মধ্যমেয়াদি সংকটের পথে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল ও সহিংস রাজনীতি দেশের অর্থনীতিকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে দিচ্ছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ যেখানে একটি সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিল, এখন তা ক্রমেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। দেশের নির্বাচনী অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা এখন যেভাবে চলছে, ২০১৪ সালেও যদি তা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশ একটি মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিপিডির পক্ষ থেকে আমরা গত অক্টোবরে বলেছিলাম, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। এরপর বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকও একই ধরনের প্রাক্কলন করেছে। এমনকি সম্প্রতি কেউ কেউ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও করেছেন। তা যদি হয়, তবে তিন দশক ধরে গড়ে ১ শতাংশ হারে দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল, এই দশকে (২০১০-২০) তাতে বিচ্যুতি ঘটতে পারে। অথচ, এই দশকে গড়ে ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ধাক্কা খাওয়া দেশগুলোয় প্রবৃদ্ধির হারে একবার বড় পতন হলে তা আবার ফিরিয়ে আনতে কমপক্ষে চার থেকে ছয় বছর সময় লেগে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি সে পথে এগোচ্ছে?

প্রবৃদ্ধি মার খাওয়ার মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া। গত দুই বছরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমলেও সরকারি বিনিয়োগ তা অনেকটা পুষিয়ে নিয়ে মোট বিনিয়োগের হারকে খুব একটা পড়তে দেয়নি। এবার সরকারি ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই পতন ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। বিনিয়োগের পতনের ধারা শুধু দেশীয় ব্যক্তি খাত নয়, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সত্য। এতে দেশজ আয়ের অংশ হিসেবে মোট বিনিয়োগের হার নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ফল বর্ধিত কর্মসংস্থান না হওয়া। কিন্তু অর্থনীতির ব্যষ্টিক পর্যায়ের অর্থাৎ উৎপাদন ও ব্যবসায় পর্যায়ের যে পরিস্থিতি, তাতে নতুন কর্মসংস্থান দূরের কথা, এই মুহূর্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাই হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। হরতাল-অবরোধে নিয়ত আয় হারাচ্ছেন দিনমজুরেরাও। ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর।

রাষ্ট্রীয় খাতের বিনিয়োগের দুর্বল অবস্থার প্রমাণ হলো গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে, যেখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০ শতাংশের মতো, সেখানে এবার বাস্তবায়ন হয়েছে ১৫ শতাংশ। এর বড় কারণ, বৈদেশিক সাহায্যের অবমুক্তি হচ্ছে ধীরগতিতে। গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে যেখানে ৩৬ কোটি মার্কিন ডলার নিট বৈদেশিক সাহায্য এসেছিল, এবার একই সময়ে তা এসেছে মাত্র ছয় কোটি ডলার। তাই এডিপি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে বৈদেশিক প্রকল্প সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না।

একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হয়। এখানেও টাকা অবমুক্তির হার গত বছরের তুলনায় কম। এর বড় কারণ, সরকার জুলাই-অক্টোবরে রাজস্ব আদায় করেছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ছয় হাজার কোটি টাকা কম। বছর শেষে যা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।
তবে এসব কিছু ছাপিয়ে হয়তো রয়েছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়ন প্রশাসনের ত্রিশঙ্কু অবস্থা। দৈনন্দিন কাজের বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাদের হয়তো সামান্যই সময় কিংবা উৎসাহ থাকবে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে এই উন্নয়ন প্রশাসনের গতি ফিরে পাওয়া আরও কষ্টকর হবে।

মোট আমদানির হার প্রভূত পরিমাণে কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ চাহিদা পড়ে যাওয়ায় আমদানিকাঠামোতে পুঁজি পণ্যের উপস্থিতি কমে যাওয়া। একই সঙ্গে আমরা দেখি, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের হার এখন বাজেট ঘোষণার সময়ের চেয়েও কম, যা কিনা মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে শিল্পঋণের প্রবাহের বৃদ্ধিও নেতিবাচক, যা সাম্প্রতিককালে আর দেখা যায়নি।

এই মুহূর্তে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র বেশি প্রকাশ পায় তফসিলকৃত মন্দঋণের হারের বৃদ্ধিতে। ২০১২ সালের জুনে যা ছিল ৭ শতাংশের কিছুটা ওপরে, এ বছরের জুনে তা হয়ে যায় প্রায় ১২ শতাংশ। আর এ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা আরও ১ শতাংশ বেড়ে গেছে। হল-মার্কের মতো বহু মন্দ গ্রাহককে ঋণ দেওয়া যেমন এর জন্য দায়ী, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায় মার খেয়ে অনেক প্রকৃত উদ্যোক্তাই ব্যাংককে টাকা ফেরত দিতে পারছেন না।

প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙা করার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। এর অন্যতম কারণ, জুলাই-অক্টোবর মাসে জনশক্তি রপ্তানি কমে গেছে প্রায় ২১ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রায় টাকার বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়ায় অনেক অনাবাসী হয়তো ব্যাংকের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা পাঠাতে অনুৎসাহী হচ্ছেন। আবার কেউ হয়তো দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিদেশে টাকা রাখাটাই শ্রেয় মনে করে থাকতে পারেন। আর নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণে টাকা পাঠানোর প্রবণতা ইতিমধ্যে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হচ্ছে আমাদের রপ্তানি খাত। গত পাঁচ মাসে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। একদিকে তাজরীন ও রানা প্লাজা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশে শিল্পকারখানায় কর্মপরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় উৎপাদন, পরিবহন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যেও রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো সবই আগের কার্যাদেশের কারণে, যা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ইতিমধ্যে প্রচুর কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে। ক্রেতারা আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজছেন ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে। সম্প্রতি পাকিস্তান ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ বাণিজ্য-সুবিধা পেয়েছে, ভারতও পেতে চলেছে জাপানের বাজারে। এ ছাড়া পোশাকশিল্পের শ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে যেসব শর্ত প্রতিপালন করতে হবে, তা-ও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বছর দেশে আমনের ভালো ফলন হয়েছে। চাষাধীন জমির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিঘাপ্রতি ফসলের উৎপাদনও। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় ধান-চাল আটকে গেছে মিলের চাতাল কিংবা পাইকারি গুদামে। এতে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং গ্রামীণ শিল্পকারখানা বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য আয় থেকে। শীতকালীন সবজি ও দুধের মতো পচনশীল পণ্য খুচরা বাজারে আসতে না পারায় গ্রামীণ অর্থনীতি আরেক দফা ধাক্কা খাচ্ছে। এখন তো বোরো মৌসুমই হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। কারণ, সারা দেশে কৃষকের কাছে সার-বীজ পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তবে গ্রামে বা শহরে—সব ক্ষেত্রেই মার খাচ্ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। এঁরা সবাই স্বল্পপুঁজিতে চলেন, বেশির ভাগেরই ব্যাংক-সুবিধা নেই। রাজনৈতিক নৈরাজ্যের কারণে তাঁদের নিত্যদিনের উৎপাদন ও বেচাকেনা যদি চালু না থাকে, তাহলেও তাঁদের কাঁচামালের দাম, দোকান ভাড়া ও শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। আর সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় শীতকালের ভরা মৌসুমেও কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ দেশের পর্যটন স্থানগুলো এখন পর্যটকশূন্য।

সংকটের পদধ্বনি
বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন একটি নিষ্ঠুর সময় অতিক্রম করছে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির টিকে থাকার ক্ষমতাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, অর্থনীতি আর কত দিন এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারবে? সহিংসতার রাজনীতির দাবানলে অর্থনীতির সম্ভাবনার আশা-স্বপ্নগুলো কখন সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাবে?
বর্তমানের অনিশ্চিত যাত্রা অব্যাহত থাকলে শুধু ২০১৩-১৪ অর্থবছর নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মধ্যমেয়াদি সংকটে প্রবেশ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনো দিনই বড় ধরনের ব্যক্তি বিনিয়োগ হয় না, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের গুণমানও বাড়ে না। বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ কি না, বিশ্বে এই প্রশ্নও এখন উঠছে। আমদানির উৎস হিসেবে বাংলাদেশ নির্ভরযোগ্য দেশ কি না, সেটাও আলোচিত হচ্ছে। যাঁরা একদিন বাংলাদেশের সম্ভাবনার অর্থনীতি নিয়ে প্রশংসাগাথা লিখতেন, তাঁরা আজ এ দেশের রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উচ্চকিত।

বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারকে নিয়ে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, ক্রমেই যেন তা ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ‘উন্নয়ন-রহস্য’ উন্মোচন করতে না পেরে যারা একদিন ঈর্ষান্বিত ছিল, সেসব প্রতিযোগী দেশ আজ সম্ভবত স্বস্তি বোধ করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বল্পকালীন সংকট মধ্যমেয়াদি সংকটে রূপান্তর হবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের সাংঘর্ষিক রাজনীতি আরও কত ব্যাপক হবে এবং তা কতটা দীর্ঘায়িত হবে। এতে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশের রূপান্তরিত হওয়ায় স্বপ্নপথটি আরও দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে আমাদের প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। অথচ প্রতিনিয়ত আমরা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ধ্বংস করে চলেছি। এ অবস্থায় আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা (ঋণদানকারী সংস্থা, পণ্য ও জনশক্তি আমদানিকারী দেশ, বৈদেশিক বিনিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) একবার মুখ ঘুরিয়ে নিলে তাদের আবারও ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাবে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিদেশে ভাবমূর্তির এই নতুন সংকটের দায় বহন করে বেড়াতে হবে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন এই আশঙ্কাজনক প্রবণতাগুলোকে আটকাতে পারবে বলে মনে করি না। যত দিন পর্যন্ত আমরা একটি আস্থাভাজন নির্বাচনব্যবস্থার অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান না করতে পারছি, তত দিন দেশে শান্তি ও স্বস্তি ফিরবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে রক্ষার স্বার্থে ২০১৪ সালে দ্রুতই আমাদের সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অর্থনীতিবিদ | debapriya.bh@gmail.com