ইনস্ট্যান্ট-মিক্স সাম্রাজ্যীয় গণতন্ত্র

Arundhati Roy
অরুন্ধতী রায়ের নিউইয়র্ক বক্তৃতা
সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষ করে বর্তমানের চলতি মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বরের একজন অরুন্ধতী রায়। গড অব স্মল থিংস লেখার পর, দীর্ঘ বিরতি দিয়ে হালে আবার উপন্যাস লেখা শুরু করছেন তিনি। কিন্তু মাঝের উপন্যাস-বিরতি পর্বে চুপচাপ কলম তুলে না রেখে তিনি বরাবরই ব্যস্ত ছিলেন পরিবেশবাদী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন এবং সবচে বেশি মার্কিনী যুদ্ধ, আগ্রাসন আর নয়া গণতন্ত্রের ফতোয়া আর তার প্রয়োগের বিরুদ্ধে। লিখেছেন যেমন, বক্তৃতাও দিয়ে গেছেন, সমান ধারে। এ লেখাটি সেরকম একটি বক্তৃতার অনুবাদ, যেটি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির দি রিভারসাইড চার্চে দিয়েছিলেন, ২০০৩ সালের ১৩ মে। পরবর্তীতে, ২০০৫ সালে তার আরো বেশ কিছু লেখা ও বক্তৃতার সঙ্কলন হিসেবে লেখাটি অ্যান অর্ডিনারি পারসন’স গাইড টু এমপায়ার বইতে সংযুক্ত হয়। সেখান থেকেই এ লেখাটি নির্বাচন এবং অনুবাদ। বছর কয়েক পুরনো হলেও মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদ, একে টিকিয়ে রাখা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের চেহারা উন্মোচনে লেখাটি এ বিষয়ক আগ্রহীকে রসদ দেবে। একই সঙ্গে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যক্তির অবস্থান ও অনুপ্রেরণার উচ্চারণ তার বক্তৃতার আরো একটি দিক। লেখাটির ইংরেজি নাম: Instant-Mix Imperial Democracy (Buy One, Get One Free).

আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার এই সময়ে যখন আমরা গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি, এবং যখন অল্প কয়েকজনই কেবল পারছে ফুটনোট ও রেফারেন্সসজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক থিসিস নিয়ে পুনরাবির্ভূত হতে অথবা থিসিস নিয়ে ফিরে আসতে, কিছু সময়ের জন্য রাস্তা থেকে ঘরে ফিরে যাওয়ার বিলাসিতা দেখাতে, তখন এই রাতে কী প্রাচুর্যময় উপহার আমি দিতে পারি আপনাদের!

এক সঙ্কট থেকে আরেক সঙ্কটের মধ্যে প্রতিনিয়তই খাবি-খাচ্ছি দশা যখন আমাদের, স্যাটেলাইট টিভির মাধ্যমে সেসব যখন সরাসরি ঢুকে পড়ছে মগজের ভেতর, তখন আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে সামনে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে আমরা প্রবেশ করি ইতিহাসে। ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর, পোড়া খটখটে শস্যমাঠ, ছোট হয়ে আসা বনভূমি, আর মরা নদী এসব এখন আমাদের আর্কাইভ। ‘ডেইজি-কাটার’ বোমায় বিধ্বস্ত জ্বালামুখ এখন আমাদের লাইব্রেরি।

তো আজ রাতে আমি আর কী শোনাতে পারি? অর্থ, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ আর গণতন্ত্র নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর ভাবনা আর কিছু দুর্ভাবনা; যা এক দঙ্গল পোকার মতো মগজের ভেতর কুরে কুরে আমাকে জাগিয়ে রাখে রাত। সেসবই তো!

আমার এসব কথাবার্তা আপনাদের কারো কারো কাছে অসৌজন্যমূলক মনে হতে পারে, যে কি-না একজন ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ‘আধুনিক জাতিসমূহ’ স্বীকৃত বইয়ের লেখক, অথচ এখানে দাঁড়িয়ে মার্কিন সরকারের সমালোচনা করছে। নিজের কথা বলতে গিয়ে বলতে হচ্ছে, আমি কোনো ধ্বজাধারী বা কোনো দেশপ্রেমিক নই। আর আমি খুব ভালো করে জানি, প্রতিটি রাষ্ট্রের ধাতব আত্মায় খোদাই করা আছে অর্থলিপ্সা, নিষ্ঠুরতা আর ভণ্ডামি। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্র নিছক রাষ্ট্র না থেকে সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হয়, তখন তার কর্মপরিধির মাত্রাও নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। কাজেই, আমি কি পরিষ্কার করে বলতে পারি যে, আজ রাতে আমি কথা বলছি মার্কিন সাম্রাজ্যের একজন প্রজা হিসেবে? আমি কথা বলছি সেই দাস হিসেবে, যে তার রাজার সমালোচনা করতে প্রস্তুত।

যেহেতু যে কোনো বক্তৃতার একটি শিরোনাম থাকতে হয়, তাই আজ রাতের আমার এ বক্তৃতার শিরোনাম, ‘ইনস্ট্যান্ট-মিক্স ইমপেরিয়াল ডেমোক্রেসি (বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি)’।

আমরা ফিরে যাই ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাইয়ে, পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসিনেস থেকে দুর্ঘটনাক্রমে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে ইরানি বিমানে আর তাতে মারা যায় ২৯০ জন সাধারণ যাত্রী। ওই ঘটনার পর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত প্রথম জর্জ বুশের কাছে এ ব্যাপারে মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। নির্বিকারভাবে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আমি কখনোই ক্ষমা চাইবো না। ঘটনা যাই-ই হোক না কেন, আমার কিছু যায় আসে না।’ ঘটনা যাই-ই হোক না কেন, আমার কিছু যায় আসে না। নয়া মার্কিন সাম্রাজ্যের যথাযথ বাণীই বটে। কথাটাকে সম্ভবত একটু ঘুরিয়ে বললেই লাগসই হয়; আমরা যা চাই, ঘটনা তাই-ই।

যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালানোর ঠিক আগে আগে নিউইয়র্ক টাইমস/সিবিএস নিউজের এক জরিপে জানা যায়, শতকরা ৪২ জন মার্কিন নাগরিক বিশ্বাস করে, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ও পেন্টাগনে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সঙ্গে সাদ্দাম হোসেন সরাসরি জড়িত ছিল।আবার এবিসি নিউজের একটি মতামত জরিপে জানা যায়, শতকরা ৫৫ জন আমেরিকান মনে করে, সাদ্দাম হোসেন আল-কায়দাকে সরাসরি সহযোগিতা দিতো।৪ এ মতামতের কোনোটিই তথ্য প্রমাণ ভিত্তিক ছিল না (কারণ, কোনো প্রামাণ্য তথ্যই উপস্থাপন করা হয় নি এগুলিতে)। সব জরিপের ভিত্তিই ছিল ঠেস দিয়ে বলা কথা/কটাক্ষ, ভাসা-ভাসা ধারণা এবং ডাহা মিথ্যা তথ্য। আর তা প্রচারিত হয়েছিল মার্কিন কর্পোরেট গণমাধ্যমের দ্বারা — যা আমাদের কাছে ‘মুক্ত সাংবাদিকতা’ হিসেবে পরিচিত — এই সেই ফাঁপা খিলান, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমসাময়িক মার্কিন গণতন্ত্র।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন জনসমর্থন ছিল মিথ্যা আর প্রতারণার বহুমুখী প্ল্যাটফরমের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা মার্কিন সরকারের সমন্বয়েই ঘটেছিল আর কর্পোরেট মিডিয়া তা বহুগুণ বাড়িয়ে প্রচার করেছিল। ইরাক এবং আল-কায়েদার মধ্যকার বানানো যোগসূত্রতা ছাড়াও ছিল ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র সম্পর্কে পরকল্পিত উন্মাদনা। ছোট জর্জ বুশ এমনকি এ-ও বলেছিল, ইরাক আক্রমণ না করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত।৫ আমরা আবার এমন মানসিক বিকারগ্রস্ত কথাও শুনতে পেলাম যে, খাদ্য সংকটে ক্ষুধায় কাতর, বোমা বিধ্বস্ত, অবরুদ্ধ একটি দেশ সর্বশক্তিমান আমেরিকাকে ধ্বংস করতে পরান্মুখ (কিউবা, নিকারাগুয়া, লিবিয়া, গ্রানাডা, পানামা — এ ধারাবাহিকতায় ইরাক ছিল আসলে সর্বশেষ সংযোজন) কিন্তু এবার? কিন্তু এবার ঘটনাটি শুধুমাত্র প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বের মোড়কাবৃত স্বল্পমাত্রার উন্মাদনা ছিল না। এবারের পাগলামি ছিল একেবারেই উদ্দেশ্যমূলক। নতুন বোতলে পুরনো মদের মতাদর্শ: পূর্ব নিরাপত্তামূলক আক্রমণের মতবাদ। সাদা কথায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন যা খুশী, তাই-ই করতে পারে, আর সেটাই চূড়ান্ত।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, জয় লাভও হয়েছে, কিন্তু কথিত গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্রই সেখানে পাওয়া যায় নি। এমনকি তার ক্ষুদ্র কণাও না। সম্ভবতঃ খুঁজে পাওয়ার আগে ওগুলিকে সেখানে রেখে আসতে হতো। তখন আবার, আমাদের মধ্যে যারা বেশি ঝামেলাবাজ, তারা প্রশ্ন করতো, নিজের দেশ যখন আক্রান্ত, সাদ্দাম হোসেন কেন সেগুলি ব্যবহার করে নি।
অবশ্যই এর কোনো জবাব নেই। খাঁটি বিশ্বাসী মার্কিনীদের কাছে একটি পুরনো ছাউনিতে পাওয়া কয়েকটি নিষিদ্ধ রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যারেল পাওয়া সম্পর্কিত ঝাঁপসা টিভি রিপোর্টগুলিই যথেষ্ঠ। এখন পর্যন্ত ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা হয় নি যে, ওগুলি আসলেই রাসায়নিক দ্রব্য ছিল কি-না, আসলেই নিষিদ্ধ ছিল কি-না, যে পাত্রে ওসব পাওয়া গেছে, বাস্তবিকই ওগুলি ব্যারেল কি-না। (একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা গেছে, ওখানে এক চা চামচ পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট আর একটি পুরনো হারমোনিয়ামও পাওয়া গেছে।)

ইতিমধ্যে একটি নাবালক, নৃশংস জাতির হাতে নির্বিকারভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে একটি সুপ্রাচীন সভ্যতা।

অন্যদিকে আরো এক দল আছে যারা বলে, ইরাকে রাসায়নিক ও পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলে কী হয়েছে? আল কায়েদার সাথে ইরাকের সম্পৃক্ততা না থাকলে কী হয়েছে? ওসামা বিন লাদেন যদি সাদ্দাম হোসেনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘৃণা করে, তাতেই বা কী? ছোট বুশ তো বলেছেই সাদ্দাম হোসেন একজন খুনী স্বৈরশাসক।আর এভাবেই যুক্তি দেখানো হয়, ইরাকে ‘সরকার পরিবর্তন’ দরকার ছিল।

কিছু মনে করবেন না, ৪০ বছর আগের ইতিহাসে একটু চোখ ফেরাই। তখন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির অধীনস্থ সিআইএ বাগদাদে সরকার পাল্টিয়েছিল। ১৯৬৩ সালে ইরাকে একটি সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেয় বাথ পার্টি। সিআইএ-র সরবরাহকৃত তালিকা অনুসরণ করে নয়া বাথ সরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে গুম করেছিল বামপন্থী হিসেবে পরিচিত শত শত চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক এবং রাজনীতিকদের।এবং পুরো বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কেও হত্যা করেছিল। (একই কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়া এবং পূর্ব তিমুরে। জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগকে এই ভাবে হত্যা করা হয়েছিল।ওই গণহত্যায় তরুণ সাদ্দাম হোসেনের হাত ছিল বলে শোনা গিয়েছিল তখন। ১৯৭৯ সালে বাথ পার্টির মধ্যকার আভ্যন্তরীন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে সাদ্দাম হোসেন হয়ে ওঠেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট। ১৯৮০-র এপ্রিলে সাদ্দাম যখন শিয়াদের নির্বিচারে মারছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিগন্যু ব্রেজিনস্কি ঘোষণা করেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরাকের স্বার্থের ক্ষেত্রে আমরা মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখি না।’সেই সময় ওয়াশিংটন এবং লন্ডন পর্দার আড়ালে আর পর্দার বাইরে এসে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল সাদ্দাম হোসেনকে। তারা তাকে অর্থ, প্রযুক্তি, অস্ত্র এবং দুবার ব্যবহারযোগ্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির উপকরণ সরবরাহ করেছিল।সাদ্দামের বাড়াবাড়ি রকমের জঘন্য কাজগুলিতেও আর্থিক, বস্তুগত ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে গিয়েছিল তারা। তারা সমর্থন দিয়েছিল ইরানের বিরুদ্ধে ৮ বছর মেয়াদী যুদ্ধে, সমর্থন দিয়েছিল ফালুজায় কুর্দী সম্প্রদায়ের ওপর রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহারের। ওয়াশিংটন-লন্ডনের সমর্থনে সাদ্দাম হোসেনের এসব অপরাধই ১৪ বছর পর দাঁড় করানো হয়েছে ইরাক আক্রমণের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠায়।এই মিত্র বাহিনী প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর বসরার শিয়া বিদ্রোহে উস্কানী যোগায়, আবার সাদ্দাম যখন প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ খুন করে সেই বিদ্রোহ দমন করছিল, মিত্র বাহিনী তখন আক্রান্ত শিয়াদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল।

বিষয় হলো, যদি সাদ্দাম হোসেন সবচে শয়তান বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন, ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার জন্য সরাসরি স্বীকৃত ব্যক্তি হয়ে থাকেন (অপারেশন শক এন্ড অ্য’র প্রথম পদক্ষেপকারী), তাহলে তাকে যারা সমর্থন দিয়েছিল, তাদের কি যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত নয়? আন্তর্জাতিক আদালত স্বীকৃত ঘৃণ্য যুদ্ধপরাধীদের তালিকায় তবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সরকারি কর্মকর্তাদের চেহারা কেন যুক্ত হচ্ছে না?

কারণ, যখন সাম্রাজ্যই বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, বাস্তবতা সেখানে কোনো আমলে আনার বিষয়ই না।

হ্যাঁ! কিন্তু আমাদের যা বলা হয়েছিল, সবই অতীতের কথা। সাদ্দাম হোসেন হচ্ছে সব অসৎ গুণে গুণান্বিত সেই অসাধারণ ব্যক্তি, যাকে এক্ষুনি থামানো উচিৎ। এবং কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই তা করা সম্ভব। অতীতের নিষ্ঠুর পাপ ঢাকতে এবং ভবিষ্যতের বিদ্বেষমূলক পরিকল্পনার বাস্তবায়নে, যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার জরুরী নৈতিকতার ব্যবহার; একটি কার্যকর পদ্ধতি। ইন্দোনেশিয়া, পানামা, নিকারাগুয়া, ইরাক, আফগানিস্তান — এ তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আবার ওই পদ্ধতি প্রয়োগে মিশর, সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, মধ্য এশীয় প্রজাতন্ত্রগুলিতে ভবিষ্যতের জন্য বেড়ে উঠছে নৃশংস শাসক গোষ্ঠী।

ইউএস এটর্নি জেনারেল জন অ্যাশক্রফট্ সম্প্রতি ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ‘কোনো সরকার বা কোনো প্রামাণ্য দলিল থেকে পাওয়া অনুদান নয়, বরং এটা ঈশ্বর প্রদত্ত উপহার।’(জাতিসংঘের কথা তুলে আর কী লাভ তবে, স্বয়ং ঈশ্বরই যখন পাশে?)

সুতরাং বলা যায়, ঐশী অধিকারে সজ্জিত এক সাম্রাজ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন, আমরা (আর, বাড়তি পাওনা হিসেবে সঙ্গে আছে সবচে’ ভয়ঙ্কর গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সংগ্রহ।) আমরা এখন দাঁড়িয়ে সেই সাম্রাজ্যের মুখোমুখি। এই সাম্রাজ্যের আছে যখন খুশী যুদ্ধ করার স্বআরোপিত এখতিয়ার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত মতাদর্শ, ধর্মীয় মৌলবাদ, স্বৈরাচার, যৌন বৈষম্য এবং দারিদ্র থেকে জনগণকে মুক্ত করার অধিকার; আর এ অধিকার অর্জিত হচ্ছে বহুল পরীক্ষিত, বহুল ব্যবহৃত গণহত্যার চর্চার মাধ্যমে। সাম্রাজ্যটি এগিয়ে যাচ্ছে। আর গণতন্ত্র হচ্ছে এই এগিয়ে যাবার মিশনের নয়া রণ-হুংকার। এই সেই গণতন্ত্র — যা আপনার বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে ‘ডেইজি-কাটার’ বোমার মাধ্যমে। নতুন এ পণ্যের সুবিধা পাবার জন্য জণগণকে যে মৃত্যু-মূল্য দিতে হচ্ছে, তার দর যৎসামান্যই। নয়া এ পণ্যটি: দ্রুত মিশ্রণযোগ্য সাম্রাজ্যবাদী গণতন্ত্র (সেদ্ধ করুন, তেল যোগ করুন, এরপর বিস্ফোরণ)।

চিংকস্ (চীনারা), নিগ্রোজ, ডিংকস (সমকামীরা), গুক্স (ভিয়েতনামীরা), এবং ওগস্ ( ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকালীন সময়ের সাধারণ মানুষ) নয়া সাম্রাজ্যবাদীর চোখে এরা এখনও মানুষ নামের যোগ্য না। সম্ভবতঃ আমাদের মৃত্যুও সত্যিকারের মৃত্যু না। আমাদের ইতিহাস কোনো ইতিহাস না। কখনো ছিলও না।

গত ক’মাসের ইতিহাসের কথা যদি বলি, সারা বিশ্ব স্যাটেলাইট টিভি’র মাধ্যমে সরাসরি দেখল ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসন ও দখল। আফগানিস্তানে ওসামা বিন লাদেন এবং তালেবান সরকারের মতো ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সরকারও হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। বিশ্লেষকরা যাকে অভিহিত করলেন, ‘ক্ষমতার শূন্যতা’। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যে জনগণকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করা হয়েছিল, অভুক্ত রাখা হয়েছিল, দিনের পর দিন খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে শহরগুলিকে রাখা হয়েছিল অবরুদ্ধ; বিরামহীন বোমা বর্ষণে আবার সেই শহরগুলিকেই ধ্বংস করা ফেলা হলো, হঠাৎ প্রশাসনহীন এমন অরাজক পরিস্থিতির তুলনা নগর প্রশাসনের ইতিহাসে নেই। সাত হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা পতিত হলো এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে। সেটাও দেখলাম টেলিভিশনে, সরাসরি।

দোকান-পাট, অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্তোঁরা এবং হাসপাতালগুলিতে চললো লুটেরাদের তাণ্ডব।মার্কিন ও ব্রিটিশ সৈন্যরা তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। তাদের ভাষ্য ছিল, তাদের প্রতি কোনো আদেশ ছিল না পদক্ষেপ নেবার। কার্যতঃ তাদের প্রতি আদেশ ছিল মানুষ হত্যার, রক্ষা করার নয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। ইরাকি জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের দেখার বিষয় ছিল না, ছিল না অল্প-বিস্তর টিকে থাকা অবকাঠামোগুলি রক্ষা করা, কিন্তু ইরাকি তেলক্ষেত্রগুলি নিরাপদ রাখা ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। অবশ্যই তাই করেছিল তারা। আগ্রাসন শুরুর প্রায় আগে থেকেই তেলক্ষেত্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল।

সিএনএন এবং বিবিসিতে সেই ধ্বংসাবশেষের চিত্র বারবার প্রচারিত হয়েছিল। টেলিভিশন ভাষ্যকাররা, সামরিক এবং সরকারি মুখপাত্ররা একে বর্ণনা করেছিল স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ‘মুক্ত মানুষের’ ক্রোধের প্রকাশ হিসেবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা বাঁধ ভাঙা। স্বাধীনতা বাঁধ ভাঙা এবং মুক্ত মানুষেরা যে কোনো অপরাধ ও ভুল ও খারাপ কাজ করতেই পারে।’কেউ কি আগে জানতো যে ডোনাল্ড রামসফেল্ড নিজেও একজন নৈরাজ্যবাদী? আমি ভাবছি রডনি কিংকে প্রহার করার পর লস এনজেল্সে এ যে দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল, তখনও কি তিনি এমন মতই ধারণ করতেন? মার্কিন জেলখানার ২০ লাখ বন্দির ক্ষেত্রেও কি তিনি এই বন্ধনহীন স্বাধীনতার তত্ত্ব প্রয়োগ করতে রাজি?(পৃথিবীর ‘সবচে মুক্ত’ দেশের জেলখানায় আছে সবচে’ বেশি সংখ্যক বন্দি।উনি কি তার এই তত্ত্বের গুরুত্ব নিয়ে তরুণ আমেরিকান-আফ্রিকানদের সঙ্গে আলোচনা করবেন, যাদের শতকরা ২৮ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের কোনো না কোনো সময় কাটাবে জেলখানায়?তিনি কি অনুগ্রহ করে ব্যাখ্যা করবেন, কেন তিনি এমন একজন প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করছেন, যিনি টেক্সাসের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ডে সম্মতি দিয়েছিলেন!

ইরাকে যুদ্ধ শুরু হবার আগে রিকনস্ট্রাকশন এন্ড হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিসটেন্স কার্যালয় থেকে পেন্টাগনের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়ে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। জাতীয় জাদুঘর সে তালিকায় ছিল দ্বিতীয় স্থানে। তারপরও জাদুঘরটি শুধু লুট করাই হয় নি, অপবিত্রও করা হয়েছিল। এটা ছিল প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংগ্রহশালা। বর্তমানের ইরাক ছিল নদী তীরবর্তী মেসপটেমীয় উপত্যকার অংশ। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই সভ্যতাটি বিশ্বকে দিয়েছিল প্রথম লিপি, প্রথম ক্যালেন্ডার, প্রথম গ্রন্থাগার, প্রথম শহর এবং হ্যাঁ, বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্রও। ব্যাবিলনের রাজা হাম্বুরাবি প্রথম প্রণয়ন করেছিলেন নাগরিকদের সামাজিক জীবনাচরণের আইন।এটা ছিল এমন একটি আইন, যেখানে পরিত্যক্ত নারী, বেশ্যা, দাস এবং এমনকি প্রাণীদেরও অধিকার সংরক্ষিত ছিল। এ আইন শুধুমাত্র প্রথম প্রণীত আইনই নয়, এটা ছিল সামাজিক ন্যায় বিচারের ধারণাকে বোঝার প্রথম প্রচেষ্টা। মার্কিন সরকারের অন্যায় যুদ্ধ পরিচালনা ও ন্যায় বিচারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের জন্য এর চেয়ে অধিকতর যোগ্য রাষ্ট্র আর হতে পারে না।

ইরাকে লুটপাট চলাকালীন সময়ে অন্ধকারের রাজপুত্র রামসফেল্ড পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে, যুদ্ধের পুরোটা সময় তাকে অনুগতভাবে সমর্থন দিয়েছিল এমন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘টেলিভিশনে আপনারা যে দৃশ্যগুলি দেখছেন, বারবার অসংখ্যবার। তা আসলে একই দৃশ্য। আপনারা দেখছিলেন কিছু লোক একটি ফুলদানি নিয়ে কিছু ভবনে দৌড়াদৌড়ি করছিল। এবং এ দৃশ্যটি ২০ বার দেখানো হয়েছে এবং কেউ বলতে পারেন, ‘ওরে বাবা! এত ফুলদানী সেখানে ছিল? এটা কি সম্ভব যে পুরো দেশ জুড়ে এত ফুলদানী থাকতে পারে?’

পুরো সংবাদ কক্ষ জুড়ে হাসির রোল বয়ে গেল। যদি হারলেমের দরিদ্র নিগ্রো জনগোষ্ঠী নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন জাদুঘর লুট করে, তবে তা-ও কি সমর্থনযোগ্য? সেই ঘটনাটিকেও কি একই উচ্ছ্বাস নিয়ে স্বাগত জানানো হবে? রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাসিসটেন্স কার্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় সর্বশেষ নাম ছিল তেল মন্ত্রণালয়ের নাম।তালিকায় থাকা সব ভবনের মধ্যে কেবল এ ভবনটির নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা হয়েছিল।দখলদার সেনারা কি ভেবেছিল, সম্ভবতঃ মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য প্রস্তুতকৃত তালিকা নিচের দিক থেকে পড়া শুরু করতে হয়?

টেলিভিশনগুলি আমাদের জানাচ্ছে, ইরাককে ‘মুক্ত’ করা হয়েছে এবং নারীদের জন্য আফগানিস্তান প্রায় একটি স্বর্গরাজ্য হওয়ার পথে — একবিংশ শতাব্দীর সামনের সারির নারীবাদী বুশ ও ব্লেয়ারকে ধন্যবাদ। বাস্তব হলো, ইরাকের অবকাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর জনগণকে দাঁড় করানো হয়েছে দুর্ভিক্ষের দরজার সামনে। খাদ্য মজুদ নিঃশেষ করে ফেলা হয়েছে। এবং পুরোপুরি বিধ্বস্ত করা হয়েছে এর শহরগুলির প্রশাসনিক কাঠামো। শিয়া ও সুন্নীর বিরোধ ব্যবহার করে ইরাককে ঠেলে দেয়া হচ্ছে গৃহযুদ্ধের দিকে। ইতোমধ্যে আফগানিস্তান আবার তালেবান পূর্ববর্তী নৈরাজ্যে ফিরে গেছে, আর এর এলাকাগুলি ভাগ হয়ে গেছে পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন কয়েকজন যুদ্ধবাজ সামন্তপ্রভুর মধ্যে।

এত সব কিছুকে উপেক্ষা করেও, মের ২ তারিখে জর্জ বুশ শেষবারের মতো প্রেসিডেন্ট হবার আশায় তার ২০০৪ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেছেন। টেলিভিশনে ভাষণ সম্প্রচারের জন্য জর্জ বুশ একটি সামরিক জেট বিমানে চড়ে উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানে থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে এসে নামলেন; সম্ভবতঃ এটাই ইতিহাসে বুশের সংক্ষিপ্ততম বিমান যাত্রা। অ্যাসোসিয়েট প্রেসের বরাতে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ‘রণতরীটি উপকূলের খুব কাছে এমন অবস্থানে রাখা হয়েছিল যেন সান দিয়াগো উপকূল রেখার পরিবর্তে পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে থাকে বিশাল সমুদ্র, যাতে করে ভাষণ দানরত বুশের ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল সবচে ভালো দেখা যায় টিভিতে।’যিনি জীবনে কখনো সামরিক পেশায় ছিলেন না, সেই প্রেসিডেন্ট বুশ — একটি সামরিক বোম্বার জ্যাকেট, সামরিক বুট, সামরিক গগল্স ও হেলমেট পরে একটা উদ্ভট পোশাকে ককপিট থেকে উদিত হলেন। উৎফুল্ল সৈন্যদলের দিকে হাত নেড়ে-নেড়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাক বিজয়ের ঘোষণা দিলেন। তিনি সতর্কতার সঙ্গে বললেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক যুদ্ধে এটি মাত্র একটি বিজয়।

বিজয়ের সরাসরি ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা বা অসুবিধা আছে, কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ি বিজয়ী সৈন্যদল হিসেবে দখলদার বাহিনীর ওপর কিছু আইনগত দায়িত্ব বর্তায়, বুশ প্রশাসন যা পালনে আদৌ আগ্রহী না।২০০৪ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে আর একটি ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ জয়ের প্রয়োজন, ভাসমান ভোট নিজের পক্ষে টানার জন্য। বলির পাঁঠা হিসেবে সিরিয়া দিন দিন তরতাজা হয়ে উঠছে।

বৃদ্ধ নাৎসী নেতা হারমান গোয়েরিং বলেছিলেন, ‘নেতার সমর্থনের পেছনে জনগণকে সব সময়ই পাওয়া যায়…। আপনাকে শুধু বলতে হবে যে তারা আক্রান্ত হবার মুখে; দেশপ্রেমের ঘাটতি এবং দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়ার অজুহাতে শান্তিবাদীদের নিষিদ্ধ করতে হবে। যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই এ তত্ত্ব কার্যকর।

তিনি ঠিকই বলেছিলেন। ব্যাপরটা জলবৎ তরলং। এটাই বুশ শাসনের মূল পূঁজি। নির্বাচনী প্রচারাভিযান এবং যুদ্ধ, গণতন্ত্র এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর শাসন — এসবের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমশঃ কমে আসছে।

নির্বাচনী যুদ্ধে একমাত্র সতর্কতা ছিল মার্কিন জনগণের জীবন যেন বিপন্ন না হয়। এতে ভোটারদের আস্থা ধাক্কা খায়। কিন্তু সমস্যা হলো, যুদ্ধে মার্কিন সৈন্যদের নিহত হবার খবর কম-বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

‘অপারেশন শক এন্ড অ্য’ শুরু হবার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জেনারেল টমি ফ্র্যাংকস ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই ধরনের অভিযানের নজির ইতিহাসে আর নেই।’৩৩ সম্ভবতঃ তিনিই ঠিক ছিলেন।

আমি কোনো সামরিক ইতিহাসবিদ নই, কিন্তু শেষ কবে এরকম একটা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, কেউ বলবেন কি?

জাতিসংঘীয় কূটনীতির ‘ভালো মানুষী চেহারা’ (অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র পরিদর্শন) ব্যবহার করা হলো ইরাকের মেরুদণ্ড নিশ্চিতভাবে ভেঙে ফেলার জন্য, এর জনগণকে না খাইয়ে রাখার জন্য, পাঁচ লাখ শিশুকে মেরে ফেলার জন্য এবং দেশটির অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ধ্বংস করার জন্য। যখন এটা নিশ্চিত করা গেলো যে ইরাকের বেশিরভাগ অস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন স্বেচ্ছাপ্রণোদিতদের জোট (সঠিক করে বললে বলা যায়, ভীত সন্ত্রস্ত এবং আত্মবিক্রীতদের জোট) একটি দখলদার বাহিনী পাঠায়, ইতিহাসে এমন কাপুরুষোচিত কার্যক্রম সত্যিই বিরল!

ইরাক মুক্তির অভিযান? আমি অবশ্যই তা মনে করি না। বরং এটা ছিল অনেকটা এমন অপারেশন ‘চলো-দৌড়াই-তবে-তার-আগে-তোমার-ঠ্যাংটা-ভাঙতে-দাও।’

যুদ্ধ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে, ফ্রান্স, জার্মান ও রাশান সরকার — যারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ যুদ্ধকে বৈধতা দানের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করেছিল; তারাই আবার মনে-প্রাণে চাইতে থাকে, যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জেতে। প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক তখন ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীকে ফ্রান্সের আকাশ সীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।জার্মানিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে যুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জশ্চকা ফিশার জনসম্মুখে সাদ্দাম হোসেন সরকারের ‘দ্রুত পতন’-এর ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করেছিলেন।৩৬ ভ্লাদিমির পুতিনও প্রকাশ্যে একই আশা জানিয়েছিলেন।

আক্রমণকারী পক্ষকে কাপুরুষোচিতভাবে সমর্থন দেয়ার আগে, এই সরকারগুলিই যুদ্ধ-পূর্ব ইরাকের বাধ্যতামূলক নিরস্ত্রীকরণে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। গণিমতের মালে ভাগ বসানোর বাসনা ছাড়াও, এই সরকারগুলি আশা করেছিল যুদ্ধপূর্ব সময়ে ইরাকের সাথে করা তাদের তেল চুক্তিগুলিকে মার্কিন সাম্রাজ্য যথাযথ সম্মান দেখাবে। পুরনো সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে, অতি সাদা-মাটা না হলে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না।

ইরাক আগ্রাসন-প্রস্তুতি পর্বের সস্তা উত্তেজনা এবং জাতিসংঘে দেয়া অতি নৈতিক ভাষণকে পাশ কাটিয়ে, যখন আসল যুদ্ধ শুরু হলো, পশ্চিমা সরকারগুলি অপ্রতিরোধ্যভাবে, তাদের নিজ দেশের বেশিরভাগ জনগণের বিরোধিতা উপেক্ষা করে জোট বেঁধেছিল। যখন তুর্কী সরকার, যুদ্ধে তুর্কী ভূখণ্ড ব্যবহারের মার্কিন সরকারের বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দেশের শতকরা ৯০ভাগ জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপেক্ষা করে, তখন মার্কিন সরকার দেশটিতে ‘গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি’র অভিযোগ তোলে।‘গালাপ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি সংগঠনের জরিপ মতে, এককভাবে আমেরিকা ও তার মিত্রদের মাধ্যমে পরিচালিত কোনো যুদ্ধের প্রতি, ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রেই শতকরা ১১ ভাগের বেশি সমর্থন দেখা যায় নি।কিন্তু ইংল্যান্ড, ইটালি, স্পেন, হাঙ্গেরী এবং অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকে বরং প্রশংসা করা হলো, যারা কিনা তাদের নিজেদের জনমতকে পাত্তা না দিয়ে এই অবৈধ আগ্রাসনকে সমর্থন করেছিল। সব ধরনের সম্ভাবনায় এটিই গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আসলেই এটা কি? নয়া গণতন্ত্র? (ব্রিটেনের ‘নয়া শ্রমিকদের’ মতো?)

অর্থলিপ্সু, যুদ্ধবাজ সরকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ১৫ ফেব্রুয়ারি, আগ্রাসনের সপ্তাহ কয়েক আগে, ৫টি মহাদেশের প্রায় ১ কোটি লোক রাস্তায় নেমে আসে যুদ্ধের বিরুদ্ধে। গণনৈতিকতার এমন অসাধারণ প্রকাশ বিশ্ব এর আগে প্রত্যক্ষ করে নি।আমি নিশ্চিত, আপনাদের মধ্যে অনেকেই সেই প্রতিবাদ মিছিলে ছিলেন। তাদেরকে — অর্থাৎ আমাদেরকে — চরম বিতৃষ্ণার সাথে উপেক্ষা করা হয়েছিল। যুদ্ধবিরোধী গণ মিছিল প্রসঙ্গে প্রশ্নের মুখোমুখি হলে প্রেসিডেন্ট বুশ বলে, ‘এটা আসলে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপার, মানে আমি বলতে চাচ্ছি যে নীতিটি নির্ধারিত হবে ফোকাস গ্রুপ আলোচনার ওপর। একজন নেতার ভূমিকা হওয়া উচিৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে রেখে নীতি নির্ধারণ করা, এক্ষেত্রে নিরাপত্তা মানে জনগণের নিরাপত্তা।’

গণতন্ত্র, আধুনিক বিশ্বের এক পবিত্র গরু, যা এখন সংকটাপন্ন। এবং সংকটটা বিশাল সংকট। গণতন্ত্রের নামে করা হচ্ছে ক্রুদ্ধ সব কার্যকলাপ। এটা ক্রমশই একটা সারশূন্য শব্দে পরিণত হচ্ছে, একটা সুন্দর খোলস। কোনো বিচারেই এটা কোনো অর্থ ধারণ করে না। আপনি এর যে অর্থই দাঁড় করাতে চান, এটা তাই-ই বোঝাতে পারে। এই গণতন্ত্র হলো মুক্ত বিশ্বের এক বেশ্যা, খুশীমতো কাপড় খুলতে বা পরতে রাজি, যে কোনো ধরনের আবদার মেটাতে আপত্তিহীন, ইচ্ছেমতো ব্যবহার এবং অপব্যবহারের জন্য হাতের নাগালেই থাকে।

কিছু দিন আগেও, এই আশির দশক পর্যন্ত, মনে হচ্ছিল যে গণতন্ত্র বুঝি সত্যি সত্যিই সামাজিক ন্যায় বিচারের একটা মাত্রা অর্জনে সফল হবে।

কী ভাবে আধুনিক গণতন্ত্রকে মোকাবেলা ও দুর্বল করতে হয়, নব্য উদার পূঁজিবাদীরা দীর্ঘ সময় ধরে আধুনিক গণতন্ত্রের সংস্পর্শে থাকার ফলে তা জেনে গেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভেতরে ঢুকে — ‘স্বাধীন’ বিচার ব্যবস্থা, ‘মুক্ত’ গণমাধ্যম, জাতীয় সংসদ — নিজেদের উদ্দেশ্য মতো ব্যবহার করার কৌশল দক্ষতার সাথে রপ্ত করেছে তারা। কর্পোরেট বিশ্বায়নের প্রকল্প ভেঙে ফেলেছে দক্ষতাগুলিকে। অবাধ নির্বাচন, মুক্ত গণমাধ্যম এবং স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার কোনো অর্থই থাকে না, যখন মুক্ত বাজার তাদের পণ্যে পরিণত করে সর্বোচ্চ দরদাতার জন্য দর হাঁকে।

গণতন্ত্র যে কতখানি অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েছে, সমকালীন গতন্ত্রগুলির ভেতরে কী হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে এ ব্যাপারে আমরা বেশ স্বচ্ছ ধারণা পেতে পারি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র: ভারত (যার সম্পর্কে আমি পূর্বেই বিস্তারিত লিখেছি, তাই আজ রাতে এ বিষয়ে কিছু বলবো না)। পৃথিবীর সবচে’ আকর্ষণীয় গণতন্ত্র: দক্ষিণ আফ্রিকা। পৃথিবীর সবচে’ ক্ষমতাশালী গণতন্ত্র: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এবং সবচে শিক্ষণীয়, যার জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে, বিশ্বের সেই নব্য গণতন্ত্র: ইরাক।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩০০ বছর ধরে সংখ্যালঘু সাদা চামড়ার শাসকগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী শাসন দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ কালো চামড়াদের যে নিষ্ঠুরভাবে দমিয়ে রেখেছিল, তার অবসান ঘটেছিল ১৯৯৪ সালে বর্ণ বৈষম্যহীন বহুদলীয় গণতন্ত্র ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে। এটা ছিল একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উল্লেখযোগ্য অর্জন। তারপরও ক্ষমতায় আসার ২ বছরের মাথাতেই আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস শর্তহীনভাবে নতজানু হয়েছিল মুক্তবাজার নামক ঈশ্বরের কাছে। ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার, বেসরকারিকরণ এবং উদারীকরণ কার্যক্রম কেবলমাত্র ধনী-গরীবের মধ্যকার বিদ্যমান বিশাল বৈষম্যই বাড়িয়েছে। প্রায় ১০ লাখেরও বেশি লোক চাকরি হারিয়েছে। মৌলিক সেবা খাত, যেমন: বিদ্যুৎ, পানি ও আবাসন ব্যবস্থার কর্পোরেটাইজেশন করার মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি দক্ষিণ আফ্রিকান, যা কিনা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ, এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়লো।২০ লাখ মানুষকে ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে।
ইতোমধ্যে সংখ্যালঘু সাদা চামড়া গোষ্ঠী, যারা এর আগে শত শত বছর ধরে অবৈধ ভাবে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এসেছে, এখন তারা আগের চেয়েও বেশি নিরাপদ। আগের মতোই তারা দেশটির জমি, কৃষি খামার, কারখানা এবং পরিত্যক্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। বর্ণবাদ থেকে নয়া উদারবাদী শাসনে স্থানান্তর তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনে নি। সোজাসুজি বললে, এটা হচ্ছে বুঝে-শুনে করা এক ধরনের সচেতন বর্ণবাদ। এবং এসবই করা হচ্ছে গণতন্ত্রের নামে।

গণতন্ত্র শব্দটির ব্যবহার ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের ‘নব্য উদার পুঁজিবাদ’ বোঝাতে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতেও গণতান্ত্রিক চর্চাকে কার্যকরভাবে খর্ব করা হয়েছে। সংবিধান, আইন বিভাগ, সংসদ, প্রশাসন এবং, সম্ভবতঃ সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ যেটি, স্বাধীন গণমাধ্যম যা কিনা সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোগত ভিত্তি প্রস্তুত করে; এসবের মধ্যকার ভারসাম্যকে খুবই গোপনীয়তা ও চাতুর্যের সাথে খর্ব করার প্রক্রিয়ায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকছে রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমের হর্তা-কর্তা, বিচারপতি, শক্তিশালী কর্পোরেট তদবিরকারী এবং সরকারি আমলারা। এই জড়িত থাকার প্রক্রিয়া যদিও ক্রমশঃই বাড়ছে, তবে তা পুরোপুরি খোলামেলাও না আবার গোপনীয়ও না। উদাহরণস্বরূপ, ইতালীর প্রধান মন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি নিজের স্বার্থে প্রধান প্রধান সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। দি ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি শতকরা ৯০ ভাগ ইতালীয় টিভি দর্শকদের নিয়ন্ত্রণ করেন।৪৩ সম্প্রতি ঘুষ গ্রহণের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হয়ে তিনি বার বার জোর দিয়ে বলছিলেন যে, ইতালিকে বামপন্থীদের হাত থেকে রক্ষা করার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি তিনিই। তিনি বলেছিলেন, ‘আর কত দিন আমি এভাবে ত্যাগ স্বীকার করে যাব?’৪৪ ইতালির বাকি ১০ ভাগ টিভি দর্শকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এ জাতীয় উক্তি খুব একটা সুখপ্রদ ছিল না। বাক স্বাধীনতার মূল্য কত? কার জন্য এই বাক স্বাধীনতা?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যমের দিকটা আরো জটিল। ক্লিয়ার চ্যানেল ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইনকরপোরেটেড দেশের বৃহত্তম রেডিও স্টেশন। এটা ১২ শ’রও বেশি চ্যানেল পরিচালনা করে, হিসাবে, একত্রে এগুলি বাজারের শতকরা ৯ ভাগ।এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বুশের নির্বাচনী প্রচারণার শতকরা ১০ ভাগ খরচ বহন করে। যখন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল, তখন ক্লিয়ার চ্যানেল সারা দেশ জুড়ে দেশপ্রেমের প্রকাশ হিসেবে যুদ্ধের পক্ষে আয়োজন করে ‘আমেরিকার জন্য র‌্যালি’।তারা তাদের রেডিও স্টেশনগুলিকে ব্যবহার করছিল যুদ্ধের পক্ষের ঘটনাগুলির অব্যাহত প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে, আবার ঘটনাস্থলে তাদের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছিল, যেন ওগুলি সব ব্রেকিং নিউজ। সমর্থন আদায়ের যুগ পেরিয়ে এখন আমরা আছি খবর উৎপাদনের যুগে। শীঘ্রই, গণমাধ্যমের নিউজ রুমগুলি তাদের ভান ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকের বদলে থিয়েটার পরিচালকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করবে।
যেহেতু আমেরিকার বিনোদন ব্যবসা দিনে-দিনে অনেক বেশি হিংস্র ও যুদ্ধপ্রিয় হয়ে উঠছে, এবং আমেরিকার যুদ্ধগুলিও ক্রমশঃ বিনোদন ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে; এর মধ্যে বেশ আকর্ষণীয় কিছু অদল-বদলও ঘটে যাচ্ছে।

আড়াই লক্ষ ডলার ব্যয়ে কাতারে নির্মিত যে মঞ্চ থেকে জেনারেল টমি ফ্রাঙ্কস অপারেশন শক এন্ড অ্য সম্পর্কে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিং দিতেন, সেই মঞ্চের নকশাকারীই আবার ছিলেন ডিজনী, এমজিএম এবং ‘সুপ্রভাত আমেরিকা’র মঞ্চের নির্মাতা।

কী নিষ্ঠুর পরিহাস, আমেরিকা, যে হচ্ছে বাকস্বাধীনতা মতবাদের পক্ষে নিষ্ঠাবান সোচ্চার রক্ষক, এবং (এখন পর্যন্ত) যার আছে একে রক্ষা করার ব্যাপক আইনী ভিত্তি; সেই-ই আবার স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করার পরিধিকে সীমিত করছে। অদ্ভুত ও জটিল এক পদ্ধতিতে দেশটি বাকস্বাধীনতা রক্ষার আইনী ও তাত্ত্বিক বাদ-প্রতিবাদের মুখোশের আড়ালে ঢেকে রাখছে বাকস্বাধীনতার প্রকৃত চর্চার সম্ভাবনা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ ও বিনোদন শিল্পের বেশিরভাগই হাতে গোনা কয়েকটা কর্পোরেট সংস্থা, যেমন: এওএল-টাইম ওয়ার্নার, ডিজনী, ভায়াকম, নিউজ কর্পোরেশন।৪৮ এ কর্পোরেট সংস্থাগুলির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে আছে টিভি স্টেশন, ফিল্ম স্টুডিও, রেকর্ড কোম্পানি এবং প্রকাশনা সংস্থা। প্রকৃত অর্থে, মত প্রকাশের মুক্তির পথগুলি রুদ্ধ।

একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আমেরিকার মিডিয়া সাম্রাজ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েলের পুত্র ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান মাইকেল পাওয়েল যোগাযোগ শিল্পকে আরো বেশি উদারীকরণের প্রস্তাব করেছিলেন, যা কার্যতঃ আরো বেশি নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাবে।

কাজেই এ হচ্ছে অবস্থা — বিশ্বের গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি আইনের চোখে আদৌ নির্বাচিত নন। আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট তাকে এ দায়িত্ব উপহার দিয়েছে। এই ভুয়া প্রেসিডেন্সির জন্য আমেরিকার জনগণকে কতখানি মূল্য দিতে হয়েছে?

জর্জ বুশের তিন বছরের শাসন সময়ে আমেরিকান অর্থনীতির চিত্র এমন যে ২০ লাখেরও বেশি লোককে চাকরি হারা হতে হয়েছে।৫০ ব্যাপক সামরিক খরচ, কর্পোরেট সংস্থাগুলির প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও ধনীদের রাজস্ব মওকুফ মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সঙ্কট ডেকে এনেছে। প্রাদেশিক সরকারগুলির জাতীয় কাউন্সিলের একটি জরিপে দেখা যায়, ২০০২ সালে জনসেবা, স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দ থেকে প্রদেশগুলি ৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কাট-ছাট করেছে। এ বছরও তারা মোট বরাদ্দ থেকে আরো ২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমানোর পরিকল্পনা করেছে।অর্থাৎ সেবা খাতে মোট ব্যয় সংকোচনের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রস্তাবিত বাজেটে বুশ ইরাক যুদ্ধে ব্যয়ের জন্য ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবার জন্য কংগ্রেসের কাছে প্রস্তাব করেছিল।

তাহলে যুদ্ধের খরচ যোগাচ্ছে আসলে কারা? আমেরিকার দরিদ্ররা। এর শিক্ষার্থীরা, এর বেকাররা, সন্তানের ব্যয়ভারের দায়িত্ব একাই পালন করে এমন মায়েরা, হাসপাতাল ও বাড়িতে চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগিরা, এর শিক্ষক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা।

যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে আসলে কারা? এক্ষেত্রেও জবাব, আমেরিকার গরিবেরাই। ইরাকের তপ্ত মরুভূমিতে যেই সৈন্যরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তারা আমেরিকার উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান না। কংগ্রেস ও সিনেটের সকল প্রতিনিধিদের মধ্যে মাত্র একজনের সন্তান ইরাকে যুদ্ধরত।আমেরিকার ‘স্বেচ্ছাসেবী’ সেনাবাহিনী প্রকৃত অর্থে নির্ভর করেছে জীবিকা ও শিক্ষা অর্জনের উপায় খুঁজছে এমন ভাসমান গরীব শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিন এবং এশীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। জাতীয় এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, পুরো সশস্ত্র বাহিনীর শতকরা ২১ ভাগ এবং সেনাবাহিনীর শতকরা ২৯ ভাগই হলো আফ্রো-আমেরিকান বংশোদ্ভূত। অথচ এরা মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১২ শতাংশ। জনগোষ্ঠীর অনুপাতে আমেরিকার সেনাবাহিনী ও জেলখানায় আফ্রো-আমিরানকানদের এই ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব; ব্যাপারটা কি পরিহাসমূলক না? সর্বোচ্চ কার্যকারিতার দিকটিকে বিবেচনায় এনে বিষয়টিকে সম্ভবতঃ ইতিবাচক চোখে দেখা উচিৎ। প্রায় ৪০ লাখ আমেরিকান (মোট জনসংখ্যার শতকরা ২ ভাগ) অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছে।৫৫ এর মধ্যে ১৪ লাখই হলো আফ্রো-আমেরিকান, অর্থাৎ ভোটাধিকারসম্পন্ন শতকরা ১৩ ভাগ কালো জনগোষ্ঠীকে ভোট দেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও আফ্রো-আমেরিকানদের ভূমিকা ইতিবাচক। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে সম্প্রদায় হিসেবে আফ্রো-আমেরিকানদের আয়ুষ্কাল চীনা, ভারতের কেরালা প্রদেশ (যেখান থেকে আমি এসেছি), শ্রীলঙ্কা অথবা কোস্টারিকার জনগণদের থেকেও কম।৫৭ বাংলাদেশীদের গড় আয়ু ৪০ বছর, যা হারলেমে বসবাসকারী আফ্রো-আমেরিকানদের চেয়েও বেশি।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ৭৪ তম জন্মবার্ষিকীর বছরটিতে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ মিশিগান ইউনিভার্সিটি পরিচালিত আফ্রো-আমেরিকান ও ল্যাটিন জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ইতিবাচক কর্মসূচির তিরস্কার করেন। তিনি এটাকে ‘বিভেদ সৃষ্টিকারী’, ‘অন্যায্য’ ও ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেন।ফ্লোরিডা রাজ্যে জর্জ বুশকে নির্বাচনে জেতানোর উদ্দেশ্যে কালোদেরকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে সরিয়ে রাখার সফল প্রচেষ্টা অবশ্যই অনায্যও ছিল না, অসাংবিধানিকও ছিল না। আমার মনে হয় না ইয়েল-এর শ্বেতাঙ্গদের জন্য নেয়া মানোন্নয়ন মূলক পদক্ষেপ ন্যায্য ও সাংবিধানিক।

কাজেই আমরা জেনে গেছি, যুদ্ধের জন্য মূল্য দিচ্ছে কারা। কারা এতে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু লাভের গুড় খাবে কে? শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পুনর্গঠনের কাজগুলি বাগিয়ে নিচ্ছে কারা?এরা কি হতে পারে আমেরিকার গরিব, বেকার আর চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত রোগী? হতে পারে আমেরিকার অবিবাহিত মা? অথবা আমেরিকার কালো ও ল্যাটিন সংখ্যালঘু?
জর্জ বুশ আমাদের নিশ্চিত করেছিলেন, ইরাকি তেলের মালিকানা ইরাকের জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়াই ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডমে’র উদ্দেশ্য। এর মানে হচ্ছে ইরাকের তেল বহুজাতিক কোম্পানীর মধ্যস্থতায় ফেরত যাবে ইরাকের জনগণের কাছে। বেকটেল, শেভরন, হ্যালিবার্টনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যস্থতায়।

আরো একবার জানা গেল, এটা আসলে কর্পোরেট সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং সরকারি নেতৃবৃন্দের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টিকারী একটি ছোট কিন্তু প্রতিপত্তিশালী গোষ্ঠী। এই অনৈতিকতা, পারস্পরিক স্বার্থ সিদ্ধির প্রক্রিয়া চরমভাবে নীতি বহির্ভূত।

খেয়াল করুন: ‘প্রতিরক্ষা নীতি বিভাগ’ হচ্ছে সরকার কর্তৃক নিয়োগ দেয়া এক দল কর্মকর্তাদের কার্যালয়, যারা পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নে পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রামসফেল্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসকল কর্মকর্তার নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এর সকল সভাই অনুষ্ঠিত হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে, যার কোনো তথ্যই জানার সুযোগ পায় না সাধারণ জনগণ।

ওয়াশিংটন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পাবলিক ইন্টিগ্রিটি’র অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিরক্ষা নীতি বিভাগের ৩০ জন সদস্যের মধ্যে ৯ জনই সে ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, যাদেরকে ২০০১ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে ৭৬ বিলিয়ন ডলার সম মূল্যের প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।এদের মধ্যে একজন হলেন নামি-দামি, আন্তর্জাতিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান বেকটেলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিহান (অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস জেনারেল)।প্রেসিডেন্ট বুশের রপ্তানী কাউন্সিলে আছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রিলি বেকটেল।সাবেক মন্ত্রী জর্জ শুলজ যিনি বেকটেলের পরিচালনা পরিষদেরও একজন সদস্য, তিনিই আবার ইরাক মুক্ত করার জন্য গঠিত কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান।যখন নিউইয়র্ক টাইমস তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তার এ অবস্থান কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থগত দ্বন্দ্ব তৈরি করবে কি-না, জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘এতে বেকটেলের কতটুকু লাভ হবে, জানি না। কিন্তু এ কাজের জন্য বেকটেলই উপযুক্ত কোম্পানি।’

পুরস্কার হিসেবে বেকটেল ইরাক পুনর্গঠনের কাজে ৬৮ কোটি মার্কিন ডলারের ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে।সেন্টার ফর রেসপন্সিভ পলিটিক্সের সূত্রমতে, ১৯৯৯-২০০০ এর নির্বাচনী প্রচারাভিযানে বেকটেল রিপাবলিকান পার্টিকে ১৩ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিল।

আমেরিকার সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এমন নির্লজ্জ চালাকি আর প্রতারণামূলক কৌশল ব্যবহার করেই। ২০০১ সালের ১৩ অক্টোবরে ‘ইউএসএ প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’ নামে যে আইন অনুমোদিত হয়েছিল, তা বিশ্ব জুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে একই ধরনের সন্ত্রাস বিরোধী আইন প্রণয়নের নীল নকশা হিসেবে। প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়ার সময় এর পক্ষে ভোট পড়ে ৩৩৭ আর বিপক্ষে মাত্র ৭৯। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যানুযায়ী,‘ বহু জনপ্রতিনিধি বলেছিলেন বিলটি নিয়ে আলোচনার, এমনকি পড়ে দেখার মতো কোনো পরিস্থিতিও সংসদ কক্ষে ছিল না।’

প্যট্রিয়ট অ্যাক্ট প্রণয়ণের মাধ্যমেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্বয়ংক্রিয় নজরদারী যুগের সূচনা ঘটল। এই আইন সরকারকে টেলিফোন ও কম্পিউটারে আঁড়ি পাতা, নাগরিকদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার সাংবিধানিক কর্তৃত্ব দেয়। কয়েক বছর আগেও ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর এ ধরনের রাষ্ট্রীয় খবরদারির ভাবনাই ছিল পুরো অগ্রহণযোগ্য একটা ব্যাপার।আইনটি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইকে এমনই ক্ষমতা দিল যে, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তারা গ্রন্থাগার ব্যবহারকারীর কাছে থাকা এবং বইয়ের দোকানের ক্রেতাদের কেনা যে কোনো ধরনের প্রচারপত্র, বই বা নথিপত্র জব্দ করার অধিকার পেল।স্বাধীন মতামত এবং অপরাধমূলক কার্যক্রমের মধ্যকার বিভেদরেখা ভেঙে দিল এবং অহিংস প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আইন ভঙ্গকারী ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করে দিল।

এর মধ্যে ‘বেআইনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী’ শত শত নাগরিককে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক করা হয়েছে।(ভারতের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা হাজার-হাজার। ইসরাইলে ৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে একই দায়ে জেলবন্দি রাখা হয়েছে। আর যারা নাগরিক নয়, তাদের তো কোনো অধিকারই নাই। ওয়াশিংটনের পুরোনো মিত্র চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পিনোশেটের শাসনামলে চিলির নাগরিকদের মতো তাদেরকেও যখন-তখন ‘উধাও’ করা হতে পারে। হাজারের বেশি মানুষ — যাদের বেশির ভাগ মুসলমান বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির বংশোদ্ভূত — আটক আছে; এমনকি আইনজীবীর কাছে যাবার অধিকারও তাদের কেউ কেউ পায় না।

প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যয় বহন করা ছাড়াও আমেরিকার জনগণকে এই ‘মুক্তিযুদ্ধ’গুলির জন্য বিসর্জন দিতে হচ্ছে তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা। অন্য দেশগুলিতে ‘নয়া গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য, সাধারণ আমেরিকানদের যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা হচ্ছে নিজ দেশের প্রকৃত গণতন্ত্রের মৃত্যু।

ইতোমধ্যে ইরাককে ‘স্বাধীনতা’র উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। (অথবা তারা কি আগে-পরে সব সময় ‘উদারীকরণ’কে বোঝাচ্ছিল?) ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন জানায়, ‘বুশ প্রশাসন ইরাকের অর্থনীতিকে মার্কিন আদলে গড়ে তোলার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে।’

পুনর্গঠিত হচ্ছে ইরাকের সংবিধান। আমেরিকার পূঁজিবাদী অর্থনীতির ছাঁচে গড়ে তোলার জন্য পুনর্লিখিত হচ্ছে ইরাকের বাণিজ্য নীতি, কর নীতি এবং মেধাস্বত্ব আইন।
দ্য ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইরাকের রাস্তা নির্মাণ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পাঠ্য পুস্তক বিতরণ এবং মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক কার্যক্রমের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলির কাছে দরপত্র আহবান করেছে।

আমেরিকার কৃষকরা সারা পৃথিবীর খাদ্য চাহিদার যোগান দেবে — ছোট জর্জ বুশের এমন খায়েশ প্রকাশের পর পরই ইরাকের কৃষি ব্যবস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় ডেম অ্যামস্টুজ নামের এমন এক ব্যক্তিকে, যিনি পৃথিবীর বৃহত্তম শস্য রপ্তানীকারী প্রতিষ্ঠান ‘কারগিল’-এর সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এ নিয়োগের পর অক্সফামের নীতি নির্ধারণী পরিচালক কেভিন ওয়াটকিন বলেছিলেন, ‘ডেম অ্যামস্টুজকে ইরাকের কৃষি পুণর্গঠনের দায়িত্ব দেয়া আর সাদ্দাম হোসেনকে কোনো মানবাধিকার কমশিনের চেয়ারম্যান করা একই কথা।’

ইরাকি তেল ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ দেয়ার জন্য যে দুজনকে মনোনয়নের সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছিল, তাদের উভয়েরই অভিজ্ঞতা রয়েছে শেল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম এবং ফ্লুয়ের-এর সঙ্গে কাজ করার। বর্ণ বৈষম্যের যুগে কর্মীদের ওপর নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করার দায়ে ফ্লুয়ের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো শ্রমিকদের দায়ের করা মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন।৭৯ নাইজেরিয়ার ওগোনি আদিবাসিদের এলাকায় শেল প্রতিষ্ঠানটির ভয়াবহ ধ্বংসলীলা তো প্রায় সর্বজনবিদিতই।

টম ব্রোকাউ (আমেরিকার বহুল পরিচিত টিভি উপস্থাপকদের একজন) প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে বেশ সাবলীল ও সুনির্দিষ্ট অবস্থানের। তিনি বলেছিলেন, যে কাজগুলি আমরা করতে চাই না, তার মধ্যে একটা হচ্ছে ইরাকের অবকাঠামো ধ্বংস করা। কেননা, কয়েকদিনের মধ্যে দেশটি আমাদের হতে যাচ্ছে।’

এখন যেহেতু মালিকানার প্রক্রিয়াধীন কাজগুলি সুনিশ্চিত হবার পথে, ইরাক তাই ‘নয়া গণতন্ত্রে’র জন্য প্রস্তুত।

সুতরাং, লেনিন যেভাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে জিজ্ঞেস করতেন: এখন আমাদের করণীয় কী?

আসল কথায় আসা যাক… আমাদের এ সত্য মেনে নিতে হচ্ছে যে, আমেরিকার যুদ্ধ কলা-কৌশলকে সফলভাবে মোকাবেলা করার মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক শক্তি নেই। মার্কিন সরকার তার সামরিক শক্তি আরো কঠোরভাবে প্রয়োগ করার জন্য যে সুযোগের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে বসেছিল, সন্ত্রাসী হামলা তাকে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। আর একটি সন্ত্রাসী হামলা হলে, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন দিন দুয়েকের মধ্যেই দ্বিতীয় ‘প্যাট্রিয়ট’ আইন পাশ হয়ে যাবে। মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এটা বলে যদি তর্ক তোলা হয় যে, সামরিক হামলা সন্ত্রাসী হামলার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে, তবে তা হবে অর্থহীন। এটা অনেকটা ব্রার রেবিটকে (আফ্রো-আমেরিকান রূপকথার একটি সাহসী চরিত্র, যে তার নিজ বুদ্ধি বলে দুষ্টচক্রকে ভেদ করে) কাঁটা ঝোপের ভেতর ছুঁড়ে ফেলার হুমকি দেয়ার মতো। দ্য প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি নামের ডক্যুমেন্ট প্রস্তুস্তিতে দেখা গেছে, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা সম্পর্কে গঠিত সংসদীয় কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল এবং যা সরকার প্রকাশ করতে দেয় নি, তাতে ওই দিনের হামলা সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কতার উল্লেখ ছিল, যেটা আবার সরকার উপেক্ষা করে গিয়েছিল৮২ — এই তথ্য সামরিক আগ্রাসন কঠোর করলেই যে সন্ত্রাসী হামলা বাড়বে না, এ ধারণাকে অসত্য প্রমাণ করে। সব রকম বৈপরিত্য সত্ত্বেও বুশ প্রশাসন এবং সন্ত্রাসীরা হয়তো দলগতভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। তারা উভয়েই সরকারের দোষ জনগণের ঘাড়ে চাপায়। তারা উভয়েই যৌথ অপরাধ এবং যৌথ শাস্তিতত্ত্বে বিশ্বাসী। তারা উভয়ই পরস্পরের কর্মকাণ্ডে উপকৃত হয়।

মার্কিন সরকার ইতোমধ্যেই কোনো প্রকার রাখ-ঢাক না রেখেই সরাসরি প্রকাশ করেছে তাদের আগ্রাসন চালানোর উন্মাদীয় মানসিকতার। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আগ্রাসনবাদী মানসিকতা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্নায়বিক বৈকল্যের নির্দেশক। যুক্তি খাটিয়ে এমন কথাও বলা যায় যে, জাতীয় মানসিকতার ক্ষেত্রেও এর কোনো হের-ফের ঘটে না। সাম্রাজ্য সন্দেহবাতিকগ্রস্ত কারণ এর অবস্থানটাই নাজুক।

সীমানা রক্ষাকারী বাহিনী ও পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে ভৌগলিক সীমানা হয়তো রক্ষা করা যেতে পারে, কিন্তু এর অর্থনীতি দুনিয়া জোড়া বিস্তৃত। অর্থনীতির ক্ষেত্রগুলি দৃশ্যমান ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিমধ্যে বর্জন করার আহবান জানিয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ পণ্য ও কোম্পানীর নামের তালিকায় ভরে গেছে ইন্টারনেট এবং অবশ্যই বর্জন করা উচিৎ এ আহবানও সোচ্চারভাবে প্রচারিত হচ্ছে ইন্টারনেটে। কোক, পেপসি, ম্যাগডোনাল্ডস ইত্যাদি প্রথাগত টার্গেটের বাইরেও ইউএস এইড, ব্রিটিশ ডিএফআইডি, ব্রিটিশ ও আমেরিকান ব্যাংকসমূহ, আর্থার এন্ডারসন, মেরিল লিঞ্চ, আমেরিকান এক্সপ্রেস ইত্যাদি সংস্থাগুলিও নিজেদেরকে অবরুদ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করতে পারে। সারা দুনিয়া জুড়ে অ্যাক্টিভিস্টরা এ তালিকা বানাচ্ছে, আবার প্রয়োজনমতো সংযোজন, কর্তনের কাজও করছে। এ তালিকাগুলি ক্রমেই পৃথিবীব্যাপী চাপা কিন্তু বাড়তে থাকা একটি জ্বলজ্যান্ত নির্দেশিকা হয়ে উঠতে পারে। হঠাৎ করেই কর্পোরেট বিশ্বায়নের ধারণাকে আর অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হচ্ছে না, বরং সামনে তার বিস্তর ঝামেলার সম্ভাবনা রয়েছে।

এটা কল্পনা করা খুবই সরল আর সাদামাটা যে আমরা সরাসরি সাম্রাজ্যের মোকাবেলা করতে পারি। আমাদের কৌশল হওয়া উচিত সাম্রাজ্যোর কার্যকর অংশগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে একের পর এক তাদের অথর্ব করে দেয়া। কোনো লক্ষ্যই সামান্য নয়। কোনো বিজয়ই তাৎপর্যহীন নয়। গরীব রাষ্ট্রগুলির ওপর সাম্রাজ্য ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পদ্ধতির পাল্টা ব্যবহার করতে পারি আমরা। ইরাক যুদ্ধের পর যে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি পুনর্গঠনের ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার মাধ্যমে পুরস্কৃত হয়েছে, তাদের প্রতিটির ওপর আমরা জনগণের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি। এই রাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অ্যাক্টিভিস্টরা যেমন বর্ণবাদী প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিল। এগুলির প্রত্যেকটির নাম ও কুকীর্তি প্রকাশ করতে হবে এবং বয়কট করতে হবে। জোরপূর্বক এদের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ‘শক এন্ড অ্য’ অপারেশনের বিরুদ্ধে এটাই হতে পারে আমাদের জবাব। একটা চমৎকার সূচনা হতে পারে এ কৌশল।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, কর্পোরেট গণমাধ্যমের মুখোশ খুলে দেয়া যা আসলে বোর্ডরুম বুলেটিন ছাড়া কিছুই না। বিকল্প তথ্যের একটি বিশ্ব তৈরি করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেমোক্রেসি নাউ, অলটারনেটিভ রেডিও, সাউথ এন্ড প্রেস ইত্যাদি স্বাধীন গণমাধ্যমগুলির প্রতি আমাদের সমর্থন যোগাতে হবে।

গণতন্ত্রকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার লড়াই সহজসাধ্য নয়। আমাদের স্বাধীনতা কোনো সরকারের কাছ থেকে পাওয়া নয়, বরং তাদের কাছ থেকে তা আদায় করে নেয়া। আর একবার তাদের কাছে যদি আমরা অবনত হই, তা উদ্ধার করার জন্য যে লড়াই, সাদা কথায়, তাই-ই বিপ্লব। এ যুদ্ধের বিস্তৃতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মহাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এখানে অবশ্যই কোনো ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সীমিত থাকার কথা বলা হচ্ছে না, কিন্তু সফল হতে হলে, শুরুটা করতে হবে এখান থেকেই। এই আমেরিকা থেকেই। মার্কিন সরকারের চেয়ে শক্তিশালী একমাত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে দেশটির সুশীল সমাজ। আর বাকি আমরা সবাই সাম্রাজ্যের দাস। এটা বলা যাবে না যে আমরা ক্ষমতাহীন, কিন্তু আপনাদের আছে নিকটবর্তী থাকার সুবিধা। আপনাদের আছে ঔপনিবেশিক প্রাসাদ এবং সম্রাটের কার্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ। আপনার নাম ব্যবহার করেই সাম্রাজ্য তার বিজয়ের মুকুটে পালক গুঁজছে, আপনার আছে তা প্রত্যাখ্যানের অধিকার। আপনি পারেন যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানাতে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে সংরক্ষণাগার থেকে যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বন্দরে নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন আপনি। আপনি অস্বীকৃতি জানাতে পারেন সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজাধারী হতে। প্রত্যাখ্যান করতে পারেন বিজয় র‌্যালী।

প্রতিরোধের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে আপনাদের। হাওয়ার্ড জিনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ইতিহাস বইটি শুধু পড়ে দেখলেই চলবে।বিরতিহীন প্রপাগান্ডা সত্ত্বেও আপনাদের মধ্যে শত-শত জন আছেন, যারা তার দ্বারা বিভ্রান্ত হননি, বরং সক্রিয়ভাবে নিজ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি দেশপ্রেমী পরিবেশের মধ্যে থেকেও আপনারা যে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তা মাতৃভূমির জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া ইরাকি, আফগানিস্তানি, ফিলিস্তিনি লড়াকুদের চেয়ে কম নয়।

আপনারা শত সহস্ত্র নয়, লাখ-লাখ জন এ যুদ্ধে যোগ দেন, তাহলে বাকি পৃথিবীর সবাই আনন্দের সঙ্গে স্বাগত জানবে এবং দেখবেন নৃসংশতার চেয়ে মানবিকতা, ভীত সন্ত্রস্ত হওয়ার চেয়ে নিরাপদ থাকা কত মধুর! বিচ্ছিন্ন থাকার চেয়ে বন্ধুর সঙ্গ, ঘৃণার চেয়ে ভালোবাসা কত সুন্দর!

অনুবাদ: শামীমা বিনতে রহমান