অপরূপের সন্ধানে

shilpakala 2
শিল্পের গোড়াপত্তন এখন-তখনকার কথা নয়, সেই কবেকার কথা। গুহার দেয়ালে আদিমানবদের শিল্পপ্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল। মাধ্যম নয়, রঙ নয়, টেক্সচার নয়, কেবলমাত্র বিষয়ের প্রাধান্য যেখানে – ঠিক এমনই নির্মলভাবে শিল্পের চর্চা করি আমরা কজনই-বা? মানুষের ভেতরে জন্মসূত্রেই কম-বেশি মাত্রায় শিল্প থাকে একটা সুপ্ত কুঁড়ির মতন। যথোপযুক্ত পরিবেশ, একাগ্রতা, চর্চার ফলে সুপ্ত কুঁড়ি পরিপূর্ণতা পায়। তবে একই আদলে এক গণ্ডির লোককে শিল্পী তৈরি করবার চেষ্টায় সকলের ভেতর হতে একই মানের শিল্পরস নিঃসৃত হবে না। কল্পনাশূন্য মানসিকতা নিয়ে একজন মানুষ কখনোই প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে পারে না। তবে মনের ভেতরের শিল্পবোধ যা সুপ্ত কুঁড়ির আদলে থাকে, তা প্রস্ফুটিত না হলেও নিঃশেষ হয়ে যায় না। কালের স্রোতে তা কখনওবা বাড়ে, আবার কখনও শুকিয়ে যায়। কাজেই শিল্পচেতনা এবং শিল্পের চর্চা কেবলমাত্র শিল্পবোদ্ধাদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। এই শিল্পকেও কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পরিসীমার ভেতর আটকে রাখা যায় না। বলা যায় না – এই নাও এই ৫০০ গজের ভেতরেই রয়েছে শিল্প। সুসজ্জিত রিকশা, নানান ঢঙের, রঙের পোশাক, গৃহসজ্জা, সৌন্দর্যচর্চা, রকমারি রান্না – কোথায় নেই শিল্প? শিল্প তাই সর্বস্তরে বিস্তৃত। শিল্পের কোনো সীমারেখা না থাকলেও কোনটা কোন পর্যায়ের শিল্প, সেটা কিন্তু রীতিমতো ভাববার বিষয়। শিল্পীর অনুসন্ধিৎসা কতখানি প্রবল, তা কেবলমাত্র দৃষ্টরূপে বাইরে থেকে ফিরে এল, না অন্তরের গোপন রহস্য ভেদ করতে পারল, সে এক রহস্য তো বটেই। শিল্পীর শিল্পকর্মের ব্যবচ্ছেদ করলে তাই শিল্পীর শিল্পচেতনার নাগাল পাওয়া সম্ভব। শিল্পের রহস্য ভেদ হয়, তবে এই শিল্পচর্চার বা আঁকবার তো কোনো নির্দিষ্ট নিয়মকানুন নেই, এর কোনো ব্যাখ্যাও দাঁড় করানো তাই মুশকিল। তারপরও মানুষ তার যেকোনো কাজেরই মূল্যায়ন চায় বা আশা করে।

গত ৪০০-৫০০ বছর ধরে শিল্পের মূল্যায়নের ধারায় কোনটা কতখানি শিল্পের পর্যায়ে বা মজার পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বুঝতে বোধ করি ডিজাইনের রঙ-রেখা সহ মোট ১১টি উপাদানের কথা বলা হয়েছে। এইসব তত্ত্বকথা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। শিল্পীরা ছবি আঁকেন এবং সাধারণ মানুষ সেই শিল্পের রূপ-আস্বাদন করবার চেষ্টা করে। কোনো ছবি তাদের জানার পরিসীমার ভেতরে পড়লে তারা খুশি হয়।

সবার শিল্পবোধ তো আর সমান নয়! তবুও সকলের শিল্পচেতনার সাথে তাল মিলিয়ে ছবি আঁকা মুশকিল হলেও একজন আঁকিয়ে ছবি আঁকবার সময় নিজের মনকে প্রাধান্য দেবার সাথে সাথে বয়স, জীবন-আচার, বোধগম্যতা পছন্দভেদে সাধারণ মানুষের মনে একটা ইমপ্রেশন তৈরি করেন। এই তৈরি করবার কায়দা একেকজন শিল্পীর একেক রকম। কিবরিয়া, আমিনুল, কামরুল হাসানসহ আরো অনেকেই তাদের নিজস্বতা বজায় রেখে মানুষের মনে স্থান পেয়েছেন, হয়ে উঠতে পেরেছেন একজন সার্থক শিল্পী। শিল্পী হয়ে উঠবার তাগিদে এইসব প্রতিথযশা শিল্পীদের ভাবনার জগৎ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়, জানতে হয়। শিল্পশাস্ত্রগুলো রপ্ত করবার ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই। দেশের বাইরের শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে ধারণা পেলে বিভিন্ন দেশের শিল্পের ধাঁচ সম্পর্কেও জানা যায়। শিল্পকে বুঝতে গেলে শিল্পশাস্ত্রকারদের কড়া নাড়তেই হয়। তবেই একজন শিল্পী তার শিল্পকে অপরের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেন, কাজে পারফেকশন আনতে পারেন; কিন্তু এমন যদি হয়, মনের সাথে সৃষ্টির মিলন হলো না। এই যেমন কুৎসিত ভয়ঙ্কর এমনও তো হতে পারে, অসুন্দরের মধ্যে থেকেও যেমন শিল্পরূপ ফুটে উঠতে পারে, ঠিক তেমনি দুঃখের মধ্য থেকেও মহাসুন্দরের রস একজন শিল্পী বের করে আনতে পারেন।

এ কারণেই শিল্পমাত্রই সুন্দরের পূজা নয়, অসুন্দরের বাহনেও হাজির হতে পারেন সুন্দর। তবে স্বরূপ ও কুরূপ – এই দুইয়ে মিলে অখণ্ড সৌন্দর্যের মূর্তি স্থাপন কোনো সহজ কাজ নয়। তবে এও ঠিক যে, শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে আমার কোনো সৃষ্টি সম্পর্কে বোধগম্যতা অন্য মানুষকে বিচলিত করতে ব্যর্থ হলে, সেটা শিল্প হয়নি, এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরঙ বলা ভালো, আমার মনের সাথে তার মনের যোগাযোগ শিল্পের মাধ্যমে হয়তো হলো না।

shilpakala 1
ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যের ওপরই গুরুত্বারোপ করে প্রতিনিয়ত নতুন সৃষ্টির সন্ধানে নিজেকে উন্মুখ রাখা উচিত। শিল্পের সংজ্ঞা এবং সংজ্ঞাহীনতা – কোনোটাকেই তাই বাতিল করা যাবে না। মন, ভাবনা যাই বলি না কেন এ তো বিমূর্ত ব্যাপার। আঁকবার বিষয়ের চেয়ে ওই বিষয়টি ঠিক কতখানি নিখুঁতভাবে শিল্পরূপ প্রকাশ করতে পেরেছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে নানান ধরনের ইজম অনুসরণ করেন, যেমন existentialism, realistic, impressionism; তবে বর্তমানে Individualism-এরই আধিপত্য। ইউরোপিয়ান একজন শিল্পী Burne Jones মনে করেন : One of the hardest things to determine is how much realism is allowable to any particular picture.

তবে শিল্পরূপ রচনার ক্ষেত্রে বাস্তবতার ছাপ কতখানি থাকবে বা থাকবে না, তার বিবেচনা শিল্পীর ওপরেই ছেড়ে দেয়া ভালো। ছবি আঁকার সময় বিষয়বস্তু, রঙ, টেক্সচার, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদির ওপর আধিপত্য শিল্পীর থাকলেও কেন, কী জন্য আঁকছি, কার জন্য আঁকছি – আঁকবার ক্ষেত্রে এই সকল বিষয় কখনোই বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যেতে পারে না। আঁকবার বিষয় হতে পারে অনেক কিছু। তবে যত যাই হোক না কেন, না দেখা জগতের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দেখা কল্পনার বিষয়বস্তুর ভাবনা বাস্তব জগৎ হতে বিছিন্ন নয় এবং বলা ভালো বাস্তব জগতের আদলেই নেয়া।

তাই প্রচুর ছবি দেখতে হবে। শিল্পের ওপরে পড়াশুনা করতে হবে। তবে শিল্পকর্মের দক্ষতা কেবল পড়া-বিদ্যার দ্বারাই হয় না, হাতে-কলমে কাজ ও নানা প্রকরণের অভ্যাস ইত্যাদি নানা কিছুকে রপ্ত করতে হয়। তবেই পাওয়া যায় শিল্পকে। ভোগের মতন ভোগ না চড়ালে ভগবান তুষ্ট হবেন কী করে, বলুন? তাই নিজেকে কাজ করতে হবে। প্রতিনিয়ত নিজের মতন আবিষ্কার করে এঁকে যেতে হবে। কী করলে ছবিটা দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে, আত্মতৃপ্তি আসবে ও একই সাথে ১০ জনের হৃদয়েও স্থান করে নেবে, তা আপনাকেই ভেবে বের করতে হবে। ছবিকে একটা পর্যায়ে দাঁড় করাতে হবে, যাতে অন্যরা দেখে আকৃষ্ট হয়।

ভালো দিক বা ইফেক্টগুলো নিজে নিজেই খুঁজে বের করতে হবে। অনেক সময় accidental effect ভালো লেগে যায়, আবার জেনেশুনেও কাজ ভালো হতে পারে। হয়তো কোনো একটা কাজ নষ্ট করতে চাই, কিন্তু পারছি না। এই নষ্ট করতে পারাটাই কিন্তু সাফল্য। রঙের প্রয়োগের ক্ষেত্রে হালকা, গাঢ় – যাই ব্যবহার করি না কেন, সত্যিকারের শিল্প করে তুলতে পারলে সাধারণের ভেতর থেকে একটা অসাধারণ অর্থ বেরিয়ে আসতে পারে। শিল্পী রফিকুন নবী মনে করেন, “বোধগম্যতা সবাইকে দিয়ে শেখানো যায় না; অন্যের ছবি – দেশের ও বিদেশের দেখতে হবে, সমস্ত কিছু পড়াপড়ি করতে হবে, প্রচুর আঁকতে হবে।”

যুগেরও কিছুটা আজ পরিবর্তন হয়েছে। কেবল মনের খোরাককে তাই বহু শিল্পীই আমলে আনেন না। বেঁচে থাকবার তাগিদও এর পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও শিল্প মনের খোরাকে হোক বা না হোক, আঁকতে সাধনার প্রয়োজন হয়। সৃষ্টিকর্তার এই সৃষ্টি রচনার ভেতরের ও বাইরের রহস্য বুঝে তা নিজের মতো করে শিল্পীকে আয়ত্ত করতে হয়। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, যাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আর্টের কোনো দিক এড়ায়নি, তিনি সৌন্দর্য সম্বন্ধে বলেছেন, “পরম সুন্দর ও চমৎকার অসুন্দর দুই-ই দুর্লভ, পাঁচপাচিই প্রচুর এ জগতে।”

সুন্দরকে-অসুন্দরকে বোঝার উৎকৃষ্ট উপায় তাই শিল্পীই খুঁজে বের করে। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সৃষ্টির দিকে অভিনিবিষ্ট দৃষ্টি – এই হলো আর্টিস্টের রূপসাধনার নিয়ম। চোখ বন্ধ করে নয়, স্বপ্ন দেখে নয়, চোখে দেখে অনুমান করে যখন অরূপের রাজ্যের সন্ধানে চলে যাওয়া যায়, ঠিক সেখানেই চেতনার প্রজ্বল্লিত শিখার দেখা মেলে। সেখান থেকেই আপন আপন শিল্পীগুণে গুণান্বিত হয়ে উঠবেন এক একজন সত্যিকারের সাধক শিল্পী।