প্রেসিডেন্টকে উষ্ণ সংবর্ধনা, ইনশাল্লাহ!

Mira Nair মীরা নায়ার
যমুনা নদীর তীরে আমাদের গ্রামে সেই বছর বন্যা হয়েছিল, দুইজন শিশু ও এক বৃদ্ধ মারা গেছিল কলেরায় আর কলার ফলন সব নষ্ট হয়েছিল, তবু যেন আমাদের আনন্দের বাঁধ মানছিল না । শতাব্দীব্যাপী দুর্দশা থেকে আমাদের রক্ষা করতে গ্রামে পদার্পণ করছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী লোকটা।

সরকারী অফিসার ইসমাইল উদ্দীন ছেঁড়া জুতার মতন মুখ নাড়তে নাড়তে এই খবর দিয়েছিল। গত বছর ইসমাইলের মাধ্যমেই আমরা জেনেছিলাম যে তার কেরাণীর দুভর্াগা বাচ্চাটা জন্মেছিল কোন বৃদ্ধাঙ্গুলি ছাড়াই। আমাদের বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া মুখের সামনে দিয়ে থানা অফিসের পুরানো জীপগাড়িটা ঘরঘর করতে করতে টহল দিল সারা গ্রাম। প্রথমে থামলো গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে, তারপরে পোস্ট অফিস, তারপরে ইনডিপেন্ডেনস হাইস্কুল আর তারপরে যেহেতু নদীতে পড়া ছাড়া আর কোন রাস্তা বাকী ছিলনা তাই আবার ধুলির রাস্তা দিয়ে ফিরে এল গাড়ীটা। প্রতিবার জীপ থামার সাথে সাথেই বিরাট ব্যস্ত মোরগের মতন অফিসার ইসমাইল গাড়ী থেকে লাফিয়ে নেমেই হন্তদন্ত ছুটাছুটি করছিল এইসব দালানের ভিতরে-বাইরে। আমরা যারা সেইসময় পোস্টমাস্টার অথবা ব্যাংক ম্যানেজারের জন্য টিফিনে চা অথবা আলুর চপ নিয়ে যাচ্ছিলাম কপাল গুনে ইসমাইলের চিকন গলার সব কথাই শুনতে পেয়েছিলাম। সেদিন চায়ের দোকানে আমরা ছিলাম দারূণ জনপ্রিয় । বিকালের মধ্যে গ্রামের সবার কাছেই খবর পৌঁছে গেল। এমনকি যারা দূর দূরান্তের পাট ক্ষেতে কাজ করছিল তাদেরকেও এই পার থেকে চিৎকার করে জানানো হলো।

সেই সন্ধ্যায় মোহাম্মদ বরকত মাষ্টারের রঙীন টিভি ঘিরে ভীড় জমলো। বরকত মাষ্টার ইনডিপেন্ডেন্স স্কুলের হেডমাস্টার। তাঁর বাড়ীতে প্রায়ই টিভি দেখি আমরা। যদিও মাষ্টারের বউটা মাঝে মাঝে গজগজ করে। সেদিন আমাদের বউরাও টিভি দেখার বায়না ধরলো। আমরা রাজী হওয়াতে তাড়াতাড়ি ভাত খাইয়ে, ময়লা থালাবাসন পরে ধোওয়ার জন্য জমিয়ে রেখে তারাও হেডমাস্টার সাহেবের বাড়ী চললো। মহিলারা সব স্যারের বাড়ীর বাইরের জানালার সামনে জড়ো হলো, আর বাচ্চাদের মাধ্যমে ঘরের ভিতরে অনুরোধ পাঠালো আমাদেরকে একটু সরে দাঁড়াতে যাতে জানলা দিয়ে তারাও টিভি দেখতে পায়। খবরের সময় হতে হতে ঘরের মধ্যে একদম ঠাসাঠাসি ভীড়, যেন আমরা বাসে করে শহরে যাচ্ছি।

সংবাদ পাঠিকা জয়পুর আর প্রেসিডেন্ট এর নাম একই বাক্যে উচ্চারণ করার সাথে সাথে খুশীতে সিটি বাজাতে শুরু করি আমরা। আর স্বয়ং মানুষটিই যখন আবির্ভুত হলেন টিভির পদর্ায় আমাদের উল্লাস আর দেখে কে! লম্বা, ঋজু মানুষটা ছাই রং এর সু্যট আর লাল রঙের টাই পরে পাঁচতারা হোটেলের লনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, চারপাশে ভীড় করে দাঁড়ানো নারী-পুরুষদের কত তুচ্ছ লাগছিল তাঁর তুলনায়! সূর্যের আলোতে তাঁর কাঁচাপাকা চুল ঝকমক করছিল আর লাবণ্য উপছানো চেহারাটা লাল টুকটুক দেখাচ্ছিল কড়া রোদে। আমরা কেউ কেউ টিভির দিকে পয়সা ছুঁড়ে দিয়েছি যেন বড় পর্দায় আমাদের সবচেয়ে প্রিয় পর্দা কাঁপানো একশান হিরোকে দেখছি।

‘আহা! কি সুন্দর গায়ের রঙ মানুষটার। একদম দুধে আলতা!’ থই হারানো খুশীতে জানালো একজন।

‘দেখ দেখ! কি সুন্দর হাসিটা! আমেরিকায় সবার দাঁত খুব সুন্দর।’ এই কথা যে বললো সে বৈদেশিক বিষয়ে নিজেকে একজন বিশেষ সমঝদার মনে করে কারণ তার চাচা ১৯৫৪ সালে আমেরিকা চলে গেছিল যদিও এর পরে আর কখনো ফিরে আসে নাই অথবা চিঠিপত্রও লিখে নাই কোন।

‘প্রেসিডেন্ট সাহেবের বেগম সাহেবার চুলের রং হলো সোনালী। তিনিও নাকি কোন ইলেকশানে দাঁড়াচ্ছেন। আল্লাহ আল্লাহ করেন যাতে জিততে পারেন তিনি।’ হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে বসে বললেন বরকত মাষ্টার। আমরা ঘরের বাকী সবাই সাথে সাথে সমস্বরে বললাম ইনশাল্লাহ। টিভির পর্দায় তখন প্রেসিডেন্ট একটা সাদা সিল্ক সোনালী জরীর পাঞ্জাবী পরা বাচ্চা ছেলের সাথে রকমর্দন করছেন নীচু হয়ে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে এমন মায়াভরা হাসি দিলেন একটা যেন তাঁর নিজেরই ছেলে। হাসির সময় চোখের কোনের বলিরেখাগুলি সব জোড়া লেগে চোখ একদম বন্ধ হয়ে এল। তারপর প্রেসিডেন্টের বদলে খবর পাঠিকাকে দেখা গেল পর্দায়। যদিও আমরা মহা উৎসাহে দুয়ো দিলাম তাকে, তবুও অনড় সে খবর পড়তে লাগলো। ‘মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল কিনটন আগামী ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের মাটির মানুষদের সাক্ষাৎ উদ্দেশ্যে জয়পুর যাবেন’ সে বললো।

‘বাংলাদেশ সরকার জয়পুর এলাকায় বড় মাপের বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করছে এবং এ বিষয়ে পল্লী উন্নয়ন কমিটি একটি বিস্তারিত কর্মসূচী গ্রহণের ব্যাপারে পরামর্শ সভা…’ বেচারী তার ছোট মুখ থেকে অনেক বড় বড় শব্দ চিপে চিপে বের করছিল সরকারী টিভির পরম্পরা অনুযায়ী। আমরা অবশ্য আর কিছু শুনছিলাম না। মহানন্দে আমরা তখন বলাবলি করছিলাম যে আর মাত্র ১০ রাত আর ৯ দিন বাকী আছে।

গ্রামের ঠিক মাঝখানে দাঁড়ানো ১৫০ বছরের পুরানো বট গাছের নীচে আমরা মিটিং ডাকলাম পরদিন বিকালে। ইসমাইল উদ্দীন শুরু থেকেই খুব গম্ভীর আচরণের মাধ্যমে সভার সকলের মনোযোগ আকর্ষনের চেষ্টা করছিল।

‘পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ডেপুটি সেক্রেটারী নিজে আমাকে সরাসরি ফোন করেছিলেন ঢাকার থেকে’, বলে সে হাততালির আশায় থামলো একটু। আর আমরা কিছুই না বলে কানে গুঁজে রাখা বিড়ি ধরালাম এই সুযোগে।

‘আমি কিনটনকে গ্রামীণ ব্যাংক, কৃষি উন্নয়ন সংস্থার অফিস ইত্যাদি সব ঘুরে দেখাবো আর গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন উনি’… বলে যাচ্ছিল ইসমাইল অফিসার।

আমরা তো চমকে উঠলাম একেবারে! ব্যাটার সাহস কত বড়। প্রেসিডেন্টকে নাম ধরে ডাকে। এই শালা ভাবে কি নিজেকে। মনে হয় যেন প্রেসিডেন্টের বাপের আকিকার সময় দাওয়াত পাইছিল। আমরা নিজেদের মধ্যেই গজগজ করলাম ইসমাইলের এহেন অসম্মানমূলক আচরণ ল্য করে।
‘এই মাঠে একটা বড় গেট সাজাবো, স্টেজ বানাবো। ঢাকা থেকে এই খাতে বেশ বড় অংকের টাকা স্যাংশান করা হয়েছে’… আবার থামলো ইসমাইল দম নেয়ার জন্য, আমাদের দেখলো তী্ন চোখে।

আমরা আবার চোখ সরিয়ে নিয়ে গাছের পাতার আড়ালে আকাশ নীরিন করলাম খানিকন।

‘প্রেসিডেন্ট সাহেবকে লা-জওয়াব একখান সম্বর্ধনা দিতে হবে আমাদের!’

বরকত স্যার হঠাৎ উঠে এসে ইসমাইল উদ্দীনের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন ‘ভাইসকল মঞ্চ তৈরীর কাজে কে কে আছেন আপনারা, হাত তোলেন।’ প্রায় সবাই সাথে সাথেই হাত তুললাম তাঁর কথায়। এই দৃশ্যে বেচারা ইসমাইলের মুখচোখ কালো থমথমে মেঘের মত হয়ে গেল আর বরকত মাষ্টার আমাদের মধ্য থেকে আট জনকে বেছে নিলেন মঞ্চ তৈরীর জন্য, সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেবেন শ্রদ্ধেয় প্রেসিডেন্ট সাহেব। এরপর হেডমাষ্টার সাহেব বললেন ‘প্রেসিডেন্ট সাহেব গ্রামের স্কুল পরিদর্শন করতেও যাবেন এবং…’

‘ না না স্কুলে যাওয়ার মত সময় নাই। আমাকে ঢাকার থেকে রুটিন কনফার্ম করা হয়েছে।’ হেডমাষ্টারের কথা শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি এই নিষেধাজ্ঞা জারি করলো ইসমাইল। ব্যাটার দিকে তাকিয়ে আমরা রাগে ফোস ফোস করতে থাকলাম।

বরকত মাষ্টারের ইনডিপেন্ডেনস স্কুলে আশেপাশের তিনটা গ্রামের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখতে আসে অথচ স্কুলের ফান্ড বলতে কিছু নাই। প্রতিদিন ভোরবেলায় মাস্টার সাহেবের ছোট ছেলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্টিলের থালায় কঞ্চি দিয়ে বাড়ী মারে স্কুল শুরু হওয়ার আগে। স্কুলে এমনকি একটা ঘন্টাও নাই আমাদের ছেলেমেয়েদের জাগানোর জন্য। আমাদের মতে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে স্কুলটা দেখানো গেলে একটা উচিৎ কাজ হবে।

‘সারা দুনিয়ার সব বড় বড় নেতারা উনার কথায় উঠে বসে। উনি নিশ্চয়ই আমাদের স্কুলের জন্য কিছু টাকা জোগাড় করে দিতে পারবেন।’ বললাম আমরা।

‘প্রেসিডেন্টকে স্কুল দেখাতে হবে, প্রেসিডেন্টকে স্কুল দেখাতে হবে’, কয়েকজন বিড়বিড় করে বলা শুরু করলে আস্তে আস্তে কথাগুলি সারা সভায় শ্লোগানের মত ছড়িয়ে গেল।

‘দেখি…দেখা যাবে…মন্ত্রী সাহেব… আমার ফোন করে জানতে হবে’, তোতলাতে তোতলাতে জানালো ইসমাইল আর তারপর তাড়াহুড়া করে জীপগাড়িতে চড়ে পালালো।

পরে নিজের অফিসে বসে টিফিন খেতে খেতে ইসমাইল বললো ‘ইইহ! কোথার থেকে আসছে এক একজন রাজা মহারাজ। আরে তোদের এই গুয়ের গর্তের মধ্যে যদি ঢাকা শহরের একজন সরকারী পিয়নও আসে তাহলেও বিনয়ে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার কথা তোদের। আর সেই জায়গায় আসছেন স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আর এই ব্যাটারা ট্রাফিক পুলিশের মতন তাঁর সমস্ত চলাফেরায় খবরদারী করতে লেগেছে। যত্তোসব!’ এই কথা বলার সাথে সাথেই নাকি এক টুকরা রুটি গলায় ঢেকে কাশতে কাশতে মারা যাচ্ছিল ব্যাটা। আল্লাহকে নারাজ করলে এইরকমই শাস্তি হয়।

পরের দিন খুব ভোরে স্কুলের ছেলেমেয়েদের জড়ো করে হেডমাস্টার নিয়ে আসলেন মাঠে, সাথে ব্যান্ড পার্টি। ব্যান্ড এর তালে তালে মার্চ করতে করতে সারা গ্রাম ঘুরবে ওরা। ব্যান্ডপার্টির প্রায় সবাই মোটামুটি বুড়া হাবড়া। ট্রামপেডে ফু দিতে গেলেই দম চলে যায় বেচারাদের আর ভারি ভারি এতসব যন্ত্রপাতি বহন করা তো দূরের কথা। বেশীর ভাগ সময় গ্রামে বিয়েশাদী লাগলে এদের ভাড়া করে আনা হয় জনপ্রিয় সিনামার গান বাজানোর জন্য। আর আজকে এরা বাচ্চাদের সামনে সামনে বাজনা বাজাতে বাজাতে লেফ্ট রাইট লেফ্ট রাইট করছিল। বেগুনী পোশাকের উপর ঝলমলে সোনালী জরীগুলি চিকমিক করছিল রোদে। আমরা কাজে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে পাশে থেমে গেলাম – মাছের ঝুড়ি, তরি-তরকারি সব যেমন কি তেমন পরে রইল সাইকেলের সাথে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই স্বর্গ দৃশ্য দেখতে থাকলাম। বাজনার সুরে সুরে সারা গ্রামের আকাশ বাতাস মুখর হয়ে উঠলো, আমাদের মাথায় ঘুরতে লাগলো চনমন করা গানের সুর আর গ্রামের আবহাওয়ায় লাগলো উৎসবের ছোঁয়া।

মাষ্টার সাহেব ঠিক করেছিলেন স্কুলের বাচ্চারা প্রথমে প্রেসিডেন্টের শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানাবে। বিজ্ঞানের স্যার ইউনুস মাস্টার তাই তাদের পিটি শেখাচ্ছিলেন গ্রামের অফিসঘরের সামনে লাইন দাঁড় করিয়ে।

‘এক দুই তিন, এক দুই তিন’ গুনতে গুনতে আর লাফাতে লাফাতে মহা উদ্যমে ইউনুস স্যার তাঁর দুইহাত বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে আনছিলেন কাঁধের উপর দিয়ে আর স্কুলের ছাত্ররাও ব্যায়াম করছিল দেখাদেখি। আমরা উৎসাহ দেয়ার জন্য তালি বাজাতে থাকি। ইসমাইল উদ্দীন একবার উঁকি দিল অফিসঘরের জানালা দিয়ে, এমন এক মুখভঙ্গি করলো যেন এই মাত্র কাঁচা তেতুলে কামড় পড়েছে।

‘আরি বাপরে! এই চ্যাঁচামেচি তো মনে হয় বেহেশত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বেচারা আল্লাহতায়ালা নিজেও তো কোন কাজ করতে পারছেন বলে মনে হয় না।” ব্যাটা কাফির মন্তব্য করলো।

এরপরের দিনগুলিতে আমাদের স্ত্রীরা তাদের উঠানের বাগান আর মুরগীর খোঁয়ার ফেলে রেখে রাসতার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে যার যার বাচ্চাদের প্রস্তুতি দেখতে লাগলো –

‘ প্রেসিডেন্টের সামনে মার্চ করা বিরাট সম্মানের ব্যাপার। ওইদিন অজ্ঞান হলে সারা গ্রাম শুদ্ধা হাসবে তোরে দেখে। মনে রাখিস!’ আর কোনদিন কারো বাচ্চা আসলেই যদি অজ্ঞান হয়ে পরে তীব্র গরমে, সেই রাতেই তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে ডিম খেতে দেয়া হয় সবল করার আশায়।

তবে ইসমাইল উদ্দীন এখনো ঘোরাচ্ছিল মাষ্টার সাহেবকে। কিছুতেই বলছিল না প্রেসিডেন্ট সাহেব শেষমেষ স্কুল পরিদর্শন করতে পারবেন কিনা। জিজ্ঞেস করলে বিড়বিড় করে হয় বলে ঢাকায় ফোন লাইন পাওয়া যাচ্ছেনা অথবা মন্ত্রীসাহেব প্রেসিডেন্টকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারছেন না।
আমরা বেটাকে গালি দিলেও মাস্টার শুধু পান চিবাতে চিবাতে হাসতেন।

আমরা যারা লেখাপড়া জানি তার চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চিতে বসে অন্যদের খবরের কাগজ পড়ে শোনাই। আর চায়ের দোকানের মালিক মাঝে মধ্যে বিনা পয়সায় চা খাওয়ায় আমাদের। কাগজে লিখেছে প্রেসিডেন্ট একটা সাদা কলারওয়ালা নীল স্ট্রাইপ জামা গায়ে মন্ত্রীদের সাথে মুগর্ীর কোর্মা, বিরিয়ানী, মাছের ঝোল আর চিংড়ির মালাইকারী খেয়েছেন। সেমাই খেয়েছেন দুইবাটি! আহা এই মানুষটা আমাদের দেশের খাবার দাবার কত ভালোবাসেন! আমাদের মন মমতায় আদ্র হয়ে ওঠে। কাগজে আরো লিখেছে যে প্রেসিডেন্ট মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য স্মৃতি সৌধ দেখতে যেতে চেয়েছেন।

‘আহারে! এই ফেরেশতার মতন লোকটাকে খুবই আপন লাগছে আমার – একজন বললো, যে অনুভুতিটা অন্য সবার মধ্যেও বাড়ছিল ধীরে ধীরে। বিশেষ করে প্রতি রাতে টিভিতে তাঁকে যেহেতু দেখতাম আর খবরের কাগজে পড়তার তাঁর কথা প্রত্যেক সকালে। আমাদের ছেলেমেয়েরা কাগজ থেকে তাঁর ছবি কেটে নিয়ে দেয়ালে ফ্রেমওয়ালা কাবাঘরের ছবির পাশে সাজায়।

‘তোমরা যদি আসলেই মনে কর যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এই গ্রামে আসবে তাহলে তোমাদের মতন পাগল ভূ ভারতে নাই’। আব্দুল চাচা তার টিকে যাওয়া শেষ দুটি দাঁতের ফাঁক দিয়ে পিচিক করে পানের পিক ছিটাতে ছিটাতে ঘোষণা দিল। তার কুর্তার পাশ পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করে নাড়তে নাড়তে অভিমানী চোখে তাকালো আমাদের দিকে। আমরা হতাশ চোখে এর ওর দিকে তাকাই, খাইছে! আবার সেই পুরানা কাসুন্দি। আগেও অগুনতিবার এই জিনিষ দেখেছি আমরা – তাঁর ১৯ বছর আগেকার জমির দলিল।

দুই বছর আগে এক বন্যায় আব্দুল চাচার জমি আর কলাবাগান যমুনা নদীর পেটে চলে গেছে। সে বছর আমাদের প্রায় সবাই কিছু না কিছু বা কাউকে না কাউকে হারিয়েছি। সরকারি হেলিকপ্টারগুলি গ্রামের আকাশে আকাশে পোকামাকড়ের মতন উড়েছে আর মড়কের মতন হুড়মুড়িয়ে মন্ত্রীরা এসেছে গ্রাম পরিদর্শনে। তারা মমতাভরা হাসির সাথে কথা দিয়েছে যে আমাদের বাড়িঘর টাকাপয়সার ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তারপর উড়ে গেছে হেলিকপ্টারে চড়ে। আমরা একটা টাকাও চোখে দেখি নাই, তাঁদের থেকে খবরও পাই নাই কোন।

একমাত্র আব্দুল চাচা পরম ধৈর্য্যে চিঠি লিখে গেছে সরকারী অফিসে। আর তার জবাবও দিয়েছে কখনও কখনও। কিন্তু সেইসব জবাব পাকানো সুতার গুলির মতন। শুরু নাই শেষ নাই। আর শেষ পর্যন্ত পঁ্যাচাতে পঁ্যাচাতে ল্যাজা-মুড়া আলাদা করা যায় না। এখন আব্দুল চাচা আর কিছুই বিশ্বাস করে না। বিশেষ করে ভালো খবর।

‘তো তোমরা মনে করছ যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বটগাছের নীচে এসে বসে পড়বে আর তোমরা সবাই তাঁর সাথে ভাব জমাবা’, আব্দুল চাচা তার হলুদ দাড়ির ঝামটা দিয়ে বললো ‘ সব গাধা আর মুর্খের দল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন একটু বুদ্ধিশুদ্ধি দেন তিনি তোমাদের।’ এই বলে গটগট করে মসজিদের দিকে রওনা হয়ে গেল।

‘ওরা হয়তো আমাদেরকে রেশনের দোকানের মত লাইনে দাঁড় করাবে। কিন্তু টিভিতে যেমন দেখায় প্রেসিডেন্ট সাহেব ঠিকই নীচু হয়ে চুপ করে শুনবেন আমাদের কথা।’ এত জোরের সাথে একজন কথাগুলি বলল যে আমাদের সবার মনে হতে লাগলো আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই জয়পুরের কপাল ফিরে যাবে।

প্রেসিডেন্ট এর আসার তারিখের দুইদিন আগে থেকে গ্রামে লোক জড়ো হতে শুরু করলো। আশেপাশের গ্রামের থেকে স্রোতের মতন আসলো তারা। যুবকেরা আসলো ফিল্মস্টারদের মতন চুলের ঢঙ করে, মহিলারা কাঁখে বাচ্চা নিয়ে দুধেল গাই টানতে টানতে পেঁৗছালো। বৃদ্ধরা আসলো বয়সের ভারে নীচু হয়ে। কেউ এলো ট্র্যাকটারের উপরে চড়ে, কেউ গরুর গাড়ীতে, কেউ সকাল বিকাল বাসের মাথায় চড়ে আর কেউ বাইসাইকেল চেপে। কেউ হেঁটে হেঁটে আসলো , ছয়, নয়, মাঝে মাঝে বারো মাইল । মাথায় বয়ে আনলো তিনদিনের খাবার মতন ডাল চাল।

আমরা অভিভুত হয়ে দেখলাম লাল মাটির রাস্তু দিয়ে ধুলা উড়িয়ে ঠেলাঠেলি করতে করতে সবাই আমাদের গ্রামে আসছে। কেউ কেউ দুইটা বাঁশের আগায় তেরপল টাঙিয়ে দিয়ে দোকান বসিয়ে ফেলল রাস্তার ওপরেই। লজেন্স, খেলনা পিস্তল, কাঁচের চুড়ি, ঝালমুড়ি কত কি বিক্রি হতে লাগলো। জুতা সেলাই আর নাপিতের দোকান বসে গেল, ছেলেমেয়েরা গ্লাসে করে ঝাল বোরহানী আর মিষ্টি ফেরী করে বেড়াতে লাগলো।

বিভিন্ন বাড়ীর মেঝে আর উঠান পরিষ্কার করে শিশু ও ছোট বাচ্চাদের ঘুমের বন্দোবস্ত করা হলো। নানী-দাদীদের ঘেষাঘেষি জায়গা হলো পোষ্ট অফিসের বারান্দায়। যুবকরা সব ব্যাংকের ছাদে ঠাঁই নিল। ইসমাইল অফিসার হুকুম দিল মাঠের উপরে থাকার জায়গা করে দিতে অন্য গ্রামের লোকজনদের। মাটির চুলায় রান্না করা শুটকি মাছের গন্ধ বাতাস ভারী করে তুললো। কেউ কেউ বললো ৫০০০ নতুন লোক এসেছে গ্রামে। আব্দুল চাচা কসম খেয়ে বললো অন্তত ১০০০০ উল্লুকের চেয়ে কম হবে না। আমাদের অবশ্য এ নিয়ে মাথাব্যাথা ছিল না কোন। মেলা বসে গেছিল গ্রামে – রোজগারও হচ্ছিল প্রচুর।

বরকত স্যারের টিভিতে রোজ রাতে প্রেসিডেন্টকে দেখি। কোন বাণিজ্য মেলায় ভাষণ দিচ্ছেন, অথবা নতুন ড্যামের উদ্বোধন করছেন বিশাল একটা লাল বোতাম টিপে, বা চোখ বন্ধ করে হেরে গলার বাউল গান শুনছেন। টিভির পর্দায় আমাদের দিকে চেয়ে ঝলমলে হাসেন তিনি আর আমরাও হাসি ফেরত দেই টিভির দিকে চেয়ে। আর অপো করি।

মাষ্টারই প্রথম তুললেন টয়লেটের কথা। ইসমাইল এসেছিল বট গাছের নীচে মঞ্চ বানানোর প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করতে। রাসভারি ভাবে পায়চারি করছিল সে দুইহাত পিছনে মুড়ে আর তার পিছন পিছন হিসাবের খাতা আর কলম নিয়ে অনুগত কুকুর ছানার মত ঘুরঘুর করছিল গ্রাম অফিসের বড়বাবু। কাঠের মঞ্চটার চারপাশে তৃতীয়বার রাউন্ড দেয়ার পথে বরকত স্যার তাকে থামালেন।

‘ আচ্ছা… যদি.. মানে প্রেসিডেন্টের প্রস্রাব পায় যদি, তাহলে কি হবে? এই বিষয়ে কিছু চিন্তা করেছেন অফিসার সাহেব?”

কথা শুনে ইসমাইল হোঁচট খেতে খেতে সামলালো।

‘প্রসাব পাওয়ার তো কথা না। আসবেই তো মাত্র দুই এক ঘন্টার জন্য। আর সারা দুনিয়ার নেতা মানুষ হিসি সামলাইতে পারবেনা এটা একটা কথা হলো? এইসব বিষয়ে ওদের ট্রেইনিং থাকে।’ ধমকালো ইসমাইল।

‘কিন্তু, তারপরেও যদি.. মানে তাঁর বয়স তো হচ্ছে, আগের মত হয়তো সামলাতে পারবে না..’

আমরা সবাই জোরে সোরে সায় দিলাম যে এটা একটা নিতান্তই সম্ভবপর সম্ভাবনা। ইসমাইল এমন রাগত চোখে আমাদের দিকে তাকালো যেন প্রেসিডেন্টের হিসি পাওয়াটা আমাদেরই দোষ।

‘টয়লেট করতে চাইলে উনি অবশ্যই টয়লেট যাবেন.. আমার..’ বলতে বলতে আমাদের সবার মতনই একই চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে থেমে গেল অফিসার।

‘আপনার অফিসঘরের পায়খানা! ওই জায়গায় তো ছাগলেও মুতবে না’। আমরা বললাম।

ইসমাইলের অফিসঘরের পাবলিক টয়লেট সারা প্রামের একমাত্র। সবাই – অফিসের কর্মচারী থেকে শুরু করে, ফেরিওয়ালা, ফকির মিসকিন যে কেউ ব্যাবহার করে যথেচ্ছভাবে। এইরকম দুর্গন্ধ বের হয় সেখান থেকে যে গরমকালে এমনকি তিনঘর দূরে বসা মানুষেরও দম আটকে আসে।

‘তাহলে আর কি করা, সবার সাথে তাকেও ক্ষেতেই যেতে হবে’, বরকত হালছাড়া সুরে বললেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আর পিছে পিছে তার বন্দুকধারী দেহরীরা প্রসাবের বেগ সামলাতে না পেরে ক্ষেতে দৌড়াচ্ছেন এই কথা চিন্তা করে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লাম আমরা।

‘ না না কি বলেন আজেবাজে কথা’ ইসমাইল মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বরকত স্যারের কথা ডিসমিস করে দেয়।

কিন্তু এই প্রথমবারের মত তাকে চিন্তিত দেখায়। ‘হায় হায় এখন কি করি! সময় তো শেষ প্রায়।’ তার উঁচু গলার চিল্লানী শুনে আমরা হাসি লুকাই।

‘হুমম..’ মাস্টার সাহেবের কপাল কুঁচকাতে কুঁচকাতে মাথায় উঠে গেল। ‘ অবশ্য স্কুলের জন্য যে পায়খানাটা বানানো শুরু করেছিলাম আমি ওইটা আছে। প্রায় তো শেষ। একটা দরজা দরকার শুধু। ‘ শেষ পর্যন্ত বাতলান তিনি যেন কথাটা এইমাত্রই মনে আসলো তাঁর।

আরে তাইতো! আমরা হাত দিয়ে কপাল চাপড়াই। স্কুলের টয়লেটের জন্য স্যাংশান করা টাকা শেষ হয়ে গেছিল কন্ট্রাকটার দরজা বা কনকি্্রটে রঙ লাগানোর আগেই। বাচ্চারা এখনো স্কুলের আসেপাশের ঝোপঝাড়েই বাথরুম সারে অথবা বাড়ী দৌড়ে আসে। কয়েক মাস বৃথাই গ্রামের অফিসে ঘোরাঘুরি করার পরে বরকত স্যারও হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর এখন সমাধান হাতের নাগালে। প্রেসিডেন্টের জন্য নতুন টয়লেট তৈরীই আছে। এর প্রতিবাদে প্রথমবারের মতন ইসমাইলেরও কিছু বলার ছিল না।

সেইদিন দুপুরেই আমরা কয়েকজন শহরে গেলাম আর বিজয়ীর মত ফিরে আসলাম একটা ঝলমলে নতুন এলুমিনিয়ামের দরজা নিয়ে। চারজন মিলে ধরাধরি করে দরজাটা নামালাম ঝক্কর মক্কর ট্র্যাকটরের থেকে। সূর্যের আলো পড়ে ধাতুর দরজাটা একটা ঝলমলে তররে রূপান্তরিত হয়ে গেল, অন্ধ করে দেয়া আলো ফেলতে লাগলো পথচারীদের চোখে মুখে, লাজুক মেয়েদের চোখে, গাছের মাথা, ঘরের ছাদ আলোকিত করতে করতে বাহিত হচ্ছিল সে.. যেন শুধু একটা দরজা নয় – বরং একটা আহবান, ঘোষণা যা শুনে স্কুলের টয়লেটের পাশে ভিড় জমতে থাকলো।

অনেকেই কনক্রিট রং করতে সাহায্য করতে চাইছিল। কিন্তু এই সম্মান আমরা কাউকে দিতে চাই নাই। আমরা প্রবল মনোযোগে দরজা লাগালাম আসে পাশের লোকজনের নানারকম পরস্পরবিরোধী পরামর্শ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। দেয়াল রং করলাম। দেয়ালের রং হলো সাদা আর দরজার জন্য ঝলমলে নীল রঙ। তারপর কয়েকজন বাচ্চাকে একটাকা করে দিলাম যাতে জান গেলেও টয়লেটে ঢুকতে না দেয় কাউকে।

রং শুকানোর পরে বরকত স্যার জমাদারকে দিয়ে বাথরুম মাজালেন ঝকঝক না করা পর্যন্ত। একটা পরিষ্কার বালতি ভরতি পানি এবং মগ রাখা হলো এক পাশে। যদিও ফাসও কাজ করছিল। তারপরে একটা ভারী স্টেইনলেস স্টিলের তালা দিয়ে বাথরুম বন্ধ করে চাবি রেখে দিলেন নিজের পকেটে।

আমরা বিড়ি টানতে টানতে নতুন টয়লেটের আশে পাশে দাঁড়িয়ে খোশ গল্প করছিলাম, তখন মাস্টার বললেন ‘টয়লেটটা এখন এক কুমারী কন্যার মতন’। ‘যেন নববধু বাসররাতে অপো করছে বরের জন্য’। বরকত স্যার যে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমের কবিতা পড়েন আমরা জানি। ওঁর অফিসে ছাত্রদের মার্কশিটের আড়ালে এইসব কবিতার বই লুকানো থাকে। ‘ আর দরজাটা… বেহেশতী নীল রঙে রং করা..’ বলতে থাকেন মাস্টার সাহেব। আমরা ইসমাইলের অবস্থা দেখার জন্য মুখ ফেরালাম। তাকেও খুশী লাগছিল। শেষ বিকালের আলোতে সাদা আর নীলে মিশে চিকমিক করছিল টয়লেটটা। আর নতুন রঙের গন্ধে বাতাস মাতোয়ারা। আমাদের পুরানো গ্রামের – ভাঙাচুড়া ছনের ঘর, টিনের ঘর, গোরুর গোবর, হাজার বছরের পুরানো দালানবাড়ীর ভীড়ে টয়লেটটাই একমাত্র নতুন।

‘ আশা করি গ্রাম দেখতে এসে প্রেসিডেন্ট সাহেব টয়লেটটা ব্যাবহারের সুযোগ পাবেন’, আমরা স্কুলের মাঠ ছেড়ে আসার সময় বরকত স্যার বললেন। ইসমাইল তাঁর দিকে তাকালো। ‘অবশ্য টয়লেট দেখতে হলে তাঁকে স্কুলে আনতে হবে, তাই না?’ পথ চলতে চলতে বলতে থাকেন হেডমাস্টার।

আমরা শ্বাস বন্ধ করে অপো করি।

‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিকাছে! আধা ঘন্টার জন্য তাঁকে স্কুলে আনা হবে। তোমাদের ওই মিসকিনগুলিকে কালকে অন্তত ইউনিফর্ম পরাইও দয়া করে । আর কেউ জুতা ছাড়া আসলে তাকে কাসের পিছনে পাঠাবা।’ ইসমাইল প্রায় দৌড়ে চলে যেতে যেতে বলে গেল।

‘ওরা ওদের ইংরাজী বই থেকে রিডিং পড়বে আর ওয়াশিংটন বানান করে শোনাবে’, মাস্টারসাহেব ইসমাইলের পেছনে চেঁচালেন । কিন্তু ইসমাইল ফিরে তাকালো না। তাকালে দেখতে পেত আমরা এত জোরে মাস্টারের পিঠ চাপড়াচ্ছিলাম যে প্রায় কাশি উঠে গেছিল তার।

সকাল ১১টায় পৌঁছানোর কথা প্রেসিডেন্ট সাহেবের। সাতটার মধ্যেই গ্রামবাসীরা ভীড় জমালো মঞ্চর চারপাশে, স্কুলের উঠানে, গ্রামে ঢাকার রাসতা জুড়ে দাঁড়ালো তারা, ব্যাংকের ছাদের উপরেও। মোট কথা যেখান থেকেই মহামানবকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই ভীড় করে দাঁড়ালো তারা। সবুজ স্কুলের পোশাকে বাচ্চারা ইতিমধ্যেই সারবেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল ব্যান্ডপার্টির পাশে। বরকত মাস্টার ব্যস্ত হয়ে গেলেন ছাত্র ছাত্রির তদারকিতে। এমনকি আব্দুল চাচাও বাড়ীর বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল তাঁর সবচেয়ে ভালো কালো পাঞ্জাবী গায়ে।

ইসমাইল বসে ছিল অফিস ঘরের সামনে ইস্তিরি করা সাফারী সু্যট পড়ে। অপো করছিল ঢাকার টেলিফোনের। জিপ গাড়ী দাঁড়িয়েছিল বাইরে ইঞ্জিন চালু অবস্থায় যাতে প্রেসিডেন্ট পৌঁছানোর সাথে সাথেই একমিনিটও সময় নষ্ট না হয়। কিন্তু ফোন আসে নাই এখনো। আমরা দোয়া করছিলাম দরকারের সময় যাতে ডেড হয়ে না যায় ফোন। আমরা তার অফিসের চারপাশে ঘুরঘুর করলাম, কিছুন পরপর জানালা দিয়ে দেখে পরিস্থতি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। আমরা এই দিনটার একটা মুহুর্তও হারাতে চাইছিলাম না।

১০:৩০ এ ফোন বাজলো আর ধরার আগে ইসমাইল লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অনেকন ধরে শুনলো সে আর দুই একটা কথাও বললো আর পর সযত্নে ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলো রিসিভার। তারপর জীপগাড়িতে চরলো হেঁটে গিয়ে, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের উপো করে। কিছুন চুপ করে গাড়ীতে বসে থাকলো সে, যেন কোথায় যেতে হবে প্রথমে বুঝতে পারছিল না। তারপর গাড়ী ঘুরিয়ে দারুণ তাড়হুড়ায় চললো মঞ্চের দিকে। সেখানে সে ইঞ্জিন বন্ধ করলো না, গাড়ি থেকেও নামলো না। গাড়ীর বাইরে অর্ধেক ঝুলতে ঝুলতে বললো –

‘প্রেসিডেন্ট আসতে পারবেন না। আমেরিকার সেক্রেটারী বলেছে এখানে আসলে প্রেসিডেন্টের জন্য হুমকি স্বরূপ হতে পারে আমাকে আর কিছু বলে নাই ওরা, এইটুকুই আমি জানি তাই আমাকে দোষ দিয়েন না আপনারা’ আমরা তখনও আধা ঘোরের মধ্যে আস্তে আস্তে তার দিকে মুখ ফিরাচ্ছিলাম।

তারপর সে জীপ ঘুরিয়ে চালিয়ে নিল বরকত মাস্টার আর স্কুলের বাচ্চাদের কাছে। সেখানেও সে একই ভাবে গাড়ীর থেকে চীৎকার করে এই দুঃসংবাদ দিল। নামতে সাহস করলো না সে, হয়তো মার খাওয়ার ভয়ে। তারপর সে বাড়ী ফিরে গেল। সব জানালা দরজা বন্ধ করে বসে থাকলো এবং পরের দুইদিন কিছুতেই বের হলো না।

বরকত স্যার বাচ্চাদেরকে বুঝিয়ে বললো প্রেসিডেন্ট আসবেন না কারণ তাঁর প্রানের ঝুঁকি আছে। ঠিক কি রকম ঝুঁকি জানেন না তিনি। তারপর ঘুরে ঘুরে সবাইকে এই শোক সংবাদ দিতে হলো তাঁর এবং সবাই শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলো যে প্রেসিডেন্ট আসবেন না জয়পুরে।

সারা গ্রাম শোকে থমথম করছিল। ১০০০০ নারী পুরুষ যে এত চুপচাপ হয়ে যেতে পারে কে জানতো। গতকালের আনন্দে মাতোয়ারা মানুষেরা আজ স্থানুবত। রেডিও তে বললো যে আমেরিকার সিকরেট সারভিস এর কাছে নাকি খবর পৌঁছেছিল যে ওইদিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে জয়পুর সফর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতো। এমনকি সেদিন স্মৃতিসৌধ দেখতে যাওয়াও বাতিল করতে হয়েছিল তাঁর। ইস যদি ওরা আমাদের একটা সুযোগ অন্তত দিত তাঁকে বলার জন্য যে আমরা কেউই তাঁর খারাপ চাই নাই।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে কেউ কেউ তাদের খালি ঝুড়ি আর কম্বল তুলে নিয়ে নিজ নিজ গ্রামের দিকে রওনা হচ্ছিল। কেউ কেউ যেতে যেতেও থেমে দাঁড়িয়ে দেখছিল আমরা দোকান, তাবু সব গুটাচ্ছিলাম। আমাদের সাহায্যও করলো অনেকে।

বরকত মাস্টার এ সমস্ত ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে বটগাছের নীচে বসেছিল চুপচাপ। কয়েকজন বসেছিল তার কাছাকাছি। চুপচাপ, দুঃখের সাথী। মনে হচ্ছিল কেউ যেন মারা গেছে, আর যেন বলার নাই কিছু কারো। একজন একটা বিড়ি দিল বরকত স্যারকে, স্যার ছুঁড়ে দিল সেইটা।

‘আমাদের এত সব প্রচেষ্টা তাঁকে দেখাতে পারলে ভালো হতো…আমরাও তো বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছি।’ বলতে বলতে তিনি চারপাশে তাকালেন, দেখলেন বাঁশের পিলার থেকে রঙীন কাগজ উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে ততণে। ছেঁড়া কাগজগুলি অনাথের মতন উড়ছে বাতাসে। ‘উনি একজন মহা মানব। তাঁর মনোযোগ টানতে পারলে অনেক কিছু বদলানো যেত।’

অন্য গ্রামের এক লোক ফিরে যাওয়ার আগে সান্তনার সুরে মাস্টারকে বললো ‘আমার নাতি নাতনিকে তো আমি অন্তত এইটুকু বলতে পারবো যে আমার জীবনে এমন একদিন আসছিল যেদিন আমি সাত কিলোমিটার হেঁটে গেছিলাম আর প্রেসিডেন্ট কিনটনের সাথে দেখা হয়ে গেছিল প্রায়। এটাও তো কম কিছু না, তাই না?”

‘হায় হায় টয়লেটের উপরে হামলা করছে ওরা’ কে যেন চিৎকার করে বললো দূর থেকে। আমাদের পার হয়ে একদল লোক টয়লেটের দিকে ছুটে গেল। আমরাও চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে ওদের পিছন পিছন দৌঁড়ালাম। স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই নজরে পড়লো একদল লোক একজন আরেকজনকে ঠেলাঠেলি করছে।

‘দেখি দেখি আমাদেরকে ঢুকতে দাও’ চিৎকার করে বললাম আমরা।

‘আমার স্কুলটাকে ছেড়ে দেন দয়া করে’, বরকত স্যার বললেন আতঙ্কিত গলায়। কে জানে হতাশ জনতা কি অবস্থা করবে স্কুলের। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখি সারা স্কুলের উঠান জুড়ে লম্বা লাইন ধরে দাঁড়িয়েছে লোকজন।

আমরা গুঞ্জনরত দলটার কাছে দাঁড়ালাম। আব্দুল চাচা এক অল্পবয়সী ছেলে কে দিয়ে টয়লেটের তালা ভাঙাচ্ছে। ইটের ঘষা খেয়ে কড়ার জায়গাটাতে রং উঠে এলুমিনিয়াম দেখা যাচ্ছে। মাস্টার সাহেব চিৎকার করে থামতে বলতে বলতেই তালা খুলে গেল। সবাই হুংকার তুলে বাতাসে ঘুসি তুললো। আব্দুল চাচা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। সাবধানে দরজা বন্ধ করলো বাথরুমের। কিছুন পর আমরা ফাস টানার শব্দ শুনলাম বাইরে থেকে। বের হয়ে চাচা বাইরের অপোরত লোকগুলির দিয়ে তাকিয়ে হাসলো, তারপর টয়লেটের দরজাটায় হাত বুলিয়ে দিল আদর করে। আমরা সবাই ভদ্রভাবে লাইনে দাঁড়ালাম। আব্দুল চাচার সাদা কালো মাফলার পরা যুবক সহকারীর পালা ছিল এবার। ঢোকার মুখে সে আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে হাসলো, আর আমরাও ধৈর্য্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে অপো করতে করতে তুমুল আনন্দে আপ্লুত হলাম।

অনুবাদ: লুনা রুশদী