রাষ্ট্রীয় সংকট ও রাষ্ট্রপতি

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চলমান সংকটটি বিস্তারিত ব্যাখ্যার আবশ্যকতা নেই। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্প খাতে নাশকতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাসহ আরও কতিপয় বিষয় উপরিউক্ত সংকটকে বহুমাত্রিক করছে। যাঁরা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী বা উগ্র সমর্থক তাঁরা এটার সমাধান চান নিজেদের সুবিধাজনক প্রক্রিয়ায়। আর দেশবাসী কিন্তু চায় সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান। সমস্যা সমাধানে দেশি-বিদেশি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সমাধানে যাদের প্রধান ভূমিকা তারা অনেকটা নিজ অবস্থানে অনড়। বলাবাহুল্য, তারা হচ্ছে আমাদের প্রধান দুটো রাজনৈতিক দল। বিরোধী দল আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েই যাচ্ছে। সেসব কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে নিচ্ছে হিংসাত্মক রূপ। উত্তরোত্তর বেড়ে চলছে জনগণের ভোগান্তি। অন্যদিকে, সরকারি দলের কর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অধিকতর অসহিষ্ণু আচরণ করছে।

আন্দোলনের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতা সহকর্মীদেরসহ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অনুরোধ করেছেন তাঁকে হস্তক্ষেপ করতে। অনুরূপ অনুরোধ নিয়ে দেশের গণ্যমান্য কতিপয় ব্যক্তিও রাষ্ট্রপতির কাছে গেছেন। রাষ্ট্রে সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরূপ অনুরোধ রাখা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। পাশাপাশি এটা আলোচনায় আনা দরকার যে এ সংকট নিরসনে তাঁর ভূমিকা হতে পারে শুধু নৈতিক। কেননা আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে কোনো নির্বাহী ক্ষমতা দেয়নি। এমনকি জরুরি অবস্থা জারির আদেশেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষর গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে।

উল্লেখ করা অসমীচীন হবে না যে এ অমর্যাদাকর বিধানটি সংযোজন করা হয় ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে। আর একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনী বিল সংসদে দুটো প্রধান রাজনৈতিক দলের সমর্থনেই পাস হয়েছিল। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদনের বিধান রুলস অব বিজনেসে সংযোজন করা হয় ১৯৯৬ সালে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাহীন রাখার বিষয়ে কার্যত একমত। শুধু দায়ে পড়লে তাঁর কাছে যায়। চায় প্রতিকার। কিন্তু সংকট থেকে শিক্ষা নেয় না যে এ জাতীয় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকা উচিত। করে না কোনো অঙ্গীকারও। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে আন্দোলনরত দলগুলো ১৯৯৫, ১৯৯৬-এর দিকে একপর্যায়ে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরূপ অনুরোধ নিয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই নিষ্ফল হয়েছিল তাদের সে প্রচেষ্টা। আর যাঁর কোনো ক্ষমতা নেই তিনি কীই-বা করতে পারেন।

১৯৭২-এ আমরা সংবিধান প্রণয়ন করেছি। এর চেতনা সর্বজন প্রশংসিত। তবে এর কতিপয় বিধিবিধান সময়ের দাবিতে পুনর্বিবেচনার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। সংবিধান প্রণয়নকালে সদ্যবিলুপ্ত পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার খারাপ দিকগুলো স্মৃতিতে রেখে কতিপয় বিধান এতে সংযোজন করা হয়েছে বলে মনে হয়। উল্লেখ করা যায়, পাকিস্তান সময়কালে গণপরিষদে সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও গভর্নর জেনারেল প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিনকে বরখাস্ত করেন। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে প্রেসিডেন্ট পদত্যাগে বাধ্য করেন। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতাকে সীমিত করার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংকট মোকাবিলায় স্বীয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু ক্ষমতা না থাকলে তাঁর কাছে এ ধরনের আসা-যাওয়াকে লোক দেখানোই বলতে হবে। তদুপরি সাংসদদের সমন্বয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। এ নির্বাচকমণ্ডলীকে একটি বৃহত্তর কলেবর দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় সরকারগুলোর প্রতিনিধিরাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

তারপর আসে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারকে তিনি কিছু পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু একজন ক্ষমতাহীন ব্যক্তির এ ধরনের মৌলিক পরামর্শ সরকার গ্রহণ করতে যাবে কেন? গ্রহণ করবে শুধু তাদের সুবিধায় তা থাকলে। আর এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লক্ষণীয় হচ্ছে। এ ছাড়া নৈতিক দিক সবল হওয়ার জন্য অন্য কিছু উপাদানেরও আবশ্যকতা রয়েছে।

যেমন রাষ্ট্রপতির মর্যাদার বিষয়টি। তিনি সারা বছরে গুটিকয় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। গ্রহণ করেন বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র। বিজয় দিবস প্যারেডে অভিবাদন নেন। আর প্রথামাফিক নথিতে সই দেন। আমরা তো তাঁকে দেশের বড় বড় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কিংবা উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর রেওয়াজও চালু করিনি। আয়োজন করতে পারি না তাঁর জন্য রাষ্ট্রীয় সফর। সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে জনা দুই ব্যতিক্রম বাদে বাকি সব রাষ্ট্রপতি দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত। সুতরাং দলনেতার প্রতি তাঁদের একটা কৃতজ্ঞতাবোধ থাকাই স্বাভাবিক।
ওয়েস্টমিনস্টার ধরনের গণতন্ত্রের কথা আমরা বলি। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান রাজা বা রানি। প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই তাঁর সামনে এসে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানান। থাইল্যান্ডের রাজার সামনে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাইকে। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের একটি দৃঢ় নৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে প্রথাগত কারণে। ভারতের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা কিছুটা আমাদের মতো হলেও প্রভাব রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাঁর নির্বাচকমণ্ডলী অনেক ব্যাপক। তদুপরি রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সম্মানের।

আমাদের দেশে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতির সময়কালে কিছুকাল বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক হতো। রাষ্ট্রপতি থাকতেন অন্দরমহলে। দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত অপর একজন রাষ্ট্রপতির মধ্যে একটু স্বাধীনচেতা মনোভাব লক্ষ করে দলটি তাঁকে হেনস্তা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পদত্যাগ করেন তিনি। গঠন করেন নতুন দল। নতুন দলের একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে গেলে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন সাবেক দলের সাথিদের দ্বারা। রেললাইন ধরে দৌড়ে তাঁকে আত্মরক্ষা করতে প্রত্যক্ষ করেছে জাতি। দায়িত্ব ছেড়ে মন্ত্রী কিংবা অনুরূপ পদ নিয়েছেন একাধিক রাষ্ট্রপতি। এ ক্ষেত্রে কি প্রভাব রাখার নৈতিক অবস্থানে থাকেন এ ধরনের রাষ্ট্রপতিরা? নৈতিক অবস্থান বিভিন্নভাবে তৈরি হয়—সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপতির মেধা ও ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি অন্য সবার তাঁকে সম্মান করতে হবে দৃশ্যমানভাবে। তার উদাহরণ আমরা কিছুমাত্র সৃষ্টি করতে পারিনি। বিরোধী দলে যাঁরা থাকেন তাঁরা রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। ঠিক তেমনি করে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় থাকেন অনুপস্থিত। রাষ্ট্রপতি আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও একই অবস্থা। দলীয় বিবেচনার বাইরে বাংলাদেশ দুজন রাষ্ট্রপতি পেয়েছিল সংসদীয় ব্যবস্থায়। তাঁদের প্রস্থানও আমরা মর্যাদাকর করিনি। একজন তো দুঃখ করে বলেছেন, কবর জিয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির করণীয় তেমন কিছু নেই।

চলমান সংকট নিরসনে বিরোধী দল থেকে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। এখন যাঁরা সরকারে আছেন তাঁরাও একসময় করেছিলেন। উভয় পক্ষ যথাস্থানেই গেছে। সেখানেই যাওয়ার কথা। তবে সেখান থেকে প্রতিকার পেতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানকে যথার্থভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি তাঁরা ভুলেও উচ্চারণ করেন না। কোনো ব্যবস্থা তো নেনই না। এখন যাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গেছেন, তাঁদের অনুভূতিটা আমাদের অজানা। তবে তাঁরা বিষয়টি নতুনভাবে ভেবে দেখে প্রতিকারের জন্য জাতির কাছে প্রতিশ্রুত হতে পারেন। যাঁরা সরকারে আছেন তাঁদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

চিরকাল সরকারে কেউ থাকেন না। তখন এ প্রতিষ্ঠানের সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তাঁদেরও হতে পারে। চলমান সংকট নতুনভাবে সামনে আনল বিষয়টি। ভেবে দেখার রয়েছে, আমাদের শাসনব্যবস্থা অনেকটা এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সংবিধান ও রুলস অব বিজনেস—এ দুটো মিলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এক জায়গায় ঠেকেছে। এটা কখনোই কারও জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে না। এমনিতে দলভিত্তিক আনুপাতিক ভোটের হারের সঙ্গে বিজয়ী দলের আসনসংখ্যার অনেক ফারাক দেখা যায়। দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হলে কোনো দলের একচেটিয়া আসন লাভের সুযোগ কমে যেত। সংসদের একটি উচ্চকক্ষ থাকার প্রয়োজনীয়তাও কেউ কেউ উপলব্ধি করেন। এগুলো করা গেলে ক্ষমতায় কিছুটা ভারসাম্য আসত। তা আদৌ হবে কি না, আর কবে হবে, এটা অজানা। আর যাঁরা করার কথা সেই রাজনীতিবিদেরা এসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি পদটির কিছু ক্ষমতায়ন করে শাসনব্যবস্থায় একটু ভারসাম্য আনার বিষয় জরুরি বিবেচনার দাবি রাখে। এমনটাই অনেকে মনে করেন। অন্তত সংকটকালে তাঁর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এ প্রতিষ্ঠানের কিছুমাত্র ক্ষমতায়নের পক্ষেও প্রধান দলগুলোর কোনো বক্তব্য নেই। উভয় পক্ষই চায় ক্ষমতা। আর তা নিরঙ্কুুশ প্রয়োগের সুযোগ। এমনকি যখন বিরোধী দলে থাকে তখনো পদ্ধতিগত পরিবর্তন চায় বলে মনে হয় না। দুর্ভাগ্য আমাদেরই। কেউ দেখে শেখে, কেউবা ঠেকে। আমরা কোনোটাই করলাম না।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।