নিছক গোরুর রচনা, গো-মাতা এবং হিন্দুগণের রসনা বিড়ম্বনা

সম্প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা সমগ্র পড়ে আমি চমকে গেলাম। গ্রন্থের একটি অংশে স্বয়ং বিবেকানন্দ বলেছেন, একদা হিন্দুগণ গো-মাংস ভক্ষণ করত। আর দেরি নয়, খোঁজ-তালাশ লাগানো শুরু করে দিলাম। কে দেবে এই তথ্যের সত্য সন্ধান ? অবশ্যই প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ এবং সাহিত্যগুলি সেই উত্তর দিতে পারে, এটা আন্দাজ করে বেদ সহ অন্যান্য বইপত্তর নিয়ে বসে পড়লাম। ও হরি! এ তো দেখছি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে! আসুন, শেয়ার করি:

বাল্মীকি বিরচিত রামায়ণের আদি ও অযোধ্যাকাণ্ড খুলে দেখুন সেখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে — “রাম গোমাংস ভক্ষণ করিতেন”। বনগমনের পথে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলে মুনিবর বৃষ এবং ফলমূল দিয়ে তাদের ব্যবস্থা করেছিলেন (বাল্মীকি রামায়ণ ২/৫৪)। পৌরাণিক যুগে গোরুর মাংস খাওয়ার প্রত্যক্ষ এবং বিস্তারিত প্রমাণ রামায়ণের তুলনায় মহাভারতে অনেক বেশি। বলা হয়েছে – (১) “বশিষ্ট মুনি মদ্য ও গোমাংস প্রভৃতি দিয়া বিশ্বামিত্রকে তাঁহার সেনাগণের সহিত ভোজন করাইয়াছিলেন।” (২)”ভরদ্বাজ মুনি ভরতকে গোমাংসাদি দিয়া পরিতুষ্ট সহকারে ভোজন করাইয়াছিলেন ও তৎকালে বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে ব্রাহ্মণেরা দশ সহস্র গোভক্ষণ করিয়াছিলেন।” মহাভারতের শান্তিপর্বে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে যে রাজা বিচখ্যু গো-মেধ যজ্ঞে একদিকে অসংখ্য গোরুর আর্তনাদ এবং ছিন্ন দেহ, আর অন্যদিকে ব্রাহ্মণদের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন (বেদব্যাস বিরচিত মহাভারত ১২/২৬৬)। অর্থাৎ, সে সময়ে মাংসের জন্য অসংখ্য গো-হত্যা করা হত, আর ব্রাহ্মণরাও এ কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

মহর্ষি পাণিনি কী বললেন, দেখা যাক –” অতিথি আগমন করলে তাঁহার জন্য গো-হত্যা করবে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদের মৈত্রায়ণীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত মানবগৃহ্যসূত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,”বাড়িতে অতিথি এলে তাকে আপ্যায়ন করতে গোরুর মাংস দিতে হবে এবং গৃহস্থের কর্তব্য হচ্ছে অতিথির সঙ্গে আরও চারজন ব্রাহ্মণকে গোমাংস ভোজনে আমন্ত্রণ জানানো।” (পৃ: ২৮)
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, “I know there are scholars who tell us that cow-sacrifice is mentioned in the Vedas. I… read a sentence in our Sanskrit text-book to the effect that Brahmins of old (period) used to eat beef”. ( M.K.Gandhi, Hindu Dharma, New Delhi, 1991, p. 120). অর্থাৎ, “আমি জানি (কিছু সংখ্যক পণ্ডিত আমাদের বলেছেন) বেদে গো-উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে। আমি আমাদের সংস্কৃত বইয়ে এরূপ বাক্য পড়েছি যে,পূর্বে ব্রাহ্মণরা গো-মাংস ভক্ষণ করতেন।” (হিন্দুধর্ম,এম.কে. গান্ধী,নিউ দিল্লি,১৯৯১,পৃ. ১২০)

ঋক্ বেদে বলা হয়েছে — Agni is described as “fed on ox and cow” In the Rig Veda (RV: VIII.43.11) অর্থাৎ, “অগ্নি (অবতার) বর্ণনা করলেন, ষাঁড় এবং গো-মাংস দিয়ে ভক্ষণ করাতে। (ঋক্ বেদ VIII.43.11) ঋক বেদ সংহিতায় “বিবাহসূক্ত”-এ কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গো-মাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গোরু বলি দেওয়ার বিধান আছে (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০/৮৫/১৩)।

একবার দেখা যাক “বৃহদারণ্যকোপনিষদ” কী বলছে। বলছে – “কোনো ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে ইচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্রতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড়ো বৃষের মাংসের সঙ্গে ঘি দিয়ে ভাত রান্না করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে আহার করেন”(বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬/৪/১৮)।

বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রে গো-মাংস ভক্ষণের সমর্থন পাওয়া যায়। “বশিষ্ঠস্মৃতি”- তে বলা হয়েছে – ব্রাহ্মণ, রাজা, অভ্যাগতদের জন্য বড়ো ষাঁড় কিংবা বড়ো পাঁঠার মাংস রান্না করে আতিথেয়তা করা বিধেয় (বশিষ্ঠস্মৃতি ৪/৮)।মনু অবশ্য কোনো কোনো প্রাণীর মাংস খেতে বারণ করেছেন। বলার বিষয় হল, তার মধ্যে গোরু পড়ে না। কারণ, যেসব প্রাণী এক খুর বিশিষ্ট তাদের মাংস খাওয়া বিশেষ বিধান ছাড়া বারণ (মনুস্মৃতি ৫/১২)। এই শ্রেণীতে গোরু পড়ে না। অন্যদিকে, যেসব প্রাণীর শুধু এক পাটি দাঁত আছে তাদের মাংস খাওয়া যেতে পারে (মনুস্মৃতি ৫/১৮)। এখানেই শেষ নয়, মনুস্মৃতি বলছে – অতিথিদের খেতে দেওয়ার জন্য, পোষ্যদের প্রতিপালনের জন্য, অথবা ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজনে যে-কোনো মাংস বিধিসম্মত (মনুস্মৃতি ৫/২২)।

চাণক্য বা কৌটিল্য কী বলেছেন তাঁর “অর্থশাস্ত্র”-এ, সেটি জানবেন না ? জানুন — (১) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গোরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)। (২) মাংসের জন্য ছাপ মারা গোরু ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণীর গোরু হত্যা নিষিদ্ধ (অর্থশাস্ত্র ২/২৬/১২২)। (৩) রাজ্যের গবাদি পশুর তত্ত্বাবধায়কের পদে একজন সরকারি কর্মচারী থাকবেন। তিনি গোরুদের ছাপ দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করবেন। যেমন – দুগ্ধবতী গাভী, হালটানা বা গাড়িটানা বলদ, প্রজননের ঊদ্দেশ্যে সংরক্ষিত ষাঁড় এবং মাংসের জোগানের জন্য অন্যান্য গোরুসমূহ (অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)।

গৃহ্যসূত্রগুলির সুরও প্রায় এক। বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতে গোরু বলি এবং গো-মাংস ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাই বা জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহস্থের প্রিয় অতিথি, অথবা যে-কোনো অতিথির জন্য মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেইসব অনুষ্ঠানে গো-মাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি।
বিভিন্ন পুরাণেও গোরুর মাংস ভক্ষণ এবং বিশেষ করে ব্রাহ্মণদের পরিবেশন করার স্পষ্ট নির্দেশ এবং প্রশংসা আছে। বিষ্ণুপুরাণে গোরু, শূকর, গন্ডার, ছাগ, ভেড়া প্রভৃতি বিভিন্ন পশুর মাংস খাইয়ে ব্রাহ্মণদের হবিষ্য করার বিধান দিয়ে সেই সঙ্গে কোনো মাংস ব্রাহ্মণদের ভক্ষণ করালে পিতৃপুরুষেরা কতদিন পরিতৃপ্ত থাকবেন তার একটা পরিসংখ্যানের উল্লেখ আছে। বিষ্ণুপুরাণ বলছে, ব্রাহ্মণদের গো-মাংস খাইয়ে হবিষ্য করালে পিতৃগণ ১১ মাস পর্যন্ততৃপ্ত থাকেন। আর এ স্থায়িত্বকালই সবচেয়ে দীর্ঘ (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬)।

গোরুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ আয়ুর্বেদাচার্য চরক এবং সুশ্রুত। চরক বলছেন – গো-মাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)। সুশ্রুতও একই সুরে বলেছেন – গো-মাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা। হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা এবং বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)।

এত গেল অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণের গো-মাংস ভক্ষণ প্রসঙ্গে তথ্যসূত্র সংবলিত আলোচনা। এবার দেখা যাক, যে গো-মাংস সমুদয় ব্রাহ্মণ তথা হিন্দুগণের এতো প্রিয়তর খাদ্যবস্তু ছিল, তা কোন জাদুবলে নিষিদ্ধ হয়ে গেল ! স্বামী বিবেকানন্দ এই গো-হত্যা বা গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক কারণের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে, “কালক্রমে দেখা গেল যে আমরা যেহেতু কৃষিজীবী জাতি, অতএব সবচেয়ে ভালো ষাঁড়গুলিকে মেরে ফেলা জাতিকে হত্যা করারই সমার্থক। সুতরাং, এই সব প্রথা বন্ধ করা হল এবং গো-হত্যার বিরুদ্ধে একটি মত গড়ে উঠল”। এই আর্থিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত কিছ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণও যুক্ত হয়েছিল। কারণ (১) ভারত ইতিহাসে প্রাচীন যুগের শেষ ভাগ থেকে মধ্যযুগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ-দেশে বৌদ্ধধর্ম এবং অনেক ক্ষেত্রেই জৈনধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বৌদ্ধধর্মে এবং জৈনধর্মে সবরকম প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ এবং সর্বজীবে অহিংসাকে শ্রেষ্ঠ নীতি বলে গণ্য করা হত। এই বিষয়টি হিন্দুগণের কাছে চ্যালেঞ্জ হিসাবে উপস্থাপিত হল, উদয় হল সমূহ হিন্দুদের অস্তিত্বের সংকট। অতঃপর এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে গিয়ে হিন্দুসমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করতে হয়েছিল। আর্থিক কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সাংস্কৃতিক কারণও সম্ভবত গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণের উপর নিষেধাজ্ঞায় শক্তি সঞ্চারিত হয়েছিল। এভাবেই গো-হত্যা এবং গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি ক্রমে ক্রমে দানা বেঁধে মিথ্যা ধর্মীয়তার আধারে ঢাকা পড়ে গেল। কালে কালে গোরু হল গো-মাতা, তেত্রিশ কোটি দেবতার অধিষ্ঠান এবং মলমূত্র হল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্র উপকরণ।

বেড়ে গেল গোরুর গুরুত্ব । মহাভারত রচনার শেষ পর্যায়ে গোরুর একটা অর্থনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন আরম্ভ হয়েছিল। আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে মহাভারতে সংযোজিত অনুশাসন পর্বে সমকালীন অর্থব্যবস্থায় গোরুর বিশেষ গুরুত্বের নিরিখে খাদ্যদ্রব্য হিসাবে তার মূল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধন বা ক্যাপিটাল হিসাবে অধিকতর মূল্যের স্বীকৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ সময়ে গোরুর বিশেষ অর্থনৈতিক উপযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধন হিসাবে এর গুরুত্ব ক্রমে ক্রমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এহেন আর্থিক প্রয়োজনকে স্বীকার করে নিয়ে ধর্মীয় তত্ত্বের আধারে উপস্থাপন করা হল। কারণ স্বর্গ-নরকের লোভ বা ভয় না দেখালে গোরুর মতো সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের বিরুদ্ধেজনমত গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না।

অতীতে, অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে হিন্দুগণেরা গো-মাংস ভক্ষণ করত একথা তো তথ্যপ্রমাণ দিয়ে জানানো গেল। তাহলে বর্তমানে কী অবস্থা ? হিন্দুরা কি আর গো-মাংস ভক্ষণ করে না? ছবিটা একবার দেখে নেওয়া যাক। এখনও পর্যন্ত ভারতের কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে কয়েকটি রাজ্য বাদ দিয়ে বাইশটি রাজ্যে গো-হত্যা বেআইনি। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ একটি (গোরুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ বিল-২০০৩) বিল উপস্থিত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিলটির উদ্দেশ্য ছিল গো-হত্যা ও গো-মাংসের রপ্তানি নিষিদ্ধ করা, গো-মাংস বিক্রি করা, গোরুকে আঘাত করা জামিন অযোগ্য অপরাধ। ব্যাঙ্গালোর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের প্রাক্তন ফ্যাকাল্টি সদস্য অধ্যাপক এন এস রামস্বামী একটি প্রবন্ধে লিখেছন, গোরুর দুঃখে জর্জরিত হয়ে যদি গো-হত্যা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়, তবে ওই প্রাণীটির দুর্দশা আরও বাড়বে। তাছাড়া যতক্ষণ সেটি কোনো সম্প্রদায়ের খাদ্য ততক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা অমানবিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায়। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সংকট(?) ছাড়া অন্য কোনো কারণ তো দেখি না, তাই না ? গোরু তো আর বিরল প্রজাতি নয়!

গো-হত্যা বন্ধ হলেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে গোরুর চালান হতে থাকবে। এখনও পর্যন্ত ভারতে পৌরসভা অনুমোদিত ৩০০০ শ্লটার হাউস আছে। তা সত্ত্বেও মাংস খাওয়ার উপযুক্ত এমন ২ কোটি পশু বেআইনিভাবে হত্যা করা দেশ জুড়ে। গবেষক রামস্বামী বলেছেন, পূজ্যপাদ ও প্রয়োজনীয় বলদগুলি আমাদের দেশে পাচনের আঘাত হজম করে ৫০ কোটি বার। দেবতাকে এভাবে কোনো ভক্ত মারতে পারে ! হিন্দুভক্তগণ বলতে পারেন গোরু যদি মাতাই হয় তাহলে প্রয়োজন ফুরালে বাড়িতে না রেখে রাস্তায় দেন কেন ? কেন মুসলিম বা দলিতদের কাছে বিক্রি করে দেন যখন সে আর দুধ দিতে পারে না ? আপনি জানেন কি ১৯৮০ সালে মাংসের জন্য গোরু ও মোষ মারা হয়ে ছিল ১ কোটি ৫৬ লক্ষ টি, এই ভারতে। ২০০০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৩ লক্ষ। আদতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও গবাদি পশুর বাজারের শতকরা ৮০ ভাগই হল গো-মাংস। ইন্ডিয়ান ভেটেরেনারি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী ভারতে মাত্র ৬০ ভাগ গবাদি পশুকে খাওয়ানোর মতো সংগতি আছে। বাকিরা নির্মমভাবে পরিত্যক্ত হয়। তাদের ভবিষ্যৎ অনাহারে মৃত্যু, পথ দুর্ঘটনায় অথবা বিষাক্ত খাবার অথবা খিদের তাড়নায় অখাদ্য খেয়ে মৃত্যু হয়।

ধর্মীয় বিধানে এমন কিছু যজ্ঞ আছে যা করতে হলে পঞ্চগব্য খেয়ে পবিত্র হতে হবে। পঞ্চগব্য কী ? পঞ্চগব্য হল গোরুজাত পাঁচটি দ্রব্য – দই, দুধ, ঘি, গোবর এবং গো-মূত্র। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বলেন, গো-মূত্রের ভিতর নকি গঙ্গা বসত করে। তার মানে গো-মূত্র সেবন করলেই গঙ্গাপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত !
ভারতে প্রায় ৫০ কোটি গবাদি পশু আছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, মোষের সংখ্যা ২ কোটি – সারা পৃথিবীর অর্ধেক।পৃথিবীর সাড়ে আট কোটি গোরু, বাচ্চা বলদ, ষাঁড়। বলদের মধ্যে ভারতে আছে শতকরা ১৫ ভাগ।

একটি সাক্ষাৎকারে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী ডি ডি লাপাং বলেছেন, “মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই গোরুর মাংস খেয়ে থাকে, উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথাপিছু আয় এমনিতেই কম। এখানকার মানুষেরপক্ষে বিকল্প খাদ্য হিসাবে মুরগি কেনা সম্ভব নয়”। প্রসঙ্গত বলি, মণিপুরের অধিবাসীদের বক্তব্য হল, গোরুর মাংস যে শুধু সস্তা তাই নয়, এখানকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেশ মানানসই।

কেরল রাজ্য দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গো-মাংস ভোজন করে। ২০০৩ সালের একটা হিসাবে দেখতে পাচ্ছি, সেই বছরে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টন গো-মাংস একমাত্র কেরলেই বিক্রি হয়েছে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানই নাকি ১৩০ টন গো-মাংস বিক্রি করেছে। কেরলে গো-মাংসের চাহিদা এত বেশি যে প্রতি বছর প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে ৫ লক্ষ গোরু আমদানি হয়। কেরল আবার ওই গো-হত্যা বেআইনি এমন রাজ্যগুলিতে গো-মাংস রপ্তানি করে। তাই অনেকেই মনে করেন, গো-হত্যা বন্ধ হলে কেরলের মানুষ ও পশু দুটোরই স্বাস্থ্য বিপন্ন হবে। কারণ গো-মাংস হল সবচেয়ে সস্তা মাংস। কেরলের মাংস বিক্রির শতকরা ৪০ ভাগই হল গো-মাংস। যদিও সংখ্যালঘু ব্রাহ্মণ গো-মাংস খান না – কিন্তু বাকি হিন্দু, মুসলিম, সন্ত, খ্রিস্টানরা গো-মাংস খেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ভারতে তপসিল জাতি এবং তপসিল উপজাতির বেশিরভাগ মানুষই গো-মাংস খেয়ে থাকেন।

পশ্চিমবাংলার করিডর দিয়ে সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ গোরু বাংলাদেশে প্রতিবছর পাচার হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেই গোরুগুলির মাংস তো খানই, উপরন্তু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করেন।

হায় হিন্দু! গোরু যতদিন দুধ দেয় ততদিনই মা। দুধ দেওয়া বন্ধ করলেই গোরু খেদাও। মাতার মাংস পরিণতির নিমিত্ত মুসলিমদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বলদেরও যতদিন গতর ততদিনই কদর। ষাঁড় না-হলে বংশবৃদ্ধির ক্রিয়া জারি রাখবে কে ? তাই ষাঁড় দু-একটা রেখে বাকিটা ধর্মের নামে উৎসর্গ করা হয়। ওরা হাটেবাজারে তোলা তুলে খায় আর বেগরবাই করলে পিটানি খায়। হায় রে গোরু, তুই বড়োই নিরীহ প্রাণী। সাপের ফোঁস কিংবা বাঘের মতো হালুমটুকু থাকত… তাহলে হিন্দুও তোমায় গিলতো না, মুসলমানও নয়।