বুলবুল সরওয়ারের এক গুচ্ছ কবিতা

তায়েফের মুনাজাত

জিব্রিল:
হে রাসুল, যদি অনুমতি দিন তবে,
তায়েফবাসীকে দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে ফেলা হবে।

রাসুল:
না-না জিব্রিল, ও কথা বোল না আর
ওরা নির্দোষ! অভাব রয়েছে আমার-ই যোগ্যতার
কন্ঠে রয়েছে জড়তার জ্বালা, শব্দের সরনীতে
সত্যকে আমি পারিনি পৌঁছে দিতে।
সারা পৃথিবীর মানুষ মগ্ন-ভুলে
তায়েফবাসীকে একা দোষ দিয়ে দোজখে দিওনা তুলে।
এ-তো কিছু নয়, আরো কত আছে জমা
তার চেয়ে তুমি জেনে এসো, তিনি করেছেন কিনা ক্ষমা
আমার ত্রুটিকে ভাই-
অন্ধ এ-রাতে এছাড়া আমার প্রার্থনা কিছু নাই।

জিব্রিল:
অনুমতি দিন, তবে যাই আমি ফিরে
ফুল হয়ে থাক রহমত এই আঙুরলতাকে ঘিরে।

রাসুল:
প্রভু! তায়েফবাসীরা শোনেনি কোরান, বোঝেনি তোমার বাণী,
ওদের হৃদয় কর তুমি সন্ধানী;
এ নগরবাসী বোঝেনি সত্য, দেখেনি ঐশী আলো
মননে তাদের তীব্র দহন জ্বালো;
মরুচারী এই জনতাকে তুমি তওফিক দাও প্রাণে
যেন এ-রাত্রি হৃদয়ে তাদের অনুতাপ বয়ে আনে।
…খোদার রাসুল কেন দুনিয়ার রবে?
যদি পাহাড়ের মাঝে এ-বস্তি পিষে ফেলো আজ, তবে ?
কারে সে জানাবে চির শান্তির বাণী-
হাবীবে তোমার, হে প্রভু আমার, দিওনা সে বদনামী।
(পুনর্বার প্রার্থনায়):
সারা পৃথিবীতে পৌঁছাতে হবে তোমার গানের সুর
তায়েফের মত নিকষ কালিমা পথে পথে বন্ধুর
যুগ যুগ ধরে জমা হয়ে আছে, হিরাতের চেয়ে ভারী
কতটুকু তার একাকী সরাতে পারি?
হে আমার প্রভু, কঠোর হয়োনা রহমতে-বরকতে
না-ফোটা কলিকে ফোটার আশিস্ দাও এই মরুপথে
যেখানে আসেনি সত্য ন্যায়ের ছাপ
চারিদিকে যার অংশীদারীর পাপ
সেইখানে তুমি হও রহমান, হও আরো মহীয়ান
ক্ষমা কর সব দোষ-ত্রুটি-অপমান।
তোমার দুয়ারে তুলেছি সজল হাত
ফিরায়ে দিওনা, তায়েফের এই খুন-ঝরা মুনাজাত।

সাহসী পতাকা

আমাকেও যদি বলি দিতে হয়, দিও
তবুও তোমার জয় হোক, প্রিয়তমা
তোমারই জন্য প্রাণপাত; তার আগে
বলে যাই, কই হৃদয় রেখেছি জমা।

আমাকেই যদি মুছে যেতে হয়, হোক
তবুও তোমার সাহসী পতাকা উড়ুক
নাহয় আমার রক্তের বিনিময়ে
দেখ লাল-নীল আকাশ-দিপালী কি-সুখ!

আমাকেই যদি ভুলে যেতে চাও, যেও
দীপ্ত নিশান উড়ুক তবুও হাতে
ইট কুরবানী হয় বলে ইমারত
বিজয়ীর মতো দাঁড়ায় তোমার সাথে।

নাহয় আমি সে পিতার মতই, মরি
খুন মেখে হোক সবুজ আকাশ লাল
নিশানা বিহীন থেকে যাক সমাধিটা
তবুও জাগুক সুস্থ আগামীকাল।

স্বগঃতোক্তি

মানুষের বৈপরীত্য নিয়ে কেউ আশাহত হয়ো না। কারণ
পরস্পর বিরোধীতার মধ্যেই জীবন। কেউ প্রতিবাদ করে তরবারি নিয়ে
আর কেউ তরবারির নীচে মাথা দিয়ে প্রতিবাদ করে
সত্য হচ্ছে ইচ্ছা ও চেষ্টার সততা
পোশাকী জৌলুশ সেখানে মূল্যহীন।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ
একটি নক্ষত্রের আলো হাজার সূর্যকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়
আবার, ঋণের জ্যোস্নায় ম্লান হয়ে যায় রূপালী চাঁদ;
দেখ সমুদ্রকে
সারা পৃথিবীকে আগলে রেখেও মাঝে মাঝে কত রুদ্র, নির্মম
মধু এবং হুলের সহাবস্থান কী অসম্ভব; কী যুক্তিহীন!
মানুষের স্বভাবও ঐ রকম
কেউ সত্যকে আঁকড়ে ধরে মহৎ হয়ে ওঠে
সত্যের জন্যই কারও বদনামী হয়!
নিরাশা হচ্ছে চোখের ছানি। সুতরাং অন্যের নিন্দার চেয়ে, এসো,
আমরা নিজের চোখ দুটিকে পরিষ্কার রাখি।

দক্ষিণের বাতাস

তুমি বলবে ফাল্গুন
কিন্তু না। এ হলো সমুদ্রের গর্জন
ডাকতে এসেছে অন্ধকার ভোরে।

তুমি ভাবছো মৌসুমী বাতাস
কিন্তু না। এ হলো যৌবনের দুরন্ত বেগ
জানিয়ে দিয়েছে বিপদ সংকেত!

তুমি বলছো ঘূর্ণি
কিন্তু না। এ হলো শেকল ছেঁড়ার গান
অস্তিত্বের অনিবার্য সংগ্রাম।

তুমি ভাবছো কবিতা
কিন্তু না। এ হলো আমারই বিশ্বাসের অঙ্গীকার
মাটি ও মানবীর জন্য প্রার্থনা।

কিংবা,
তুমি যা ইচ্ছে তাই ভাবতে পারো
কিন্তু এই বসন্ত বাতাসেই
আমাদের চামড়া শুকিয়ে দুর্ভেদ্য দেয়াল বানাতে হবে।
আমার এখন ফুল তুলবার সময় নেই,
বাতাস এসেছে দক্ষিণের জানালায় যেতে হবে।

দুঃস্বপ্নে দহন

সম্প্রতি আমার বেশ ভয়, বড় ভয়:
যদি কিছু হয়।
হয়তো হবে না কিছু –তবু
কিসের সংকোচ যেন বুকে চেপে রয়।

মৃত্যু ভয়?
না না, এর আলাদা স্বরূপ। বুঝি, কিন্তু বোঝানো কঠিন
রমণীর হাঁ-বলা না-বলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; ঠিক ত্রাস নয়
তবুও কোথায় যেন ভয়ংকর বারুদ সঞ্চয়।

বেশ কিছু কাল এই ভীতির কারণে
ঘুমাতে পারি না।
আমরা কি বেঁচে আছি? কাকে বলে মানব জীবন?
পীচ ঢালা পথ আর সোডিয়ামে কি এত সংশয়
কেন আমি কম্পমান? আড়ালে-আবডালে কাঁপে ভৌতিক বিষয়?
কি হবে-কি হতে পারে? নিজেকে আমি নিজেই বুঝাই–
তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যে এই সত্য
এ-রকমই দীর্ঘশ্বাস এশিয়া আফ্রিকা চিলি নিকারাগুয়ায়
এই সত্য! সমুদ্র ঝড়ের মতো অযৌক্তিক
কিন্তু আসে। আসে তার ভয়ংকর উন্মাদ আক্রোশ নিয়ে
আসে মৃত্যু, টেলিগ্রাম, সাহায্যের সোনালী কপ্টার
শিশু জন্মে ! আশ্চর্য বিষয়; তবু হয়।
জন্ম হয়, বিয়ে হয়, প্রেম-ভালোবাসাবাসি হতে থাকে
নদীর মতোই ভাঙে মানব শৃংখল
বহু লক্ষ প্রাণের বিজয়।

তবুও মানুষ বেশ সুখে আছে
সিনেমা-নাটক-টিভি সংসদ ভবনে, মিছিলে-মিটিংয়ে
চকচকে চার রঙা রঙিন পোস্টারে
সহাস্য চেহারা নিয়ে বেশ আছে। বিপ্লবের নাকাড়া বাজিয়ে ফেরা
ভাড়াটে শ্রমিক
মদের বোতল নিয়ে আছে বেশ।
লাশের রাজনীতি আর
রঙিন বুদবুদ ঘেরা পথের ফোয়ারা জুড়ে
পতিতা মায়ের
পথকলি পেয়েছে আশ্রয়।
নিরাপত্তা পেয়ে সেও বেশ আছে
আমার বুকেই শুধু যুক্তিহীন ভয়–
যদি কিছু হয় !

মাঝে মাঝে ভাবি তাই, চলে যাই
ওপি-ডিভি না পেলেও কোন ভাবে কোন দেশে
করে নেবো নিজের ঠিকানা
কোন তন্বি হবে বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি ভুলে যাবো
বাংলাদেশ নামে কোন দেশ আছে …. ভুলে যাবো
ভুলে যাবো আত্মপরিচয়।

ঘুমের বড়িতে খুঁজি ঘুম। আমাকে পুড়িয়ে মারে আমারই জিজ্ঞাসা:
আরও কি করুণ ছিল হেলেনের ট্রয়?

প্রতিতুলনা

দূর থেকে ভালবাসছো, ধন্যবাদ
নিকটে এসো না। এই ঝকমকে জামার নীচেই
ময়লা দুর্গন্ধময় গেঞ্জি। রজনীগন্ধা ধরা হাতেই
লুকানো আছে হন্তারক ছুরি। চমৎকার সানগ্লাস
অনায়াসে আড়াল করেছে হায়েনার জ্বলজ্বলে চোখ।

প্রেমের জন্য উচ্ছ্বসিত হওনি, ধন্যবাদ
এই রক্তেই আছে রাসপুতিন। বিশেষণ ও প্রশংসাকে সত্যি ভেবোনা
কবি ও শিল্পীরা অবিরাম আগ্রহী অন্যের বাগানে।

বিরহের জন্য ব্যথাতুর হওনি, ধন্যবাদ
মিলনে স্থিতি নেই। ঐশ্বর্যের প্রতিটি অট্টালিকাই
শোষণ ও মিথ্যার নিপুণ চালাকী।
কষ্ট ছাড়া প্রেমে কোন প্রাপ্তি নেই, আনন্দ নেই।

দূর থেকে সবকিছুকেই পবিত্র ও পরিপূর্ণ মনে হয়
অনুবেক্ষণে জীবাণু।
ব্রুটাসের বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হওনি, ধন্যবাদ
পিছনেই আছে সীজারের লাশ।