বিশ্ব উপলব্ধি করছে এখানে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ নেই, আছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ

আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে যদি শান্তি ফিরে না আসে এবং জনজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা যদি এর লক্ষ্য না হয়, তাহলে কিসের জন্য এবং কাদের স্বার্থে এই নির্বাচন করা হচ্ছে- তা নিয়ে প্রতিটি নাগরিকের উদ্বেগ বোধ করার কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশে নির্বাচনের নামে যেটা হচ্ছে তা আসলে এক ধরনের প্রতারণা। এ কথা যে শুধু আমরা বলছি তা নয়, সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে, এটা স্বচ্ছ নির্বাচন হচ্ছে। ইতিমধ্যে আসন বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন।

নির্বাচনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে অবিশ্বাসের সর্বশেষ প্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি- নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে কোনো দল পাঠানো হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রধান সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না হবে। এই সিদ্ধান্ত হচ্ছে সেই পরিকল্পনার বিপরীতে, যাকে লন্ডনের ইকোনমিস্টের ভাষায় ‘ক্যু বাই ইনস্টলমেন্টস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং যে পরিকল্পনায় সরকার অনেক সময় ব্যয় করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাইরের প্রভাবের অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মৃত্যু ঘটেছে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আর এখন সেই দল সংসদের আসন ভাগাভাগি করছে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার জন্য। এটা আমাদের এবং সেই সঙ্গে প্রবীণ আওয়ামী লীগারদের বেদনাবিদ্ধ করছে। নির্বাচন কারসাজির মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।

তার চেয়ে বেশি পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এ দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, সরকার তার পরিকল্পনায় সফল হলে যা আর সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের ওপর দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকে আওয়ামী লীগ দলটির সাংগঠনিক শক্তি বাইরের অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। তা না হলে আওয়ামী লীগের মতো একটি দল স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর এবং বঙ্গবন্ধু যখন শুধু আওয়ামী লীগের নয়, গোটা জাতির অবিসংবাদিত নেতা তখন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র ধ্বংস করতে যাবে কেন? এ প্রশ্ন আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতা-কর্মীদের করতে হবে। জানতে হবে এর উত্তর।

এখন এটা সবার কাছে পরিষ্কার হচ্ছে যে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগ দখল করার একটা প্রক্রিয়া শুরু করে এবং তারপর থেকে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে আবেদন সৃষ্টি করার মতো কোনো কর্মসূচি বা ইস্যু হাজির করতে পারেনি, যেমনটি আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক চরিত্র থাকার সময়ে করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনানো জনগণের কাছে নতুন কিছু নয়।

এই অধিগ্রহণকে বামপন্থী অধিগ্রহণ না বলে তারা একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত নেতৃত্ব হিসেবে চালিয়ে দিল। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে বামপন্থী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বড় হয়ে দেখা দিল এবং গণতান্ত্রিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে গেল।

রাতারাতি কিছু লোককে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হল। এটা আমরা বলছি না, তথ্যই উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করছে যে গত পাঁচ বছরে কিছু দলীয় অনুসারী চুনোপুঁটি থেকে রুই-কাতলা বনে গেছে। তাদের মধ্যে কিছু লোকের প্রত্যেকে কম করে হলেও ২০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছে এবং সেটাই পরিপূর্ণ সত্য নয়। এ রকম কাহিনী তথ্য-প্রমাণ দিয়েই সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে এবং টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোতেও বলা হচ্ছে। এ কারণে যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর জবাবদিহির সর্বনাশা ভীতি ঢুকেছে। তাই তারা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। দেশে যা হচ্ছে তা আসলে জনগণের বিরুদ্ধে কঠিন রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই, ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের কোনো লড়াই হচ্ছে না।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক শক্তির বিচারে জামায়াতে ইসলামীকে বড় শক্তি হিসেবে গণ্য করার কোনো কারণ নেই। প্রধান রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে দলটি প্রকাশ্য রাজনীতি করে আসছে, জামায়াতে ইসলামী গোপন কোনো দল নয়। যদি দলটির ৪২ বছর আগেকার অবিভক্ত পাকিস্তানের জন্য সহানুভূতি থেকে থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মের জামায়াতিদের কি বাংলাদেশবিরোধী বলা সমীচীন হবে, যতক্ষণ না তাদের কার্যক্রম দ্বারা তা প্রমাণিত হয়? এ প্রশ্নের একটা সদুত্তর থাকা দরকার।

জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীরা বরাবরই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছে। গত নির্বাচনে দলটি সংসদে মাত্র ২টি আসন পায়। তারপরও বর্তমানে দলটিকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে বড় করে দেখানো হচ্ছে। জামায়াতের বিরুদ্ধে মৌলবাদী জঙ্গিত্বের অভিযোগ আনা হয়েছে, যাতে বিরোধী জোটের নেতৃত্বদানকারী প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ দুটি দলকেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে আওয়ামী লীগ সরকারের নিশ্চিত পরাজয় এড়ানো সম্ভব হয়।

এই কুটিল ধারণা ভেতর থেকে আসুক আর বাইরে থেকে সরবরাহ করা হোক, আওয়ামী লীগের ভেতরকার বামধারার লোকেরা একে লুফে নেয় এই আশায় যে, ইসলামী সন্ত্রাসের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ বিশ্ব প্ল্যানটিকে সমর্থন করবে। কেবল ভারত ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে এ পরিকল্পনাটি বাজার পায়নি।

অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এই কূটকৌশল কেবল ভারতের দৃঢ় সমর্থন লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট এই সেদিনও এ বিষয়ে তার ভারতীয় সমর্থনের ধারণা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন লাভের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা আওয়ামী লীগের জন্য বিরাট হতাশার কারণ। তারা জামায়াতকে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের (যেমন আল কায়দা) সন্ত্রাসবাদী দল হিসেবে দেখাতে পারেনি। বরং জামায়াত পরিকল্পিত লবিং ও নানা তৎপরতায় বিশ্বের সহানুভূতি লাভে সক্ষম হয়েছে।

ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে পাশ কাটাতে গিয়ে দেশে যে গৃহযুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা থেকে বিশ্বের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে সরানোর জন্য সরকার এই বিভেদমূলক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে বলেই সবাই ধারণা করছে।

নানামুখী প্রচার-অপপ্রচার সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবেই দেখছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সাহায্যদানের পরিবর্তে সন্ত্রাস আর জীবনহানির নিন্দা করে, তাহলে দেশের মানুষকে বাঁচানো যাবে না, দেশের অর্থনীতির ধ্বংসও ঠেকানো যাবে না।

বাংলাদেশে ধর্মীয় সন্ত্রাস নেই, আছে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ। দেশে জনমতের রাজনীতি থাকলে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ এ মাটিতে স্থান পাবে না। মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ হিসেবে বিশ্বে আমাদের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তাকে বিকৃত হতে দিলে তা হবে জাতির জন্য চরম বিপজ্জনক।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন: আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
barmainulhosein@gmail.com