দ্রোহের শিল্পকলা

নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সঙ্কটের মুহূর্ত আমরা অতিক্রম করেছি এযাবৎ। একটা ভূখণ্ডের ক্রান্তিকালের মুহূর্তে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন প্রায় সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ। ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন, আর আজকের শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে গণজাগরণ – এত সব পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে বদলে গেছে একটি ভূখণ্ডের চেহারা বারবার – অবিভক্ত ভারতবর্ষ, পূর্ব পাকিস্তান, এরপর আজকের বাংলাদেশ। আজকের এই বাংলাদেশ এর জন্ম দিতে তাই রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শহীদের শার্ট, নারীর সম্ভ্রম, লেখকের ভাষা আর শিল্পীর ক্যানভাস। সামাজিক সঙ্কটের সকল মুহূর্তেই শিল্পীরা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল। কেবল মাত্র আঁকা ছবি দিয়েতো নয় – পোস্টার লিখে, স্লোগানধর্মী ব্যানার করে, ফেস্টুন তৈরি করে, কার্টুন এঁকে, কত ঢঙ্গেই না হয়েছে প্রতিবাদ! ছবি আঁকবার ক্ষেত্রে ফাইন আর্টের নান্দনিক দিকগুলো রক্ষিত রেখেই প্রতিবাদের ভাষা খুঁজেছিলেন শিল্পীরা। তাঁরা কেবল ছবিই আঁকেননি, একই সাথে ছবি লিখেওছেন যাতে রচনা ছিল অন্যায়কে রুখে দেবার দ্রোহের ভাষা। কারণ ছবি শুধু দেখবার বস্তুইতো নয়! এর মধ্যে স্পন্দন, গতি, জীবনের নানা বোধ, অনুধাবন, অনুভূতি, দ্বন্দ্ব, সংকটের প্রতিফলনও থাকতে হয়। ‘দেখা’ এবং ‘নয়ন মেলে দেখা’ এই দুইটার মধ্যকার পার্থক্য না বুঝলে একজন সত্যিকার শিল্পী হওয়া যায় কি? আঁকবার পাশাপাশি এমন মূল্যবোধ ও মানসিকতার মিশ্রণ তাই ছবিকে ‘কালের সাক্ষ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, শিল্পী এবং তাঁর শিল্পকে স্মরণীয় করে তোলে। যে ছবি মানুষের মনকে চিন্তাশীল করে তোলে, প্রতিবাদের ভাষা শেখায়, সামাজিক দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার বিশ্লেষণ করবার মাসিকতা তৈরি করে তেমন ছবিই কিন্তু চলমান সময় এবং তাঁর বাইরের মানুষের মধ্যে প্রেরণা জোগায়। আর ঠিক তেমন ধারার প্রতিবাদ রচনা করবার প্রয়াশই থাকে শিল্পীদের মাঝে সবসময়।

চল্লিশ – সত্তর এর দশক
জয়নুল আবেদিনের ‘বিদ্রোহী’ আদর্শ প্রতিবাদী চেতনার একটি অনন্য শিল্প। কী চমত্কার গতিময় ও জীবন্ত অনুভুতির একটি ছবি! তিনি যখন ছবিটি আঁকেন, তখন বাংলাদেশে নতুন ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে। ছবিটিতে, একটি গরু তার ভেতরে লালিত প্রচণ্ড ক্ষোভ, প্রবল ইচ্ছা – সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়ে দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে। গরুটির সংক্ষুব্ধ চিন্তাই অত্যন্ত নান্দনিক ভঙ্গিতে ছবিটিতে প্রতিফলিত হয়েছে যা শিল্পী চমত্কারভাবে ঘূর্ণায়মান ব্রাশের স্ট্রোকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ কেবল ছবি আঁকতে পারা নয়, এ যেন সংক্ষিপ্ত ব্রাশের টানে অনেক কিছু বলে ফেলা। এই ছবিটিতে বাঙালি জাতির প্রতিবাদী সত্তা ও চেতনার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় এবং একই সঙ্গে অনুভব করতে পারা যায় তার ছুটে মুক্ত হবার তীব্র বাসনাও।


‘বিদ্রোহী,’ জয়নুল আবেদিন

জয়নুল আবেদিনের বাংলার গ্রামীণ জীবন এর মধ্যে জীবনের মূল স্বাদ, সুর, ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন । তাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্য খুঁজে পাওয়া যায়। আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষকে বলা হয়েছিল মানুষের গড়া দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষের করুন আবেগঘন দৃশ্য তিনি তাঁর ভেতরে লালন করেছিলেন। তাঁর লালিত আবেগের প্রকাশ হয়েছিল তাঁর ক্যানভাসে। তিনি এক অসাধারণ অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে দুর্ভিক্ষের বাস্তব দৃশ্যাবলী চিত্রায়িত করলেন। তাঁর ছবিতে স্পষ্ট আছে স্পেস জ্ঞান, লাইনস এর জোরালো অভিব্যক্তি, বিষয় গ্রহণ, কম্পোজিশন এবং চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে পটুতা।


‘দুর্ভিক্ষ,’ জয়নুল আবেদিন

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের দু’টি অংশ – পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্ম হয়। কিন্তু দুটি দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে বিরাজ করছিল স্পষ্ট মৌলিক পার্থক্য। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষাভাষী মানুষ সম্পূর্ণরূপে অন্যায্য এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাভাষার মর্যাদার দাবীতে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন সালাম, বরকত, রফিক সহ আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাজপথ। এ ঘটনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ইমদাদ হোসেন ছিলেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। তিনি আর্ট ইন্সটিটিউটের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম কমিটির কার্যালয়ে পোষ্টার ও ব্যানার তৈরী করেন। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ রফিকের রক্তমাখা শার্ট হাতে শিল্পীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার প্রস্তাবেই শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভের পেছনে লাল সূর্যের নকশাটি যোগ করা হয়। ভাষা আন্দোলনের সময় সহায়ক শক্তি হিসেবে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা শতশত হাতে লেখা পোস্টার দিয়ে সংগ্রামকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। কেবল মাত্র ছবি এঁকে এ আন্দোলনকে ঠিক ততখানি সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চালিত করা হয়ত সম্ভব হত না। শিল্পী শিক্ষক কামরুল হাসানের নেতৃত্বে ইমদাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, নিজামুল হক সহ আরও অনেকেই লিখেছিলেন ভাষা আন্দোলনের পোস্টার।
১৯৫২ সালে শিল্পী মুর্তজা বশীর লিনোকাটের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তার ‘ব্লাডি টুয়েন্টিফাস্ট’ শিল্পকর্মটিতে। ছবিটিতে তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিনটিতে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের সামনের সমাবেশ তুলে ধরেছিলেন। এই শিল্পকর্মটিতে দেখা যায় একজন গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীকে ধরে আছেন সহযাত্রীরা। তাদের হাতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা ব্যানার।

[১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারী। শিল্পী মুর্তজা বশীর]

বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করছিল।

বাংলাদেশ পর্ব: একাত্তর
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিলো মূলত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি ও সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, আর বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তির আন্দোলন শুরু হয় সত্তর দশকের একেবারে শুরুতেই। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ এমনিই রাজনৈতিক স্লোগানে মুখরিত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নবান্ন’ চিত্রকলা প্রদর্শনী। এ উপলক্ষে জয়নুল আঁকেন তাঁর ঐতিহাসিক পঁয়ষট্টি ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ স্ক্রল চিত্রটি। এতে বর্ণিত হয়েছে একসময়ের সোনার বাংলার শ্মশানে পরিণত হবার কাহিনি। মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর পছন্দের সাদা কাগজ ও কালো কালিকে। তুলির বলিষ্ঠ রেখা, সঙ্গে যুক্ত করেছেন জায়গায় জায়গায় কিছু হালকা রঙ এবং মোমের রেখা। কাহিনিনির্ভর এ স্ক্রলটি দৈর্ঘ্যর কারণেও বিশিষ্টতা দাবি করতে পারে।
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন তীব্র তেমনি গভীর। একই সাথে বাংলাদেশের চারুকলার ইতিহাসও তেমনই ঋদ্ধ ও প্রাচীন। পঞ্চাশ ও ষাট – এ দু দশকেই এদেশের চারুকলা যথেষ্ট আধুনিক আদলে মাখা চরিত্র রপ্ত করতে পেরেছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর নৃশংসতা ও পৈশাচিক আচরণ এদেশের শিল্পীদের ভাবনা ও সৃজন জগতকে নতুনভাবে আলোড়িত করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে ছবি আঁকতে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছে শিল্পী কামরুল হাসানকে। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর আঁকা জানোয়ার ইয়াহিয়ার মুখ ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ শীর্ষক শক্তিশালী পোস্টার অসাধারণ তাৎপর্য বহন করেছে।


শিল্পী কামরুল হাসান

১৯৭২ সালে আঁকা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক কামরুল হাসানের আরও একটি তেলরং ছবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কাজ হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
ষাটের দশকের প্রবীণ শিল্পী আবু তাহের সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ‘তিন শহীদ’ শীর্ষক একটি কাজ বিশেষভাবে স্মরণীয়। হাত পিছমোড়া করে দুচোখে বাঁধা অবস্থায় তিনজন মুক্তিকামী বাঙালীকে হত্যা করে খাদে ফেলে রাখা হয়েছে। আধাবিমূর্ত অবয়বভিত্তিক এই কাজটি যুদ্ধের অমানবিকতার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতমূলক একটি শিল্পকর্ম।


‘তিন শহীদ’ শিল্পী আবু তাহের

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দশক হচ্ছে ষাটের দশক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ভাষা, ঐতিহ্য, চেতনা এবং সংস্কৃতি রক্ষার যে আন্দোলনের ধারা সূচিত হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত সত্তরের দশকে এসে স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে অত্যাচার, নিপীড়ন, বৈষম্য, হত্যাযজ্ঞ থেকে মুক্তি পাবার আকাঙ্ক্ষার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে স্বাধিকার আন্দোলনে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন ষাটের দশকের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী শ্রেণীর অগ্রণী বুদ্ধিজীবীরা। শিল্পী রফিকুন নবীও ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম সাক্ষী, ধারক এবং বাহক।

সত্তরের দশকে আবির্ভূত শিল্পীর প্রধানতম প্রেরণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ। তবে তাঁদের কারো কারো মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চেতনা ঐ সময় ক্যানভাসে অলংকৃত না হলেও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দশকে স্ফুলিংগের মতন বেরিয়ে এসেছিল। শিল্পীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে অথবা নানাভাবে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন শিল্পী আবুল বারক আলভী, স্বপন চৌধুরী, শাহাবুদ্দিন প্রমুখ। সত্তরের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের কাজে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বাস্তববাদী অথবা আধা-আঙ্গিকে। এর পাশাপাশি কিউবিজম ধর্মী আধাবাস্তব ও অবয়বী, পরাবাস্তব বা প্রতীকসমৃদ্ধ আঙ্গিক কাজগুলোও স্পষ্ট ছিল। তখন অবশ্য শিল্পীদের কাছে নিসর্গ খুব প্রিয় ছিল বলে মনে হয় না।

শিল্পাচার্য্য জয়নুল আবেদীনের প্রায় সমসাময়িক ছিলেন শিল্পী এস এম সুলতান। বহুকালব্যাপী উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, দেশ বিভাগ, ধর্মীয় দাঙ্গা ও বিদেশী শোষণ-বিরুদ্ধ বিপ্লব এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যেও তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখেছেন। তার ছবি আঁকার ধরনে ছিল এক ধরনের বিদ্রোহ যেটা একজন আর্ট সম্পর্কে অসংবেদনশীল মানুষকেও প্রচণ্ড নাড়া দেয়। গ্রামীণ জীবনের প্রতি ছিল তাঁর চিরন্তন আকর্ষণ এবং সহমর্মিতা। এ কারনে চিত্রগুলোতে গ্রামীণ কৃষকদের দেখা যায় পেশীবহুল এবং বলশালী হিসেবে। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য,
“আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক রুগ্ন, কৃষকায়। একেবারে কৃষক যে সেও খুব রোগা, তার গরু দুটো, বলদ দুটো -সেটাও রোগা…।
আমার ছবিতে তাদের বলিষ্ঠ হওয়াটা মনের ব্যাপার। মন থেকে ওদের যেমনভাবে আমি ভালোবাসি যে আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ইতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়েছিলো। অর্থবিত্ত ওরাই তো যোগান দেয়। …আর এই যত জমিদার রাজা মজারাজা আমাদের দেশের কম কেউ না। সবাই তো কৃষিনির্ভর একই জাতির ছেলে। আমার অতিকায় ছবিগুলোর কৃষকের অতিকায় অতিকায় দেহটা এই প্রশ্নই জাগায় যে, ওরা কৃশ কেন? ওরা রু্গ্ন কেন- যারা আমাদের অন্ন যোগায়। ফসল ফলায়।”


গাঁতায় কৃষক ১৯৭৫ এস এম সুলতান

১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে মুখরিত ছিল রাজপথ। তত্কালীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিছিলগুলির প্রথম সারিতে থাকত পথের শিশুরা। পরিচয়হীন এই শিশুদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন রফিকুন নবী। অবশেষে ’৭৮-এ এসে এই সকল শিশুদের নিয়ে কার্টুন আঁকা শুরু করেন। পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন পথের এই শিশুদের নামকরণ করেন তিনি, ‘টোকাই’।
রনবীর আঁকা টোকাইয়ের বয়স আট। মাথায় টাক আবার কখনও গুটিকতেক চুল। পরনে চেক লুঙ্গি মোটা পেটে বেশ খানিকটা উঁচিয়ে বাঁধা। ছন্নছাড়া টোকাই এর থাকার জায়গা রাস্তার পাশে, ফুটপাতে, ফেলে রাখা কংক্রিটের পাইপের ভেতর, পার্কের বেঞ্চিতে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কাঠের গুঁড়িতে। রাস্তার কুকুর ময়লা খাওয়া কাক তার বিশ্বস্ত সঙ্গী। সে কথা বলে কাক, গরু, ছাগল, মশার সাথে। কথা বলে মানুষের সাথেও। তার কথা বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণতায় ভরা, আবার রসে সিক্ত। পেন অ্যান্ড ইঙ্কের পরে রনবী টোকাই এর রূপদান করেন জলরঙের শৃঙ্খলমুক্ত উচ্ছলতায়। রনবী’র টোকাই সমাজ ও সংসারকে তার অসামঞ্জস্যপূর্ণ দিকগুলোকে ধরিয়ে দেয় সহজ ও সরল কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের মাধ্যমে। সামাজিক অবস্থার দিকে কটাক্ষ দেখিয়ে অঙ্গুলি প্রদর্শনকারী টোকাই চরিত্রটি রনবী’র এক অনবদ্য সৃষ্টি।


রনবীর কার্টুন

১৯৯০ সালে এসে বাংলাদেশের স্বৈরশাসকের অপসারণের জন্য দেশের মানুষ গণআন্দোলনে সোচ্চার হয়েছিল। শিল্পী কামরুল এর ছবি ‘বিশ্ব বেহায়া’ সেই স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধতার প্রতিই ছিল একনিষ্ঠ সমর্থন।


‘বিশ্ব বেহায়া’ শিল্পী কামরুল হাসান

২০১৩ এর ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবীতে সোচ্চার হয়ে গোটা তরুণ সমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে দেয়াল জুড়ে অঙ্কিত হয় পাকিস্তানী শাসক এবং তার দোসর রাজাকার আলবদরদের ব্যঙ্গচিত্র। পাক সেনাদের মানব ইতিহাসের জঘণ্যতম গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালীর আত্মাহুতি, বাঙ্গালীর বিজয়ের সেই স্বর্ণোজ্জল মুহূর্ত সকলই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তুলির আঁচড়ে। চিত্রকর্মগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকালে যুদ্ধাপরাধীদের নির্মম ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড অঙ্কিত হয়েছে দ্রোহী মানসিকতায়।

[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে, ফেব্রুয়ারি ২০১৩]

২০১৩ এর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী, বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী এবং ধর্ষণকারী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের বিরুদ্ধে এবং সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ দণ্ড ফাঁসির দাবীতে তরুণ ব্লগারদের জাগরণের চলমান এই শক্তিশালী দুর্বার চেতনার অপ্রতিরুদ্ধ আন্দোলনে্র এই ব্যঙ্গচিত্রের প্যানেল আমাদের বিশেষত এই তরুণ সমাজের ক্ষুরধার চেতনাকে করেছে আরও শাণিত। এটা পুরো জাতিকেই আন্দোলিত করেছিল। শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরের এই জনস্রোতে সমর্থনকারী কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী সকলেরই দাবি – একাত্তরে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এই সকল চিহ্নিত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যদণ্ড নিশ্চিত করা।
বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডের মালিকানা পেয়েছি। সমাজের সকলের সমান অংশীদারিত্ব না থাকলে এত সহজে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারত না কখনই। স্বাধীনতায় সমর্থনকারী ও মদতকারী, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের শক্তিশালী ক্যানভাস তাই একই মার্জিনে মর্যাদার অধিকারী। জয়নুল আবেদিন প্রতীকী হিসেবে তার ক্যানভাসে আঁকতেন কাক আর কামরুল হাসান শকুন। শিল্পীদের সংবেদনশীল মন বড় আবেগ তাড়িত। তাঁদের সৃষ্টিগুলোও ঠিক তেমনই আঙ্গিকে বাঁধা। পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, ছবি – প্রতিবাদের ক্ষেত্রে শিল্পের কোনো মাধ্যমকে ছাড় দিয়েছিলেন তাঁরা? শিল্পী মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী সেই ছাত্রাবস্থায়ই জড়িত ছিলেন প্রতিবাদের মিছিলে। নিজের একটা দেশ একটা ভূখণ্ড যে সকলের কাম্য! তবে অধিকার আদায়ে যতখানি শ্রমের প্রয়োজন হয়, অধিকার রক্ষা করতে চেষ্টার প্রয়োজন তারও চেয়ে অনেক বেশী। তাই অধিকার আদায়ের বেলায় যেমন শিল্পীরা অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন, অধিকার রক্ষায় একই ভাবে সমাজে ঘটমান ন্যায় ও অন্যায়গুলোর তেমনই প্রতিবাদ করবেন, যুগে যুগে তেমনটাই আশা থেকে যায় শিল্পীগোষ্ঠীর কাছে। প্রতিবাদের ভাষার একটা অবয়ব যেমন তাঁদের আঁকবার বিষয় হবে ঠিক তেমনি তাঁদের আঁকার ভেতর থেকেও যাত্রা শুরু হতে হবে প্রতিবাদের। সমাজের রূপকে যেমন তাঁরা ধারণ করবেন তাঁদের ক্যানভাসে ঠিক তেমনি তাঁদের ক্যানভাসের রঙের রংধনুও ছড়িয়ে দেবেন চারপাশে। অসির চেয়ে যেমন মসি বড় আবার একজন শিল্পীর তুলির আঁচড়ও সেই মসির চেয়ে একেবারে কম যান না! ‘মুঘলে আজম’ সিনেমায় একজন ভাস্কর সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের প্রতি রাজার অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে দেখা যায় তারই এক ভাস্কর্যে – হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন রাজা। এমন প্রতিবাদইতো আমাদের কাম্য। আমাদের বর্তমান সমাজ ক্ষমতালোভীদের দ্বারা শোষিত। আমাদের দেশাত্ববোধ এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সমাজে নারীদের ধর্ষণ ও পীড়ন বাড়ছেই। এখন প্রশ্ন কে অশিক্ষিত আর কেবা শিক্ষিত তা নয়, প্রশ্ন হল কে শিক্ষিত আর কে সুশিক্ষিত! জিনিসপত্রের দামের উর্দ্ধগতি, ব্রেইন ড্রেইন, শিশু নির্যাতন আরও কত কত সমস্যার নাম করা যায়? আঁকবার ক্ষেত্রে বিষয়ের অভাবতো নেই? তবে? তবে আমাদের এখনকার শিল্পীদের ভেতরে প্রতিবাদ করবার সে ভাষা তাঁদের ভেতরে রোপণ করা হয়ে ওঠেনি কোন কারণে? মুক, বধির ও অন্ধ হয়ে বেঁচে থেকে কি লাভ? শিল্পীরা আঁকবেন প্রতিবাদ করবেন আর সরকার নিশ্চিত করবেন আঁকবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেই পরিবেশের। আজকাল ‘দ্রোহ’ শব্দটি বোধ হয় একতরফা হয়ে গেল। প্রতিবাদের প্রতিদান জেল, শ্লীলতাহানি, হত্যা। সেই ১৯৮৩ থেকে আমাদের শিল্পী জয়নুল আবেদীন যা শুরু করেছিলেন সেই প্রতিবাদকে রুখে দিলে অকালে বুড়িয়ে গিয়ে আমাদের সংস্কৃতি তার ঐতিহ্য হারাবে নিশ্চিত। দল-মত নির্বিশেষে আমাদের দেশের সরকারি ও বিরোধী সকল দলের সকল রাজনীতিবিদেরা নিজেরা বাঁচবেন আর আমাদের বাঁচবার সুযোগ করে দেবেন সেইটাই কাম্য। তবে সমাজে বাক্-স্বাধীনতার এই সুযোগ তৈরি করবার ক্ষেত্রেও শিল্পীদের সামনে এগিয়ে আসা চাই। সাথে থাকবেন লেখক, সাহিত্যিক সহ আরও অনেকেই। একটা কথা কিন্তু অনুধাবনযোগ্য, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে; তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে’- এই অনুধাবনকে লালন করে ক্ষমতালোভী অত্যাচারীদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া কি খুব কঠিন একটি কাজ?