চার আগন্তুক

horror_by_Cybergore_v2

লোকটার নাম জয়নুদ্দিন। সবাই তাকে ডাকে ‘জনুমাঝি’ বলে। জনুমাঝিকে চেনে না এমন মানুষ এই উল্ল¬াপুর ইউনিয়নে সত্যি বিরল। কারণ, শিবের খাল পেরিয়ে মাধবপুর গঞ্জে যেতে-আসতে সবাইকে তার নৌকোতেই উঠতে হয়। কেননা এছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই আর।

সেদিন ছিল মঙ্গলবার। বিকেল থেকেই আকাশ মেঘলা যাচ্ছে। গুমোট গরমে ঝড়ের ইঙ্গিত। মাঝেমধ্যেই তিড়তাড় করে এক-আধ পশলা বৃষ্টিও হচ্ছে। তাও আবার বড়বড় ফোঁটার, হিম-শীতল বৃষ্টি।

জনুমাঝি ঘড়ি দেখতে জানে না; ঘড়ি তার নেইও। তবু সে আন্দাজ করলো, রাত এখন কমসে কম দশটা। এক-আধ মিনিট এদিক-সেদিক হলেও হতে পারে। আর গাঁ-গেরামের রাত তো এমনিতেই আটটা-ন’টা নাগাত নিশুতি হয়ে যায়। তার উপর আজকে আবার ঝড়-বাদলার অভাস। সুতরাং মেলা দেরি হয়ে গেছে Ñ এবার খেপ বন্ধ করার পালা।

সে খুঁটির সাথে নৌকাটা বেঁধে গলুইয়ের তলা থেকে তার গামছা-লুঙ্গির পুঁটলিটা বের করে হাতে নেয়। তারপর মাহাল বাঁশের লগিটা কাঁধে নিতেই দেখতে পায় নন্দী-গাঁয়ের আইল ধরে ক’জন লম্বামতো লোক এদিকেই এগিয়ে আসছে।

এমনিতেই মানুষ দেখে তার খুশি হওয়ার কথা; কিন্তু তা না হয়ে আজকে সে হলো বিরক্ত। কারণ ওরা পরিচিত কেউ হলে এড়িয়ে যাওয়ার আর উপায় থাকবে না – খেপ দিতেই হবে।

লোকগুলো নিঃশব্দে হেঁটে এসে খেয়াঘাটের একচালাটার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। জনুমাঝি দেখেও না-দেখার ভান করে, যাতে এড়িয়ে যাওয়া যায়। তাছাড়া এই চারজন আগন্তুকের মধ্যে কেউই তার পরিচিত নয়। আগে কোথাও দেখেছে বলেও মনে পড়ছে না।

তাদের বেশভূষা ফিটফাট। প্রত্যেকেই সাদা শার্ট আর সাদা পাজামা পরেছে। আজকাল অবশ্য শার্টের সাথে পাজামা কেউ পরে না। সেজন্য এইটাই তার দৃষ্টি কাড়লো সবার আগে।
সে নৌকা থেকে নামতে-না-নামতে তাদের মধ্যের বয়স্কজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘ভাই, আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি। একটা দাওয়াত আছে। আমাদেরকে একটু কাজলপুরের কাছে পৌঁছিয়ে দাও।’

জনুমাঝি দেখলো মহাবিপদ। এতো রাতে আবার কিনা সে-ই কাজলপুর! উঁম্হু। তাছাড়া রিজার্ভ সে যায়ও না।

‘না, ভাই।’ বললো সে হাত জোড় করে। ‘আমারে মাফ করেন। কইলে গুদারা পার কইরা দিবার পারি। কিন্তুক খেপ যামু না। অহন মেলা রাইত।’

‘দাদারে, বিপদ-আপদ সবারি আছে। টাকার কথা ভেবো না তুমি। টাকা যা লাগে তোমার, দেবো আমরা। একশো, দেড়শো, দুইশো। কিন্তু ভাই, যেতে তোমাকে হবেই।’

টাকার অঙ্ক শুনে জনুমাঝির মনটা ঝ্যাঁৎ করে নরম হয়ে যায়। মেলা দিন হলো বউয়ের একটা কাপড় কিনার ভাও হচ্ছে না।

‘ঠিক আছে।’ নরম স্বরে বললো সে, ‘তইলে আপনারা একটুক খাড়ান্। আমি বাড়িত গিয়া খালি কইয়া আহি?’ বলেই লগিটা নামিয়ে রাখলো নিচে।

মুরুব্বিজনের কণ্ঠে তখন জোর আশংকা। ‘চুঃ! বেশি দেরি হবে না তো?’

‘আরে না। খালি যাইমু আর আইমু।’

‘আচ্ছা, যাও। আমরা বসলাম তাহলে।’ তিনি আশ্বস্ত হলেন। ‘তবে এই ফাঁকে একটা কাজ করে দিতে পারলে কিন্তু খুউব ভালো হয়। পারবে?’

‘কন, হুনি আগে।’

‘আসার সময় বাজার থেকে সের দুয়েক মিষ্টি আনা যায় কিনা দেখো।’ বলেই বুড়োমতো লোকটা তার জামার সাইড পকেট থেকে একটা কড়কড়ে নোট বের করে ধরেন। ‘এই যে, পাঁচশো দিলাম। বাকিটা ফেরত দেয়া লাগবে না; সব তোমার Ñ রেখে দিও।’

লোভে জনুমাঝির চোখ তখন চকচক করে ওঠে। তবু সে বলে, ‘কী জানি, এতো রাইতে আবার দোকান খোলা পাওন যায় কিনা দেহি!’

এর আধঘন্টা পর ওরা রওনা হয়ে গেল। আকাশের অবস্থা তখন মোটেও ভালো নয়। ক্ষণেক্ষণেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যে-কোনো সময় ঝমাঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে।

ঘন্টা দুয়েক একটানা এগিয়ে নৌকা যখন মদনকুঠির কাছাকাছি এসে পৌঁছে, আকাশ তখন ঘোর অন্ধকার। গুমোট হয়ে গেছে খালের বাতাস। গাছ-গাছালির একটা পাতাও যেন নড়ছে না আর।

তবে এখান থেকে কাজলপুরও আর খুব বেশি দূরে নয় । দিনের বেলা হলে মাজেদ হাজীর রাইস মিলের চিমনিটা দেখা যেতো।

খালের এই জায়গাটা খানিক সরু। বাম দিকের পাড় ঘেঁষে মদনকুঠির দালান। জরাজীর্ণ অবস্থা সেটার। সেজন্যে দালান না বলে এটাকে এখন পোড়োবাড়ি বলাই ভালো। দালানের বেশিরভাগ দেয়ালই ধসে পড়েছে। বারান্দায় গজিয়ে-ওঠা ঝোপঝাড়ে শেয়ালের নিরাপদ আস্তানা।

এদিকটাতে পৌঁছার খানিক আগ দিয়ে লোকগুলো খুব উসখুস করছিলো। বারেবারে নাক টানছিলো। এবং তাদের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো যে, কিসের যেন ঘ্রাণ পেতে চেষ্টা করছে তারা।

সুতরাং ওদের মধ্যে যার বয়স সবচাইতে কম, সে আর স্থির থাকতে পারলো না। অধীর হয়ে শেষে বলেই বসলো, ‘আর যাওয়ার দরকার নেই, খালুজান। আমরা হেঁটে গিয়ে নিয়ে আসতে পারবো। আপনি নৌকাটা থামাতে বলেন।’

শুনে তো জনুমাঝি হতবাক। বলে কী ছেলে! নিশুতি রাতে এই নির্জন জায়গায় নেমে তারা আবার কী আনতে যাবে? বেটারা চোরাচালানি নয় তো?

কী জানি বাবা! তেমন কিছু হলে সে কিন্তু এসবের মধ্যে নেই। বলে দেবে সাফসাফ।

যা-ই হোক, পাড়ে নৌকা ভেড়ানোর পর সেই ছেলেটা আরেকজনকে সাথে নিয়ে ঝটপট নেমে গেল। দুজনেরই খুব ফুর্তফুর্তি ভাব। সেইসাথে তর সইছে না এমন একটা ভঙ্গিমা। সেজন্যে অন্ধকারে যেন ছায়ার মতো মিশে গেল তাদের চলন্ত দেহদুটো।

এর মিনিট দশেক পরেই মদনকুঠির বারান্দার ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসে তারা। সঙ্গে আরও দুজন। এদের পোশাক আবার আলাদা। চারজনে মিলে হাতে করে কী যেন ঝুলিয়ে আনছে। বেশ ভারী; টানতেই পারছে না।

তারা আরেকটু কাছাকাছি হতেই আবার সেই পচা দুর্গন্ধটা আরও ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়লো। জনুমাঝির তখন ভয়ে মূর্ছা যাবার যোগাড়। কারণ পাশের কবরস্থান থেকে ওরা একটা আধপচা লাশ তুলে এনেছে।

তার সামনেই নৌকার পটাতনে বিছিয়ে রাখা হলো অর্ধগলিত দেহটাকে। তারপর ছয়জনে মিলে সেটাকে ঘিরে বসলো। মিষ্টির পাতিল আগেই খোলা হয়েছে।

সে-সময় আকাশে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চমকালে জনুমাঝি দেখতে পায় যে, গজারি কাঠের মতো খসখসে হাতে ইয়া বড়বড় নখ একেকজনের। সেই হাত দিয়ে তারা লাশ থেকে খুবলে-খুবলে মাংশ তুলছে, আর পাতিলের মিষ্টি সহযোগে খচমচ করে চিবুচ্ছে। প্রত্যেকের কোটরাগত চোখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে একধরনের ভয়াল বেগুনি আভা।

নরভূক প্রেতাত্মাদের সেই অপার্থিব ভোজসভার দিকে তাকিয়ে জনুমাঝি সাথেসাথেই বাবা গো বলে চিৎপটাং।

পরদিন সকালে তাকে তার নৌকার ওপর পাওয়া যায় সাত মাইল ভাটিতে। পটাতনে তখনও কাফনের কাপড়ের ভেতর গলিত নাড়ি-ভূড়ি এবং কিছু চিবানো হাড্ডি-গুড্ডি অবশিষ্ট অবস্থায় পড়ে রয়েছে।