অতঃপর…

চাচাকে প্রশ্ন করলাম, চাচা! নির্বাচন কেমন হলো?

চমৎকার! চাচা বললেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ আসলেই কাজের কাজী। তিনি তো বলেই দিয়েছেন, নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। তার সম্পর্কে গোলাম মওলা রনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন: ‘আমার মানসপটে একটি পবিত্র মুখ কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। কাকে বসাই মানসপটে! এ তো দেখি ভারি মুশকিল- কলঙ্কহীন মুখ পাওয়াই যাচ্ছে না কিংবা মনেই আসছে না। অনেক কসরতের পর জলে ফোটা পদ্মের মতো অমলিন একটি পবিত্র মুখ আমার মানসপটে ভেসে এলো। তিনি হলেন এ শতাব্দীর মহাপুরুষ বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ।’ চাচা আরও বললেন, সিইসিকে ‘এ শতাব্দীর মহাপুরুষ’ আখ্যা দান যথার্থই হয়েছে। আশা করি, আমাদের মহান প্রতিবেশী দেশ ভারত তাকে ‘ভারতরত্ন’ খেতাব দেবে।

চাচা! একি বলছেন আপনি? ভারত কেন তাকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধি উপহার দেবে? তিনি তো ভারতীয় নন।

তাতে কি! চাচা হাসিমুখে বললেন, আমাদের দেশে তাকে দেয়ার মতো বড় কোন পুরস্কার নেই। তাছাড়া এক সময়ের ভারতীয় উপমহাদেশের কথা বিবেচনা করে প্রতিবেশী ভারতের উচিত হবে ‘এ শতাব্দীর মহাপুরুষ’কে ওই খেতাবটি দিতে কার্পণ্য না করা। আমেরিকা যদি প্রফেসর ইউনুসকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব দিতে পারে তাহলে কাজী সাহেবের দোষটা কোথায়? আগামীতে ভারতের লোকসভার সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের পরীক্ষিত সিইসিকে ভারত সরকার সিইসি হিসাবে ধার করতে পারে।

কিন্তু চাচা! আমাদের নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতকে টেনে আনা কেন?

আমরা কেন টেনে আনবো? তারা আমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছেন। মহান প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তারা আমাদের পার্টনার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জয়ী হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তার সরকারের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচন আয়োজনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল।’ ওদের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এই বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব অর্জন।

আমি সবিস্ময়ে বললাম, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য অভূতপূর্ব অর্জন!

কেন নয়? আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চাচা যেন কৌতুক বোধ করলেন। বললেন, বিষয়টা বুঝতে হলে তোমাকে এর গভীরে যেতে হবে। তোমার মতো নাদান লোকেরা বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছো ট্রানজিট ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার নাকি ভারতের দালালি করেছে, অথচ ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কিছুই পায়নি। কিন্তু এই প্রথম ভারত সরকার নির্বাচন নিয়ে গায়ে পড়ে বাংলাদেশের দালালি করলো। এটা কি একটা অর্জন নয়?

‘গায়ে পড়ে’ কথাটা বলছেন কেন?

ওটা বলেছি এ জন্য যে, বাংলাদেশ সরকার তথা হাসিনা সরকার কখনও নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের সাপোর্ট চায়নি। বাংলাদেশ ভারতকে তেমন কোনও চাপও দেয়নি। কিন্তু ট্রানজিট বা অন্যান্য বিষয়ে ভারতের দিক থেকে সর্বদা চাপ ছিল। আমরা তখন গায়ে পড়ে কিছু করিনি। অন্যদিকে ভারত নির্বাচনের আগে পরে যা কিছু করেছে, অযাচিতভাবেই করেছে। বিশ্বের বড় বড় দেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে তারা।

নির্বাচন কমিশনার বা ভারতের ব্যাপারে আমার আর কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। তবু একটা কথা বারবার মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল। নির্বাচনের পরদিন বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় জাল ভোট প্রদানের ছবি সংবলিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ সম্পর্কে চাচার মন্তব্য জানতে চাইলাম।

চাচা হাসিমুখে জানালেন, বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তোমার প্রশ্নের জবাব আগেই দিয়েছেন- ‘আসল ভোট থাকলে জাল ভোট তো হবেই।’ আসল টাকার সঙ্গে যেমন জাল টাকা মেশানো থাকে, এটাও তেমনি। সত্যি বলতে কি, জাল ভোট হচ্ছে সোনার খাদের মতো। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সফল করতে হলে জাল ভোটের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। খাদ ছাড়া যেমন সোনার অলঙ্কার তৈরি হয় না, জাল ভোট ছাড়াও তেমন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।

চাচা! আপনি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলছেন। কার কাছে গ্রহণযোগ্য?

সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার বড় মাপকাঠি হলো কত শতাংশ ভোটার ভোট দিলো। এই রেট কম হওয়া চলবে না। ফলে জাল ভোট দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে এটা একটা স্বীকৃত পন্থা। এটা করতে না পারলে কমিশনের ইমেজ নষ্ট হয়।

আমি এবার দেশের ভবিষ্যৎ জানতে চাইলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, অতঃপর কি হবে? নতুন সরকার কতদিন থাকবে?

এ সরকারের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত। তবে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা থাকবে আগামী ২০৪১ সাল পর্যন্ত।

২০৪১ সাল! কি বলছেন আপনি?

একেবারে চমকে উঠলে দেখছি! সাধে কি আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত রূপকল্প দিয়েছে? চাচা বললেন।

কিন্তু বর্তমান সরকার কি আগামী ৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকবে? আমি আবার প্রশ্ন করলাম।

তোমার অসুবিধা কি? জনগণ তো ৫ বছরের জন্যই তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তবে যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমঝোতার কথা বলেছেন!

সেটা বলতে হয়। কিন্তু কার সঙ্গে সমঝোতা করবেন তিনি? বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে এখন আর সমঝোতার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ, তিনি এখন বিরোধী দলীয় নেত্রী নন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সমঝোতা করতে হলে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। রওশন এরশাদই হচ্ছেন বর্তমান আপসহীন নেত্রী।

আমি বিব্রতকণ্ঠে বললাম, রওশন এরশাদ আপসহীন নেত্রী?

অবশ্যই। স্বামী এরশাদের সঙ্গে পর্যন্ত তিনি আপস করেননি। আপসহীন বলেই অসুস্থ এরশাদকে দেখতে তিনি কখনও হাসপাতালে যাননি। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে সেটাই স্বাভাবিক ছিল।

চাচা! জাতীয় পার্টির সব সমস্যার তাহলে সমাধান হয়ে যাচ্ছে?

নারে ভাই। ওদের অনেক সমস্যা।

চাচা আমাকে ভাই সম্বোধন করায় আমি বুঝতে পারলাম, চাচা সমস্যার গ্র্যাভিটি পরিমাপ করে উদ্বিগ্ন হয়ে আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভুলে গেছেন। আমি জানতে চাইলাম, ওদের কিরকম সমস্যা?

জাতীয় পার্টির আগায় গলদ। চাচা বিরসমুখে জানালেন।

‘গোড়ায় গলদ’ কথাটা শুনেছি। ‘আগায় গলদ’ কথাটা কখনও শুনিনি।

এখন থেকে ‘আগায় গলদ’ কথাটাই চালু হবে। জাতীয় পার্টির ‘গোড়ায় গলদ’ বললে হোসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বোঝাতো। তাকে নিয়ে কোনও গলদ বা সমস্যাই নেই। তিনি দিব্যি অসুস্থ হয়ে আছেন। মাঝে মাঝে গলফও খেলছেন। সমস্যা হচ্ছে জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে, যারা এবার এমপি হয়েছেন।

তাদের আবার কি ধরনের সমস্যা?

এরা এখন আর মন্ত্রীত্ব থেকে নামতে চাইছেন না। পরবর্তী মন্ত্রীসভায় তারা আগের মতোই মন্ত্রী থাকতে চান। এরকম হলে রওশন এরশাদকেও বাধ্য হয়ে মন্ত্রী থাকতে হবে। দল ছেড়ে তিনি তো আর একা থাকতে পারেন না। এমতাবস্থায় দেশে কোনও বিরোধী দলই পাওয়া যাচ্ছে না। কাজী ফিরোজ রশীদ নিজেও বলেছেন, এবার কোনও বিরোধী দল থাকবে না। চাচা আরও বললেন, সম্ভবত সরকারের মন্ত্রীত্ব রেখেই তারা বিরোধী দল করবেন। অবশ্য বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে একজনের কথা ভাবা যেতে পারে।

কে তিনি?

বিএনএফ-এর প্রধান আবুল কালাম আজাদ। তাকে কেবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বিরোধী দলীয় নেতা করলে তিনি হয়তো রাজি হতেও পারেন।

চাচা! তিনি তো তার দলের একমাত্র এমপি। একজনকে দিয়ে কি বিরোধী দল হয়?

নতুন ধরনের সরকারে সবই হতে পারে।

কিন্তু জনগণ জানে তার কোন ক্রেডিবিলিট নেই।

কে বললো নেই? ঢাকা-১৭ যে আসন থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, ওই আসনটির আগের এমপি ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নির্বাচনে এরশাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা না হলে এরশাদ ও আবুল কালাম আজাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। ফলাফল কি হতো, তা আমি বলতে চাই না। লালমনিরহাটে এরশাদ আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে ১ লক্ষ ৭০ হাজার ভোটে হেরেছেন। ঢাকায়ও এমন অবস্থা হতে পারতো। তবে এরশাদ বিপদ বুঝে আগেভাগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক লজ্জা থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। এজন্যই বলি, বিএনএফ-এর প্রধান হিসেবে আবুল কালাম আজাদ একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ও নেতা।

বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলার ইচ্ছা হলো না। আমি কথার মোড় ঘুরিয়ে বললাম, চাচা! তাহলে এই সরকার আগামী পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকবে?

সেটাই তো সংবিধানসম্মত। এক কথা বারবার জিজ্ঞাসা করছো কেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধান থেকে এক চুলও নড়বেন না, তা আগেই ঘোষণা করেছেন।
তাহলে একাদশ নির্বাচন কিভাবে হবে?

দশম নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, যেভাবেই হবে। এই নির্বাচনকে সবাই ধন্য ধন্য করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় যথার্থই বলেছেন, ‘৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে কোনও ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে রিপোর্ট হয়নি।’ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই নির্বাচন ‘রোল মডেল’ হিসেবে নিশ্চয়ই স্বীকৃতি পাবে। বিদেশীরাও এই নির্বাচন দেখে চমৎকৃত ও বিস্মিত।

কিন্তু বিদেশীরা আমাদের নির্বাচনে কোনও পর্যবেক্ষক পাঠায়নি কেন? তারা কি আমাদের বয়কট করেছে?

মোটেই না। বরং বলতে পারো আমরাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদেশীদের বয়কট করেছি। অবশ্য আমাদের দুই নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ভুটানের দু’জন করে চারজন পর্যবেক্ষক এতে উপস্থিত ছিলেন। তারা নির্বাচনী কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে খুবই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষক হিসেবে কমিশনের আতিথেয়তারও তারা প্রশংসা করেছেন।

চাচা! আগামী নির্বাচন কি তাহলে একই ভাবে হচ্ছে?

হ্যাঁ। একই ভাবে মানে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তিনি সকলকে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। পাঁচ বছর অবশ্য তেমন বেশি সময় নয়। তবে পরবর্তী নির্বাচন আরেকটু অভিনব করার কথা ভাবা হচ্ছে।

কি রকম অভিনব?

এবার মাত্র ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা যায় কিনা, নির্বাচন কমিশন আশা করি, তা খতিয়ে দেখবে। এটা হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

কি রকম সমাধান হয়?

এটা করা গেলে কাউকে আর প্রাণ হাতে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে না। নির্বাচন নিয়ে সন্ত্রাস করারও কোনও সুযোগ থাকবে না। দেশের মানুষ শান্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে বাড়িতে বসে টেলিভিশনে নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখে তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে।