সরওয়ার ফারুকীর ৩টি কবিতা

sarwar fariquee

ছুটি আমি ক্ষিপ্রতায়

মধ্য দুপুরে আমি গুনে গুনে পা ফেলতে
অভ্যস্ত নই।
কাটফাটা রোঁদের দাপটে জীবন যতই ধূসর হোক
সমুদ্র সিঞ্চনের জন্যে আমি হণ্যে ছুটে যাবো
জোরে… জোরে… জোরকদমে।

অগণন বাধার দেয়াল আমি ডিঙাব
আজরাইলের নখরে যতদিন না
নাম না জানা পোঁকার পেটে ভাগাভাগি হয়ে যাই।

তকদির পকেটের ভাঁজে
তদবির বলে মানি না কিছু
আমি ইচ্ছে মতো খরচ করতে ভীত নই।

আমি রুস্তম!
চলি ধপাস ধপাস! আঘাতে আমার সার্ট ছিড়ে যায়
যাক!
ঝড়ের ঝাপটায় দেহে ট্যাটুর চিত্র আঁকা আছে অনেক।

গায়েবী স্বপ্নের সমান্তরাল পরপর চলে পা আমার।
যতো জংলী কানুনের পুঁজা করো
শৃংখলে ডুবে বানরের ভেল খেলো-
মাড়িয়ে এসেছি হড়হড়ে সেই কবে।
অথৈ কিণার হতে গাঁ ছুঁয়ে ফিরিনি সন্ধ্যায়
গর্জনের উন্মাদ শিষে জোয়ারের মতো করেছি প্রেম।

বুঝ বেশি নেই বলে অবুঝের মতো চলি
ধরি খপ করে কয়লার লাল অথবা সর্পের ঝুলি।

এতো যোগ-বিয়োগের ফলাফলে আমি
জঞ্জালে ভরিনি খাতা
যেখানে মিলেনি- ফুল দিয়েছি গেঁথে
অথবা, একটি চন্দ্ররেখা খঞ্জরের মতো করে।

বরাদ্ধে যেটুকু পেয়েছি বরফের ভাগ
জানি ক্ষয়ে যাবে তিয়াষ ফুরাবার আগে
সঞ্চয়ের আদিম লালসায় উন্মত্ত হইনি তবু
দ্যুতির গতিতে অহরহ ছুটি প্রলয়ের অনুরাগে!

বিদায় দাহক

সময় সমুদ্রে টুপ করে ডুব দিল আরেকটি বছর!
দেনা-পাওনার হিসাব মিলিয়ে আখেরে দেখি; লোন-এ আছি!
আসমান-জমীনের তামাম মাখলুকের কাছে
আমি আজ দেনার দায়ে অভিযুক্ত।
সজিব, নির্জিব কেউই মাহরুম রাখেনি তার
প্রসারিত সম্পদের স্ফুরণ হতে।
জড়-অজড় দু’হাত ভরে দিয়েছে আমায়; আর নিয়েছি
ভিক্ষুকের মতো নির্লজ্জভাবে।
কয়েক লক্ষ মাছ খেয়েছি পোনা সমেত; রাক্ষুসে আমি
উপাধিটা পেতে পারি সহজেই।
প্রসান্ত সাগরের চঞ্চল চিংড়িটা
ফ্রাই করে দিয়েছিল ওয়েটার বুর্জ;
চোখ মুদে বলেছিলাম, “আহ! কী দারুণ! ”
মাংসাসি আমি কত গরু-ছাগল, মোরগ আর পাখি
খেয়েছি ছানা সমেত; বন্য হায়েনার সাথে
পার্থক্য করতে পারি না নিজের!
গাছ-গাছড়া আগাছা আর লতাপাতার গোয়ালে
জাবর কেটে আমি আজ তৃণভোজী।
হা করে হাওয়াদের গোগ্রাসে গিলেছি কত
ওজন করিনি কখনও!
অজস্র কিউসেক পানির প্রবাহে আমার উদর
কামিয়েছে নাম: বারমুডা ট্রায়াঙ্গল!

পা ছুটেছে হরদম জমিনের’পর ঔদ্ধত্য ভরে
হাত করেছে কামাই দিনরাত ডাস্টবিন হতে
দৃষ্টি জুড়ে নগ্নতার বিষ আমি জেনেশুনে করেছি পান।
চিন্তার দৌরাত্ম্য দিয়েছে সামাজিক খেতাব; বিকারগ্রস্ত!

মহাজাগতিক আলোক রশ্মি শোষেছি দেহের রন্দ্রে রন্দ্রে।
শুধু আমার জন্যই নেমে এসেছে অগুণতি
ফেরেশতা দল। তাদের আলোকপৃষ্টা ভরে
লিখে নিয়েছে শুধুই; হয়তোবা আতঙ্কিত কিছু।

অর্জন-বর্জনের হিসাব তো তাদেরই
যারা কামিয়াছে-খরচেছে।
একপক্ষীয় হিসেবের ঘরে আমার লেজার;
জমার ঘরে প্রসব করেছে অশ্বডিম্ব।
সন্ধ্যার সৈকতে বসে প্রতি অস্তাচলে
শুধুই দেখেছি আঁধার। পূর্ণিমাহীন অমস্যায়
ঢেকে গেছে রাত্রি আমার।
হাত ধরে হেটেছি যাদের পাশাপাশি। অনেকের জন্যই
জবানে জপেছি কেঁদে কেঁদে, “ইন্নালিল্লাহি……… রাজিউন।”

ফিরে গেছে যারা
ফিরবে না কভু তারা
কালের প্রবাহে কত যে অশ্রুজলে
বসে আছি ঘাটে; অথৈ তন্দ্রাহারা!

৩৪টি বছর!

হ্যা, ৩৪টি বছর এই পৃথিবীর রূপ, গন্ধ শুষে দেহের
আকার বড়ই করলাম। আফসোস, আকৃতিতে বড় হলাম
আত্মায় সেই অবুঝ বেলার বেড়া ভেঙ্গে মোটেও
আগাতে পারিনি। বিজ্ঞানীদের বলতে শুনেছি,
প্রতি দশ বছরে মানুষের একবার দৈহিক মৃত্যু হয়!
সে হিসেবে নিজের মৃত্যু তিন বার প্রত্যক্ষ
করার সুযোগ হয়ে গেছে!
বোধ শক্তিতে এতই অবোধ যে, একবারের জন্যও
নিজের এই মৃত্যুদণ্ড উপলব্ধি করতে পারিনি!
হায়, এ পাথর রুহের কী কোনই হুশ হবে না?
স্বাভাবিক গড়পড়তার বয়স রেখা অতিক্রম
করার সৌভাগ্য যদি থেকে থাকে কপালে, তবুও হিসেব
করে সহযেই বের করতে পারি যে অর্ধেকের বেশি পথ
মাড়িয়ে এসেছি। যে কয়টা দিন এ ধরণীর পথ লম্ফেঝম্পে
পাড়ি দিয়ে এসেছি, আরও ততটা দিন পাওয়ার
চান্স অতি অল্প! আরো ৩৪টা বছর অতিক্রমের
পরেও যদি পটল তুলি! আপন ঔরসও আফসোস
করবে না এই বলে, হায়! এত অল্পেই মারা
গেলেন!
আমি নিজেরে অবুঝ বলব না তো কী বলব?

হে প্রভু আমার!
কিছুই তো কম দাওনি!
দুটি চোখ, দুটি কান, চলার জন্য দুটি পা
দুটি হাত, দুটি নসন্দ্রীয়, বলার জন্য দুটি ঠোট।
প্রতিবন্ধী করেও দাওনি দয়া করে। এতো কালো
গড়ন করনি প্রভু, যাতে নাক সিটকায় নাকওয়ালারা!
হাট হতে কিনে আনতে হয়নি বদনের একটি পশমও।
সেই মাগনা পাওয়া সর্বাঙ্গে আমি আজ ৩৪টি
সৌর-বসন্ত অতিক্রম করে ফেলেছি।
এখনও চিনতে পারিনি নিজেরে। এখনও পথের
হাওরে অলস রাখালের মতো বড় অবহেলে বসেই
কাটিয়ে দিচ্ছি সময়।
কোথায় যাব, কখন যাব, কিভাবে যাব, কী পরিচয়ে যাব-
কিছুই আমার হয়নি ঠিক।
জন্মক্ষণে বাবার দেয়া নাম! সেটাও মাগনা পাওয়া।
কোনই বিশেষণ জোটাতে পারি নি আজো।
এই পৃথিবীর এতো অনুদান গিলেছি কোনই হিসাব
করিনি তার। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কোন পথ রেখা আঁকতে
না পারার যাতণাও নেই মনে!
মানবাকৃতির একটি চলন্ত জন্তুর মতো নিজেকে
মনে হয়। আয়নার সামনে দাড়াই- হাত নাড়ি; হাত নড়ে।
হাসি! দাঁতও বেরিয়ে পড়ে। অঙ্গের কাজ অঙ্গেরা
ঠিকই করে যায়, আমি পারি না আমার আত্মারে
নাড়াতে। বলদ দেহ বলদের মতো হৃষ্ট হয়, পুষ্ট হয়
ওজন বাড়ে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০কিলো!

কে আমি? কি আমি? কার আমি?
মাঝে মাঝে ভাবি! তা-ও যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো;
অনুভব করা যায়; ধরা যায় না।
আমার ভাবনারা অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় লুকিয়ে যায়।
তারপর অন্ধকার, অন্ধকার আর অন্ধকার।
আমি হাত নাড়াই, হাতদ্বয় ফিরে আসে-
চপেটাঘাতের শব্দ, অনুভব দুটোর উপলব্ধিতে
কেঁদে উঠি।
কাঁদতেও পারি না- শিখিনি বলে!
অশ্রুহীন, শুধু বুম বুম আওয়াজ হয়। করুন কান্নার
আওয়াজ না পেলে কার বা হৃদয় গলে; কে বুলায়
হাত!

এ আমার চৌত্রিশ বসন্তের অর্জন!
আশ্চর্য, জীবন আজো হয়নি যে কর্তন!!