আব্দুর রহমান বয়াতি; দেহঘড়ির সন্ধানে

Abdur Rahman Boayati
মন আমার দেহঘড়ি
সন্ধান করি
কোন মিস্তরি বানাইয়াছে

অবশেষে দেহের ঘড়ি থেমে গেছে। গত ১৯ আগষ্ট চলে গেছেন আজন্ম দেহঘড়ির সন্ধান করা আব্দুর রহমান বয়াতী। পৃথিবী হয়তো যেমন ছিল তেমনই থাকবে। নিত্যকার নিয়মে মেঘ হতে বৃষ্টি ঝরবে, ভোরের আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত হবে। সে আলোয় একটি দাঁড়কাক উঠানে খেলা করবে। শুধু আর কখনো ফিরে আসবেন না লোকজ সঙ্গীতের অনন্য এক অধ্যায় সংযোজনকারী বাউল আব্দুর রহমান বয়াতী। আমাদের লোক সঙ্গীতের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি। যিনি আজীবন মাটি ও মানুষের কথা বলে গেছেন তাঁর গানের কথায় ও সুরে।

এই পৃথিবী যেমন আছে
তেমনি পড়ে রবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে

কিংবা “দিন গেলে আর দিন পাবি না”। আমার মাটির ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে, মরণেরই কথা কেন স্মরণ করো না- এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গায়ক তিনি। দেহঘড়ি গানটির গীতিকারও তিনি। বেরিয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক গানের অ্যালবাম। স্বকীয় এক গায়কী ঢং এর মধ্য দিয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও অগুনতি শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে তাঁর গান। বিশ্বের অনেক দেশে তাঁর জাদুকরি সুরের মূর্চ্ছনায় কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন তিনি। গান গাওয়ার ডাক এসেছিল খোদ হোয়াইট হাউজ থেকে। প্রেসিডেন্ট বুশের আমন্ত্রনে গেয়েছেনও সেখানে। পৌঁছে দিয়েছেন বাংলার মাটি ও মানুষের সুর।

আমাদের আশ্চর্য সুন্দর এক লোক গানের ভান্ডার রয়েছে। মাটির কাছের মানুষগুলোর কথা, লোকাচার কিংবা লোক-জীবনের কথা, দৈনন্দিন জীবন যাপন, পাওয়া না পাওয়া এসবই লোকগীতির মূল উপজীব্য। এতে লুকিয়ে আছে ব্যাপক বাস্তব জীবনোপকরন। এসব লোকসঙ্গীত যেমন মানবজীবনের গভীরতম উপলব্ধি ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত হয় তেমনি রোমান্সধর্মী কল্পনারও বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। পল্লীগ্রামে খানিকটা জমাট আসর বসিয়ে লোকশিল্পীরা অত্যন্ত আকষর্ণীয় ভঙ্গিমায় একতারা হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে গান শোনায় শ্রোতাদের। কখনো কখনো সারারাত ধরে চলে এসব আসর। সিরাজ সাঁই, লালন সাঁই, হাসন রাজা, আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলীম কিংবা বাউল আব্দুল করিম’রা যুগ-যুগ ধরে সমৃদ্ধ করে গেছেন এ ধারাকে। আব্দুর রহমান বয়াতী সে ধারারই একজন স্বার্থক উত্তরাধিকারী।

• তাঁর জন্ম ১৯৩৯ সালে ঢাকা জেলার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে। এই দয়াগঞ্জের ধুলো-জলেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশব আর কৈশোরে চারদিকে অপার প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন, তার সাথে গড়েছেন সখ্যতা। জীবন ও প্রকৃতিকে তাই তিনি আলাদা ভাষায় দেখেননি বরং এ দু’য়ের দারুন এক পারস্পারিক সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায় তাঁর অসংখ্য গানে।জীবনকে তিনি অনেকখানি কাছে থেকে দেখতে পেরেছিলেন, ঢুকেছিলেন জীবনের বেশ গভীরে। তবু তাঁর গানের কথা সহজ ও সাবলীল। যে গান মানুষের কথা বলে, বলে সেই সব মানুষদের কথা যারা খেটে খায়, মহাজনের শোষণে নিষ্পেষিত হয়।

• প্রখ্যাত এই শিল্পীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি কবি আলাউদ্দিন বয়াতীর মাধ্যমে। তাঁর কাছেই বাউল ধর্মের দীক্ষা নেওয়া। এই তত্ত্বের উদ্ভব এই বাংলায়। লালন সাঁইয়ের মতো মহান দার্শনিক ও সঙ্গীত স্রষ্টার গানের মধ্য দিয়ে বাউল মত পরিচতি লাভ করে সারা বিশ্বে। বাউল গান যেমন জীবন দর্শন সম্পৃক্ত তেমনি সুর সমৃদ্ধ। বাউল এমন এক তত্ত্ব যা মানবতার কথা বলে, সাম্যের কথা বলে আর খোঁজে জীবনের প্রগাঢ় অন্তর্নিহিত অর্থ। আব্দুর রহমান বয়াতীও তা-ই খুঁজেছেন আজীবন, খুঁজেছেন জীবনের চাবিওয়ালা মিস্ত্রিকে। কেবল আমরাই খুঁজে পেতে ব্যাথ তাঁর মতো লোকজ ধারার শিল্পীদের। লোক সঙ্গীতের অনবদ্য সব সুরে আমরা পাই শেকড়ের খোঁজ, আমাদের পরিচয় আর অস্তিত্বের সন্ধান। অথচ আব্দুর রহমান বয়াতীরা মতো লোক শিল্পীদের চলে যেতে হচ্ছে চরম অযত্ন আর অবহেলায়। ধীরে ধীরে আমরা অনেকটা শেকড়-ছাড়া হয়ে যাচ্ছি। এমন চলতে থাকলে আমাদের অচিরেই হয়তো পরিচয়হীনতায় পড়তে হবে।

• প্রিয় আব্দুর রহমান বয়াতী জাপান ফ্রেন্ডশীপ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে “আবারও গান গাইবার চাই” বলে আকুতি জানিয়েছিলেন। বেঁচে থাকার সুতীব্র ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় আমরা সে আকুতি দেখেছি।

জীবন সুন্দর, আকাশ সুন্দর। ঘাসফুল, পাখিরা সুন্দর। তবু এতো সব সুন্দরের মাঝ থেকে আপনি চলে গেলেন। আপনাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। তবে আপনার সৃষ্টি বেঁচে থাকবে সময়ের খাঁচায়। আপনার সুর বেঁচে থাকবে অসংখ্য সুহৃদের মনে যারা আপনাকে ভালোবাসে।