তারানকো ট্রেন মিস করলেই সর্বনাশ!

Oscar Fernandez Taranco

তারানকো নামের জাতিসংঘের যে বড় কর্তা এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সফর করছেন- কেনো জানি তাকে দেখে আমার বড্ড ভয় করছে। ইন্দো-মার্কিন শক্তি পৃথিবীকে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করে জাতিসংঘের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। আমাদের এই অঞ্চলের রাজনীতির জন্য পরাশক্তির সবচেয়ে বড় কর্তা হলেন জনাব তারানকো। এই বার বাংলাদেশে তার দ্বিতীয় দফার ভ্রমনে তিনি প্রথমে তার হোটেল স্যুটে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জনাব সৈয়দ আশরাফ এবং জনাব তোফায়েল আহমেদের মলিন মুখ এবং এলোমেলো বক্তব্য অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে।

জনাব তারানকো দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার চিরায়ত স্বভাব অনুযায়ী হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করার পাশাপাশি বলেছেন বেশি এবং শুনেছেন কম। টেলিভিশনে যা দেখলাম তাতে মনে হলো- জনাব তারানকো সেই বৈঠকে আন্তরিক ছিলেন না। বরং মাঝে মধ্যে তার চোয়াল এবং হাতের পেশী শক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। এরপর গণভবনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে ভাগাভাগি করে বক্তব্য দেন ড. গওহর রিজভী এবং ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তারা কেউই তারানকো- প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের ইতিবৃত্ত তুলে ধরতে পারেননি। বরং দু’জনের বক্তব্য দুই রকম ছিলো।

বিরোধী দলীয় নেতার বাসায় জনাব তারানকোর বৈঠকটি নানা দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে জনাব তারানকোকে যথেষ্ট আন্তরিক, প্রাণবন্ত এবং সাবলীল মনে হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতাকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী এবং বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিএনপি নেতৃবৃন্দকে অনেক স্বতঃস্ফুর্ত মনে হয়েছে। একথা অতি স্পষ্ট যে জনাব তারানকোর আগমনের পূর্বে বিরোধী দল দেশে ও দেশের বাইরে যথেষ্ট কূটনৈতিক তৎপরতা দেখিয়েছে। তাদের এক সিনিয়র নেতার বড় ভাই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বড় কর্তা। এই লবি ব্যবহার করে জাতিসংঘের বাংলাদেশ ডেক্সকে যে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে তা যেমন সত্য তদ্রুপ ড. ইউনূসের প্রসঙ্গও একটা বড় নেয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

কাজেই তারানকো যেসব প্রস্তাব দিবেন তা মেনে নেয়া ক্ষমতাসীনদের পক্ষে খুবই কঠিন এবং অবমাননাকর হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো- এসব প্রস্তাব না মেনে সরকার যদি কৃতিত্ব ও কর্তৃত্ব দেখাতে চায় তাহলে- পরিস্থিতি হবে আরো জটিল ও জঘন্য বিশেষ করে সরকারী দলের জন্য। গত ৩০ বছরে পৃথিবীর সে সব রাষ্ট্র একবার ইন্দো-মার্কিন রোষানলে পড়েছে- তারা কেউই দূর্ভোগ এড়াতে পারে নি। সকল দেশে প্রায় হুবহু একই পন্থা তারা অনুসরন করেছে।

তারানকো যদি ব্যর্থ হন সেক্ষেত্রে জাতিসংঘে কর্মরত আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশের ছোট খাটো ২টা ইউনিট হয়তো তাৎক্ষনিকভাবে ফেরত পাঠানো হবে। ইউরোপের জিএসপি সুবিধাও স্থগিত করা হবে। দ্বিতীয় দফায় প্রস্তাব করা হবে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র অঙ্গনে যারা দীর্ঘদিন দূতিয়ালী করেছেন তারাই এসব শংকার কথা বলে বেড়াচ্ছেন। এখন সরকার এই সমস্যা কিভাবে মোকাবেলা করবে তা দেখার সময় এসেছে।

সরকার এই মূহুর্তে জনাব এরশাদকে নিয়ে যতই মাতামাতি করুক না কেনো কোনোমতেই তারা শুভ ফল পাবে না। এরশাদ যদি পুনরায় সরকারের সঙ্গে মিলে ঘোষিত তারিখে নির্বাচন করতে সম্মত হয় সেক্ষেত্রে সরকার পড়বে আরো বিপদে। অন্যদিকে, তিনি যদি নির্বাচনে না আসেন তবে তা হবে সরকারের জন্য তুলনামুলকভাবে ভালো। কেনো ভালো হবে তা বোঝার ক্ষমতা অবশ্যই সরকারী দলের কারো কারো মধ্যে এখনো অবশিষ্ট আছে।

আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রাথীদের বেশি ভাগই এখন রাজধানীতে। তাদের মধ্যে কাউকেই পাওয়া যাবে না- যিনি বিশ্বাস করেন ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হবে কিংবা কোন প্রতিযোগীতাহীন এক তরফা নির্বাচন শুভ ফলাফল বয়ে আনবে। সকলের মনেই এক অজানা ভয় আর শংকার পাশাপাশি দলীয় বিরোধে প্রায় সবাই স্ব স্ব এলাকায় নাজেহাল হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

সরকার সমর্থক টেলিভিশন গুলো অবরোধ নিয়ে বিদ্বেষমুলক এবং ঠাট্টা মস্করামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কোন প্রাইভেট গাড়ী চলছে না অথচ বিগত দিনে শুধু ঢাকা নয়- সারাদেশেই হরতালের সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাইভেট গাড়ী চলতো। সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ছে- কিন্তু যাত্রী নেই। ট্রেন চলছে অনিয়মিতভাবে- কিন্তু যাত্রী নেই। ঢাকা শহরে রিক্সা, সিএজি কিংবা পাবলিক বাসে চড়ার মতো যাত্রী নেই। বেশির ভাগ বাস যাত্রীশূন্য। রিক্সা বা সিএনজি এখন অধিক ভাড়ায় পাওয়া যায় কিন্তু তারপরেও যাত্রী মিলছে না। নেহায়েত প্রয়োজন না হলে শহরবাসী ঘর থেকে বের হচ্ছে না।

রাতের ঢাকা পরিণত হয় এক ভূতুরে নগরী। কেউ সচরাচর বের হয় না। এমনকি পুলিশও না। রাত ১০টার দিকে মোটর সাইকেল করে কোন পুলিশ একাকী টহল দিচ্ছে- এ দৃশ্য কেউ দেখতে পাবেন না। বরং পুলিশ, র্যা ব বা বিজিবি চলাফেরা করে সদলবলে- তাদের বহরে সব সময় ৩/৪ টি গাড়ী থাকে এবং অনবরত সতর্ক সাইরেন বাজাতে থাকে- এসব কিসের আলামত।

ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। যেনো তেনো ব্যবসায়ী তারা নন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সফল ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ তাদের সংগঠনের কর্তাব্যক্তিদের সহ রাস্তায় নেমেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবন ঘেরাও করার কর্মসূচী দিয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ তো দুরের কথা- আফ্রিকার কোন দেশে এমনটি ঘটেছে কি না আমার জানা নেই।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বস নেমেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট কেলেংকারীতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস কলংকিত হয়েছে। এসব কথিত ও লোভী ভিসিদের বেহায়াপনা দেখলে মরহুম শিল্পী কামরুল হাসান কি ছবি আঁকতেন বা কি উপাধী দিতেন তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণার প্রয়োজন হবে।

প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংক যে কি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে আছে তা কেবল সংশ্লিষ্টরাই জানেন। সোভিয়েট ইউনিয়নে মিখাইল গর্ভাচভের শেষ সময়ে আর্থিক খাত হঠাৎ যেভাবে বসে পড়েছিলো কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ব্যাংক বিয়ারিংস যেভাবে এক মিনিটে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলো সেই ইতিহাসের কলংকিত অধ্যায় কি পুনরায় অভিনিত হবে এমন শংকা নিয়ে দিনানিপাত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সচিবালয় নিয়ে শোনা যাচ্ছে নানা রকম শংকার কথা। সচিবালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা যে কাজকর্ম ফেলে বাইরে এসে সরকার বিরোধীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে পারে- এই নজির সরকারী দলই সফলভাবে স্থাপন করেছিলো ইতিপূর্বে। সেদিনের সেই কুশীলবদেরকে মহানায়ক আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরষ্কৃত করার মাধ্যমে যে বদ নজীর স্থাপন করা হয়েছে তার ফল ভোগ করাটা এখন ঐতিহাসিক দায়মুক্তি বা প্রাপ্তি হয়ে দাড়িয়েছে।

কি করতে পারে এখন সরকার? এই মুহুর্তে যা করবে সবই তার বিরুদ্ধে যাবে। কখনো কখনো নিয়তি মানুষকে বড় করুন ও নির্মম প্রতিদান দেয়। মানুষ যখন ভুল স্বীকার করে নিয়তির দায় মেনে নেয়- সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। অন্যথায় নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা এবং গোস্বায় নিয়তির ভাগ্য বিধাতা এমন কিছু করেন যা মানুষের চিন্তা শক্তি কল্পনাও করতে পারে না। এদেশে যারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য পবিত্র কোরান পুড়িয়ে অন্যের ওপর দোষ চাপায়, কিংবা জীবন্ত মানুষকে গান পাউডার দিয়ে অগ্নিদগ্ধ করে অথবা অন্যকে ফাঁসানোর জন্য নিজের ঘরে আগুন দেয়- তারা যতই পূর্ব-পশ্চিমে সুখ ফেরাক না কেনো- তাদের বন্দেগী প্রথম আসমানই ভেদ করে না।