চারপাশে এমন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে আমরা চাই না, আমার সন্তান ছিটকে পড়ুক। শৈশব থেকে সব বর্ণ চুরি করে আমরা শুধু চাই আমার ছেলে স্কুলে ফার্স্ট হোক, কলেজে ফার্স্ট হোক, ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট হোক, চাকরিতে ফার্স্ট হোক। বাবারা দৌঁড়াও, দৌঁড়াও, আরো জোরে দৌঁড়াও।