একাত্তরের ভূমিকা ভুল, কাদের মোল্লার ফাঁসিও ভুল

Hamdi Mir
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যায় অংশ নেয়ার অভিযোগে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। হিউম্যান ওয়াচ রাইটসসহ (এইচআরডব্লিউ) বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আদালতের রায়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কিন্তু অন্যদিকে ঢাকার শাহবাগে কয়েক মাস ধরে চলেছে একটি আন্দোলন। এই আন্দোলনের কর্মীদের দাবি, ১৯৭১ সালে কাদের মোল্লাসহ যারা যুদ্ধাপরাধ করেছেন তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করা হয়েছে।

এই রায়ে বাংলাদেশের আন্দোলন-সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগামী ৫ জানুয়ারি দেশটির জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। প্রধান বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচন বয়কট করেছে। কারণ এই নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের পরিবর্তে হাসিনা ওয়াজেদের সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীও কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার প্রতিবাদে আন্দোলন করেছে। তাদের দাবি, নিছক পাকিস্তানকে সমর্থনের কারণেই মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে।

এ কথা সত্য যে, আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর পাকিস্তানিদের মনে দেশ ভাগের কষ্টকে বাড়িয়ে তুলেছে। আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে ডিসেম্বর মাসে। এই মাসেরই ১৬ তারিখে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। আফসোস, প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আসে আর যায় কিন্তু আমরা কখনো এই দিনের ভুলের কথা পর্যালোচনার চেষ্টা করি না। আমরা তো অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে প্রস্তুত নই। আমরা এমন কোনো পথও খুঁজে বেড়াই না যা পাকিস্তানের প্রতি বাংলাদেশির ঘৃণা দূর করতে পারে। আমরা পরস্পরের সঙ্গে প্রতারণা করছি, এমনকি নিজে নিজেকে প্রতারিত করছি। এই মিথ্যা ও প্রতারণা অতীতে পাকিস্তান নামক অখণ্ড রাষ্ট্রটিকে ভেঙে চুরমার করেছিল। আর সেই মিথ্যা ও প্রতারণাই আজও পাকিস্তানকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিচ্ছে। কিন্তু আফসোস, মিথ্যুকরা দেশপ্রেমের মুখোশ পরে অন্য সবাইকে বোকা বানাচ্ছে।

আমরা আজ পর্যন্ত একথা ভাবিনি, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী। যিনি ছিলেন কায়েদে আজমের একজন সিপাহসালার। যিনি ১৯৪৭ সালে হিন্দুস্তানিদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরাসরি জড়িত ছিলেন, তিনি কিভাবে পাকিস্তানের শত্রু হন? পাকিস্তানের কোনো রাজনীতিক বা বুদ্ধিজীবী কি এ কথা স্বীকার করার সাহস রাখেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ফাতেমা জিন্নাহকে তার নেতা মনে করতেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে ছিলেন। কিন্তু আইয়ুব খান কায়েদে আজমের বোনকে ভারত ও আমেরিকার এজেন্ট বানিয়ে প্রতারণা করে নির্বাচনে হারিয়ে দেন। সেই প্রতারণাই পাকিস্তান ভাঙার ভিত্তি স্থাপন করে।

উল্লেখ্য, আইয়ুব খান কিছু আলেমকে হাত করে তাদের দ্বারা ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে ‘নারীদের শাসন ইসলাম সমর্থন করে না’ বলে ফতোয়া জারি করেন। তা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান, খান আব্দুল ওলি খান এবং মাওলানা মওদুদী মতো নেতারা ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু আফসোস, ১৯৭০ সালে জামায়াতে ইসলামী জেনারেল ইয়াহইয়া খানের সঙ্গে গিয়ে মিশে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু ইয়াহইয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা দেয়ার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশন চালাতে থাকেন। এটাই ভারতকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকার সুযোগ করে দেয়। তারা বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করতে থাকে।

জামায়াতে ইসলামী প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিল। কিন্তু সামরিক বাহিনীর অপারেশন শুরু হয়ে যাওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা আল বদর ও আশ-শামসের সঙ্গে মিশে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগিতা করে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, পাকিস্তান বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। ১৯৭১ সালের ওই অপারেশনে যে হত্যা, লুণ্ঠন ও সীমালঙ্ঘন হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের করা সেই পরিসংখ্যানকে ‘বাড়াবাড়ি’ বলে মনে করে পাকিস্তান তা এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু এ ব্যাপারে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তিকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে?

১৯৭১ সালে ঢাকায় দায়িত্বরত মেজর জেনারেল খাদেম হোসাইন রাজা তার বইয়ে লিখেছেন, ১০ মার্চ জেনারেল আমির আব্দুল খান নিয়াজি আমাদের বললেন, আমি এই হারামজাদা জাতির বংশধারা পাল্টে দেব। তারা আমাকে কী মনে করে! নিয়াজির এই কথা শুনে পাকিস্তানি বাহিনীতে কর্মরত এক বাঙালি অফিসার মেজর মুশতাক তাৎক্ষণিকভাবে কমান্ডিং হেড কোয়ার্টারের বাথরুমে গিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত আরেক সেনা অফিসার মেজর জেনারেল আবু বকর উসমান মিঠা তার ‘মুম্বাই থেকে জিএইচকিউ পর্যন্ত’ নামক বইয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ধরে ধরে গুম করে ফেলত।’ জেনারেল মিঠা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে কয়েক বার বলেছেন, এভাবে লোকদের গুম করে ফেললে ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা বাড়বে। কিন্তু তারা সে কথা শুনেনি। একবার জেনারেল মিঠা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এক মেজরের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন, যিনি লোকদের ধরে ধরে গুম করতেন। পরে তাকে আরেক জায়গায় বদলি করে দেয়া হয়। এ ধরনের অভিযোগ হামদুর রহমান কমিশনের কাছেও এসেছে। তা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) পরিচালিত জুলুম-নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানি কোনো সেনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

এ কথা সত্য, জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করেছে। বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুবক অফিসার ও সেনারা ১৯৭১ সালের যুদ্ধে দেশের পক্ষে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন। মেজর মোহাম্মদ আকরাম পূর্ব পাকিস্তানের হিলিতে শাহাদাত বরণ করেন। আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তিনি শহীদ হওয়াকে বেছে নেন। মেজর মোহাম্মদ শরিফ ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। কিন্তু জেনারেল নিয়াজি নিজের জান বাঁচানোর জন্য আত্মসমর্পণ করেন। অথচ তিনি চাইলে জাতিসংঘের কূটনীতিকদের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ না করেও জান বাঁচাতে পারতেন। জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করতে ভারতীয় বাহিনীর ইহুদি অফিসার জেনারেল জ্যাকব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জেনারেল নিয়াজি ৯৩ হাজার বন্দী সেনার সঙ্গে নিজেকেও ভারতের কাছে সোপর্দ করে দেন।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু পাকিস্তান বাহিনীর এক বাঙালি অফিসার জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বিদ্রোহ করে তার অফিসার কর্নেল জানজুয়াকে হত্যা করেন। পরে তিনি চিটাগাং বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই মেজর জিয়ার সঙ্গীরাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। পরে তিনি সেনাপ্রধান হন। এক পর্যায়ে তিনি দেশের শাসন ক্ষমতাও দখল করেন।

শেখ মুজিবুর রহমানও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, জিয়াউর রহমানও বিদ্রোহ করেছেন। শেখ মুজিব নিজেকে বঙ্গবন্ধু বা জাতির জনক বলতেন। আর জিয়াউর রহমানও নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের আসল হিরো বলে মনে করতেন। পার্থক্য শুধু এতটুকু, শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেন আর জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা দখল করে তাদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। জামায়াতে ইসলামীর দ্বারাই পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জিয়াউল হকের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। এভাবেই বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) পাকিস্তানের বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়।এ কথা সত্য, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ভাঙার বিরোধিতা করেছে। কিন্তু পরে সেই জামায়াতে ইসলামীই পাকিস্তানের প্রতি বিদ্রোহকারীদের বন্ধু হয়ে যায় এবং তাদেরকে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পাকিস্তানের ঢুকে যাওয়া পুরানো ঘৃণাকে উস্কে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের সহযোগিতা পায়। এজন্য আওয়ামী লীগ সরাসরি পাকিস্তানের বিরোধিতা করছে।

অথচ জুলফিকার আলি ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে অনেক বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ অফিসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা চালানোর ঘোষণা দেন। সেই অফিসাররা ভারতের কারাগারে বন্দী ছিলেন। ১৯৭২ সালের ১৬ জুন পাকিস্তানের ১৫৯ সেনা অফিসারকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের ব্যাপারে সম্মতি দেয় ভারত। কিন্তু ভুট্টো ওই বছরেরই ২ জুলাই ভারতের সঙ্গে সিমলা চুক্তি করেন এবং ৯৩ হাজার বন্দীকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। ১৯৭৪ সালে ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের লাহোরে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) কনফারেন্সে যোগ দেন। এতে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে পাকিস্তান ঢুকতে শুরু করে বাংলাদেশে। এতেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তা এসে ঠেকে এই ফাঁসি পর্যন্ত।

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি পাকিস্তানিদের মধ্যে বাংলাদেশ বিরোধিতায় নতুন করে হাওয়া দিয়েছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারের নিন্দা ও সমালোচনা এই সমস্যার সমাধান নয়। সর্বপ্রথম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ১৯৭১ সালে যা কিছু ঘটেছে তা আমরা ভুলতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ তো তা ভুলতে পারে না। পুরানো ঘৃণার অবসান ঘটাতে চাইলে নিছক বাংলাদেশের কাছে ভুল স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, যা করেছিলেন জেনারেল মুশাররফ। আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। বছর দুয়েক আগে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ও রাজনীতিক ইমরান খানও এ দাবি জানিয়েছিলেন।এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের জেনারেল নিয়াজি ১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালিদের বংশধারা পাল্টে দেয়ার জন্য গিয়েছিলেন। বাঙালিরা ভারতের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছে। বাঙালিদের বক্তব্য হলো, তোমরা ফাতেমা জিন্নাহকে গাদ্দার হিসেবে চিহ্নিত করেছ। তা সত্ত্বেও আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তোমাদের জেনারেল যখন আমাদের বংশধারা পাল্টে দিতে এলো তখন আমরা কী করবো?

এ কথা মানতে হবে, নিঃসন্দেহে আমরা ১৯৭১ সালে ভুল করেছিলাম। বাংলাদেশের সরকারও এখন কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিয়ে ভুল করেছে। উভয়কেই নিজ নিজ ভুল স্বীকার করে নেয়া উচিত। আর উভয়কেই এই ভুল থেকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে।