আয়না পড়া দিয়ে গণতন্ত্র খুঁজে ফেরা

বাটি চালান দিয়ে চোর ধরার চল আজকাল উঠেই গেছে প্রায়। ‘বাটি চালান’ মানে কি, মরতবাই বা কি যাদের জন্ম গাঁওগেরামে, বেড়ে উঠেছেন গাঁয়ে, তারা বুঝবেন কম-বেশি। কাঁসার বাটিতে একজন হাত রাখেন। বাটি চলতে থাকে। বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে বাটি যেখানে গিয়ে থিতু হয়, সেখানটায় নাকি লুকোনো থাকে চুরি যাওয়া জিনিস। বাটি আবার যার-তার হাতে সচল হয় না। তাকে নাকি তুলা রাশির জাতক হতে হয় (জাতিকার কথা জানা নাই-জেন্ডার বৈষম্য এখানে আছে- কলাম লেখকের কোনো কসুর কিন্তুক নাই)| নিকট অতীতেও রাজধানী ঢাকার চানখাঁর পুলে এমন একখান সাইনবোর্ড ছিল, যাতে লেখা ছিল ‘এলেম দ্বারা চোর ধরা হয়’| বাটিচালান/এলেমবাজি তফাত থাক-আমরা ঝুলোঝুলি করব আয়না পড়া নিয়ে।

আয়না মানে মিরর-যাতে প্রতিবিম্ব দেখা যায়। আয়নার অন্যবিধ ব্যবহারও রয়েছে জনাব। আমরা সেটাই জানবার কোশেশ করব। চলে যাচ্ছি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায়। ঘরিষার ইউনিয়নে একটি গ্রাম আছে তার নাম হলো গিয়ে আপনার ‘হালাইশার’| সেইখানে এই ঘটনা। সুখকর না, সাংঘাতিক। সাংবাদিকরা সেই মর্মান্তিক ঘটনার খবর ছাপিয়েছেন সংবাদপত্রে। চতুর্থ শ্রেণী পড়ুয়া এক শিশুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়েছে। প্রতিবাদ করেছিলেন শিশুটির বাবা ও বড়ভাই। তাদেরকেও নির্যাতন করা হয়। শিশুটির কি অপরাধ সে নাকি একটি ফোন সেট চুরি করেছে। সেই জন্য শাস্তি। ঘটনা থেমে থাকেনি। মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। গড়াতে থাক। এই সুযোগে আমরা ডিটেইলসের দিকে দৃকপাত করব।

হালাইশার গ্রামের সায়েদ হাওলাদারের বাড়ি থেকে একটি আই ফোন চুরি গিয়েছিল। কে নিল খোঁজ খোঁজ খোঁজ। নাহ, হদিস মিলছে না। দিন আটেক পর একটি আয়না পড়িয়ে আনা হলো। পড়িয়ে আনা মানে ঝাড়-ফুঁক দেওয়ানো আয়না নিয়ে আসা। মজিবর ফকির নামের একজন করিতকর্মা লোক এই ‘মহতী’ কাজটি সম্পাদন করেছেন। ‘আয়না’র মোজেজা ভালো। সেই আয়নায় নাম উঠেছে একই গ্রামের এক প্রাথমিক শিক্ষার্থীর। নাম তার তাসরিফ সরদার। বয়স ১০ বছর। এই ক্ষুদে চোরকে (আয়নায় নাম উঠেছে, বাস্তবে অপ্রমাণিত) বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসেন সায়েদ হাওলাদার ও নিজাম হাওলাদার। ছেলেটিকে জুত মতো বান্ধা হলো একটি গাছের সঙ্গে। গাছের ডাল দিয়ে পেটানো অতঃপর। শিশুটির বাপ ও বড়ভাই প্রতিবাদী হয়ে উঠলে তাদের জন্যেও একই দাওয়াই-এর প্রয়োগ। গাছের সঙ্গে বেন্ধে ফেলা এবং প্রহার।

যারা নির্যাতনকারী, তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি হাঁক-ডাক যথেষ্টই আছে। জোর যার মুল্লুক তার। তাদের কায়-কারবার অন্যরা দেখেছেই শুধু। বাধা দিতে, প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। কে জানে, কেউ ভুলেভালে সাহস করে ফেললে তাকেও ঠেঙানি খেতে হতো। স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজ মৃধা নেতৃত্ব দিলেন সালিশ বৈঠকে। কি বিচার হলো ঐ হলো আর কি যা হয়। তেলা মাথায় তেল-ই দেয়া হলো। শিশুটির পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হলো। ১০ দিনের মধ্যে সেটা পরিশোধ করতে হবে। কী রায়, বাহা বাহা!! বেধড়ক পিটুনিতে শিশুটির অবস্থা গুরুতর হলে তাকে ভর্তি করতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

নির্যাতিত শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে বলেছে তার কষ্ট যন্ত্রণা অপমানের কথা। বলেছে, আয়না পড়ায় আমার ছবি দেখা গেছে বলে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। গরুর দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। আমি চুরি করি নাই। আমি চোর না। এটা বারবার বলার পরও তারা আমাকে পিটিয়েছে। শিশুটির মা মমতাজ বেগমও তীব্র প্রতিবাদ করেছেন এই জুলুমের। তিনি বলেছেন, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার ছেলেটিকে ওরা পিটিয়েছে। আমরা গরিব। তাই আমাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। প্রতিবাদ করায় আমার স্বামী ও বড় ছেলেকেও পিটিয়েছে তারা। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজ মৃধার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি নির্যাতনকারীর পাশেই দাঁড়িয়েছেন (হয়তো শ্রেণী স্বার্থের কারণেই)। বলেছেন, মোবাইল ফোন সেট চুরির অভিযোগে ওই শিশুসহ তার বাবা ও বড়ভাইকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আয়না পড়ায় তার নাম উঠেছে। আমরা দরবার করে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দিয়েছি।

অভিযুক্ত সায়েদ হাওলাদার ও নিজাম হাওলাদারের কি বক্তব্য বুক চিতিয়ে বলেছেন তারা, আয়না পড়ায় আমরা দেখেছি ও চুরি করেছে। তাই ওর পরিবারের সদস্যদের গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়েছে। নড়িয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা কী বলেন এ ব্যাপারে তিনি বলেন, এই ধরনের প্রক্রিয়ায় চোর শনাক্ত করার সুযোগ নোই। যদি কেউ এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘আয়না পড়া’ খুবই কার্যকর পদ্ধতি। প্রভাবশালী হাওলাদাররা যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। তারা মানি লোক। তাদের পক্ষে ওকালতি (নির্লজ্জ ও একচক্ষু, লাইক একতরফা আসন্ন জাতীয় নির্বাচন) করেছেন ইউপি সদস্য সাহেবানও। মানির মান তো তিনি রাখবেনই। তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অন্যায়-অবিচার তিনি করতে পারেনই না। তিনি ন্যায়বিচারের(!) প্রতীক। গরিবের মা বাপও(!) বটেন।

এক্ষণে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা:

  • ১. ‘আয়না পড়া’ বিদ্যা ইনডিজেনাস বিদ্যা। এটাকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হবে। আয়না পড়া ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আমরা জোর সুপারিশ করছি। অর্থায়ন বঙ্গীয় নির্বাচনকালীন(!) সরকারের।
  • ২. ‘আয়না পড়া’ বিদ্যা স্কুলের পাঠ্যসূচিতে সংযুক্ত করা হউক। এতে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। নতুন নতুন পীর-ফকিরের সাক্ষাৎ ও উত্থানের খোশ-খবর আমরা পাব। তাদের বিদ্যার ফজিলতে চোর চামারদের হাত (নাকি লোলুপ থাবা) থেকে জাতীয় সম্পদরাশি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
  • ৩. ‘আয়না পড়া’ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। এটা সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে বর্তমান কালের ছানাপোনা আন্ডাবাচ্চা যারা আছে, তাদেরকে এই বিদ্যার উপকারিতা সম্পর্কে বিশদ জানাতে হবে।
  • ৪. এই বিদ্যা বিদেশে রফতানি করা যায় কিনা, সে ব্যাপারেও পাইলট প্রকল্প নেয়া যায়। এনজিও হিসেবে দাঁড় করানো গেলে বিদেশ থেকে চান্দাপাতি যথেষ্টই আসবে বলে মনে হয়। সেই ফরেন কারেন্সি আত্মাসাতেরও উদমা মওকা তৈরি হতে পারে।
  • ৫. ‘আয়না পড়া’ যদি তেতুঁলিয়া থেকে সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে আয়না শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। দু’চার গন্ডা লোক কিছু ‘করে কম্মে’ খেতে পারে। বিসিকের ক্ষুদ্র শিল্প উৎসাহিতকরণ কার্যক্রমেও এটি সেঁধিয়ে দেওয়া যায়।

আমরা মর্মান্তিকভাবে জানি, এইসব সুপারিশ শেষতক সুপারিশের জায়গায়ই থেকে যাবে। কাজের কাজ কিসসু হবে না। আমাদের একটাই দাবি-মজিবুর ফকিরের কাছে। তাকে বলতে হবে গণতন্ত্র যে চুরি হয়ে যাচ্ছে, তার জন্য কে দায়ী কোন গাছে তাকে বান্ধা হবে বেন্ধেছেন্ধে কি করতে হবে।