আবারও বাগধারা

বাগধারায় সঞ্চিত থাকে মানুষের বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতা। কাজেই যেকোনো সংকটকালে আমরা বাগধারাগুলো স্মরণ করতে পারি। আজকে দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে আমি আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না বাগধারা, প্রবাদ-প্রবচনগুলো থেকে উপদেশ নেওয়া ছাড়া। আসুন, আমরা কতগুলো প্রবচন নিয়ে আলোচনা করি। আসলে বাগধারা নিয়ে আলোচনা করারও কিছু নেই, শুধু সেসব দিয়ে বাক্যরচনা করলেই পরীক্ষায় ফুলমার্কস পাওয়া যায়।

সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়
তফসিল ঘোষণার আগেই সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা করা হলে এত প্রাণও যেত না, এত সম্পদও নষ্ট হতো না। এখন এই ঝামেলা মেটানো হবে খুবই কঠিন। কথায় বলে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়।

উভয়সংকট
আমাদের একদিকে যুদ্ধাপরাধী জঙ্গি, আরেক দিকে দুর্নীতিপোষক ক্ষমতাগর্বীরা। আমাদের হয়েছে উভয়সংকট।

ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে
আমরা বড় আশায় বুক বেঁধে একেকবার একেক দলকে নির্বাচিত করি সুসময়ের আশায়, আর আমরা নিক্ষিপ্ত হই ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে। জানি না আমাদের সামনে কী আছে

অন্যের জন্য যে কুয়া খোঁড়ে সেই কুয়ায় সে নিজেই পড়ে
আবদুল নিজেকে খুব চালাক ভেবেছিল, ভেবেছিল প্রতিপক্ষকে এবার সে একটা উচিত শিক্ষা দেবে, কিন্তু এখন সে নিজেই উচিত শিক্ষা লাভ করছে। একেই বলে অন্যের জন্য যে কুয়া খোঁড়ে, সেই কুয়ায় সে নিজেই পড়ে।

যার এক কান কাটা, সে রাস্তার এক পাশ দিয়া হাঁটে, যার দুই কান কাটা সে হাঁটে হাটের মাঝখান দিয়ে
এরশাদ সাহেবের কথা পাল্টাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা সময়ও লাগে না, সকালে এক, দুপুরে আরেক, বিকেলে আরেক। আরে, যার এক কান কাটা, সে রাস্তার এক পাশ দিয়া হাঁটে, যার দুই কান কাটা, সে হাঁটে হাটের মাঝখান দিয়ে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়
দুই দল ক্ষমতায় যাওয়া আর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে, মাঝখান থেকে প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ মানুষের, নিষ্পাপ নারীশিশুর। একেই বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।

চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি/বকো আর ঝকো কানে দিয়েছি তুলো, মারো আর ধরো, পিঠে বেঁধেছি কুলো
বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো সংলাপ ও সমঝোতার পক্ষে, সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে, সহিংসতা নাশকতার বিরুদ্ধে ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের পক্ষে শত শত সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। আসলে ওরা কোনো কথাতেই কর্ণপাত করবে না। বকো আর ঝকো কানে দিয়েছি তুলো, মারো আর ধরো পিঠে বেঁধেছি কুলো।

বিচার মানি, তালগাছটা আমার
সংলাপ হতে পারে। কিন্তু কোনো পক্ষই দাবি ছাড়বে না। এ পক্ষ বলবে, সব মানি, শুধু প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ব না। ও পক্ষ বলবে, নির্দলীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাব না। ভাই রে, বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার।

ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে
২০০৬ সালে যা যা ঘটেছিল, ২০১৩-এ এসে হুবহু একই ঘটনা ঘটছে। সেবারও আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মহাজোট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল, ইয়াজউদ্দিনের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে কয়েকজন পদত্যাগ করেছিলেন। এবারও নির্বাচনকালীন সরকার থেকে পদত্যাগের ঘটনা ঘটছে। দেখা যাচ্ছে, ইতিহাস নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করে। ক্ষমতা কেউ ছাড়তে চায় না। ক্ষমতা হলো মধুর মতো, মাছির পা সেখানে আটকে যায়। ইতিহাসে বারবার তাই একই ঘটনা ঘটে।

ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না
ইতিহাস বলে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। এই পৃথিবীতে কোনো শাসকই চিরদিন ক্ষমতায় থাকে না। মানুষ ক্ষমতা ছাড়তে চায় না, কিন্তু তাকে ছাড়তেই হয়, সেই ছাড়াটা হয় বড়ই করুণ। কিন্তু শাসকেরা সে কথা বারবার ভুলে যায়। ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।

বেটার লেট দ্যান নেভার
সমঝোতা সংলাপ মতৈক্য আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। তবে একেবারেই না হওয়ার চেয়ে দেরি হওয়াও ভালো। একেবারে খাদের কিনারে চলে এসেছি আমরা। এখন অতল অন্ধকার গর্তে পড়ে যাওয়ার অপেক্ষা মাত্র। তার আগেই যেন একটা সংলাপ সমঝোতায় পৌঁছা যায়। বেটার লেট দ্যান নেভার।

সাপকে কখনো বিশ্বাস নেই
তুমি দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছ। কী সুন্দর ডোরাকাটা তোমার সাপ! ভাবছ, বেশ তো পোষ মেনেছে। কিন্তু সাপকে কখনো বিশ্বাস নেই। সুযোগ বুঝেই সে ছোবল মারবেই। যে একবার সাপ, সে চিরকালই সাপ।

‘যে জাতি যে রকম, সে জাতি সে রকম নেতৃত্বই লাভ করবে’
নেতৃত্বকে দোষ দিয়ে কী লাভ এঁরা তো আমাদেরই নেতা। আমরাই তো এঁদের নির্বাচিত করি। এঁদের নামে জয়ধ্বনি দেই। এঁদের কথায় জীবন দিই। জীবন নিই। আমরা যেমন, তেমন নেতাই তো পাব। যে জাতি যে রকম, সে জাতি সে রকম নেতৃত্বই তো লাভ করবে।

যা তুমি ফিরিয়ে দিতে পারো না, তা তুমি কেড়ে নিয়ো না
ক্ষমতার লোভে রাজনীতির দ্বন্দ্বে কেন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ। একটা মানুষের প্রাণও কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে একটা মানুষেরও ক্ষতি হয়। যা তুমি ফিরিয়ে দিতে পারো না, তা তুমি কেড়েও নিয়ো না।

রাত যত গভীর হয়, ভোর তত কাছে আসে
আমরা ঘোরতর সংকটে পড়েছি। যতই দিন যাচ্ছে অন্ধকার তত গাঢ় হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এ থেকে আমাদের মুক্তি নেই। তবে মনে রাখতে হবে, রাত যত গভীর হয়, ভোর তত কাছে আসে।

এ ছাড়া আরও কতগুলো প্রবাদ আমরা স্মরণ করতে পারি। সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায় হায় কেউ কারও নয়। জিয়নকালে মরণ নাই, মরণকালে ওষুধ নাই। বিপদ কখনো একা আসে না। মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে। যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ।

তবে আমাদের ধর্মে বলা আছে, অতীতের চেয়ে নিশ্চয় ভালো হবে রে ভবিষ্যৎ। সেই আশাতেই বসে রইলাম। হে আল্লাহ তাআলা, এই দুর্ভাগা দেশ থেকে সর্বপ্রকার ভয় আপনি দূর করুন।