স্বাধীনতার ৪০ বছরের হিসাব-নিকাশ

কোনো দেশ স্বাধীন হলেই যে সেখানে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাবে এবং সে দেশে শান্তির সুবাতাস বইবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক জাতিগুলো-বৃটিশ, ফরাসি, ওলন্দাজ, পতর্ুগিজ এবং অন্যান্য ছোটখাটো শক্তি, যাদের উপনিবেশ ছিল বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে, সেই সব দেশের স্বাধীনতার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর সবই যে স্বাধীনতাকে অর্থবহ ও সার্থক করে তুলতে সৰম হয়েছে, এমন নয়। স্বাধীনতা লাভ করে আফ্রিকার অনেক দেশ উপজাতীয় ও গোত্রীয় কলহে লিপ্ত হয়ে নামে মাত্র দেশ হিসেবে টিকে আছে। দাঙ্গা, ৰুধায় এখনো সেসব দেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। আবার অনেক দেশ এমনও আছে, যেগুলো কখনো পরাধীন হয়নি বা কারো উপনিবেশ ছিল না, যেমন বাংলাদেশের নিকটবর্তী আফগানিস্তান ও নেপাল, এই দেশগুলোও কাঙিৰত উন্নতি সাধন করতে পারেনি। দুটি দেশই রাজতান্ত্রিক প্রতিভূদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। কিন্তু জনগণ রাজতন্ত্র থেকে কোনো কল্যাণ পায়নি। রাজতন্ত্র হটানোর পরও তারা উন্নয়নের স্পর্শ থেকে বহু দূরে। আফগানিস্তানকে অন্যতম ব্যর্থ রাষ্ট্রের শিরোপা দিলেও হয়তো কম দেওয়া হবে। নেপালের অবস্থা ঠিক আফগানিস্তানের মতো না হলেও দেশটির দারিদ্র্য সীমাহীন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারলেই শুধু পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটিয়ে নেপাল তার প্রতিবেশী সকল দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু আফগানিস্তানের গোত্রীয় সংঘাত ও পরাশক্তির স্বার্থের বিষয় জড়িত থাকায় এবং ভারত-চীনের মধ্যবর্তী স্থানে নেপালের অবস্থান ও নেপালের সবকিছুতে ভারতের নাক গলানোর কারণে দেশটি স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছে না।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ অন্যান্য অনেক দেশের সাথেই তুলনীয় নয়। শুধু দাবিদাওয়া তুলে, অসহযোগ আন্দোলন করে, দূর দেশ থেকে আসা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে দুর্বল করতে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে স্বাধীনতা আদায় হয়নি। একটি শক্তিশালী প্রতিপৰের বিরম্নদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। প্রতিপৰ ছিল পাকিস্তান, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাদেরই অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই অর্থে পাকিস্তান কোনো ঔপনিবেশিক দেশ ছিল না বা বাংলাদেশ কোনো উপনিবেশ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ও বিমাতাসুলভ আচরণ শুরম্ন করেছিল তাতে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের থাকার যৌক্তিক কারণ ছিল না। শাসকদের বিরম্নদ্ধে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ৰোভ উপলব্ধি করতে পারলে শাসকচক্র স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ শাসনের দায়িত্ব এদেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু বিশ্বের কোথাও এমনটি ঘটে না। স্বাধীনতার জন্য কোনোভাবে শক্তি বা কৌশল প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে। তা না হলে ভারত স্বেচ্ছায় কাশ্মীর, আসাম, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডসহ যেসব জায়গায় সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে, সেগুলোকে স্বাধীন করে ঝামেলামুক্ত হতে পারত, বাংলাদেশ তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীনতা না হোক অন্তত স্বায়ত্তশাসন দিতে পারত। কিন্তু যারা শাসন ৰমতায় থাকে, তারা এই হিসাব বুঝে না। যা হোক, এটি আলোচনার মূল বিষয় নয়। স্বাধীনতার পরও কেন কোনো কোনো দেশ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের ৰেত্রে পিছিয়ে থাকে, সেটিই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।

 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়ে বাংলাদেশের চেয়েও দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল এশিয়ার দুটি দেশ মালয়েশিয়া ও দৰিণ কোরিয়ার। দুটি দেশই এখন বিশ্বে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক শক্তি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এবং এর কাছাকাছি সময়ে ১৯৭৫ সালে দৰিণ ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়েছে। ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরম্ন হয়েছিল ১৯৫৭ সালে এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ঘটে ১৯৬৫ সালে। ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্তভাবে পরাজিত হওয়ার আগে ভিয়েতনামে ৭০ লাখ টন বোমা বর্ষণ করেছিল। ভিয়েতনাম পুরোপুরি বিধ্বসত্দ হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা শুরম্ন করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে প্রকৃত যুদ্ধ শুরম্ন হয়েছিল জুন মাস থেকে এবং সে হিসাবে যুদ্ধ ছয় মাসের কম সময় স্থায়ী ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের যুদ্ধে বাংলাদেশ অধিক ৰতিগ্রসত্দ হয়েছে নিহতের সংখ্যা ও অবকাঠামো ধ্বংসের তুলনামূলক বিচারে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশ গঠন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের বিচারে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে ভিয়েতনামের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৫ শতাংশ, আর একই সময়ে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশের নিচে। সদ্য সমাপ্ত ২০১১ সালে ভিয়েতনামের রফতানি আয় ছিল প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ ২০২০ সালে ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করবে। ভিয়েতনাম কৃষি পণ্য রফতানিতে অন্যতম প্রধান দেশ এবং বিদেশি বিনিয়োগেরও আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। আঙ্কটাড এর ২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ৰেত্রে ৪০,২৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাভ করে ভিয়েতনামের স্থান যেখানে ছিল ৫৪ নম্বরে, সেখানে ৪,০৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬তম স্থানে। এর কারণ ভিয়েতনাম ৩৫ বছরে একটি স্থিতিশীল দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সৰম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ৪০ বছরেও স্থিতিশীল রাজনীতির দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারেনি।

 

এর কারণ নির্ণয় করতে গবেষণা করার প্রয়োজন পড়ে না। রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল একটি দেশে কে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। বাংলাদেশে সস্তা শ্রমের লোভে যারা বিনিয়োগে উৎসাহী হয়েছিল কয়েকটি রফতানি প্রক্রিয়াজাত এলাকায় শ্রমিক অসনত্দোষ সৃষ্টি করে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের মাঝেই ভীতির সঞ্চার করা হয়েছে। বেশ কিছু সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে যৌথ বিনিয়োগ করে এখন রীতিমতো ফাঁদে আটকা পড়েছেন। তারা শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করে শিল্প স্থাপন করেছেন, কিন্তু ৰমতাসীন দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের আনুগত্য না করায় কিংবা মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় তাদের শিল্প চালু করার জন্য গ্যাস বা বিদু্যৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এটি যে শুধু বর্তমান সরকারের আমলেই ঘটছে এমন নয়, প্রতিটি সরকার একই পদ্ধতি অনুসরণ করায় আগ্রহী বিনিয়োগকারীরাও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে গত ৪০ বছরে উত্তরণের কথা কেউ ভাবেননি। অদূর ভবিষ্যতে কেউ ইতিবাচক কিছু ভাববেন, এমনটি দূরাশা মাত্র। কারণ, চার দশক ধরে দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতিরই চর্চা হয়েছে। দেশের জনগণকে যে প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন সে প্রতিশ্রম্নতি বাসত্দবায়নের প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেননি। এখনো নির্বাচন এলে একই ধরনের প্রতিশ্রম্নতির ফুলঝুরি ছড়ানো হয়, কিন্তু ৰমতায় গিয়ে প্রতিশ্রম্নতির ধারেকাছেও তারা থাকেন না। ৰমতাসীনদের একমাত্র লৰ্য দাঁড়ায় প্রতিপৰকে ঘায়েল ও নিমর্ূল করা। এ সর্বনাশা প্রতিযোগিতায় দেশের উন্নয়ন যে সম্ভব নয়, তা সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন যে কেউ বুঝতে পারলেও যারা ৰমতায় যান, তারা বোঝেন না। সে কারণে বাংলাদেশের ৪০ বছরের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলকেই একাধিক্রমে দুবার ৰমতায় যেতে দেখা যায়নি। একদল ৰমতায় গিয়ে বাড়াবাড়ি করবে, পরের বার তারা ৰমতায় আসতে পারবে না, এটাই যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা নিজেদের গণতন্ত্রের জন্য জীবন দেওয়ার জন্য প্রসত্দুত বলে দাবি করেন তাদের দল ও সহকর্মীদের পৰে বাংলাদেশে যদি দীর্ঘ ৪০ বছরেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হয়, তাহলে মানুষ কবে পাবে গণতন্ত্রের স্বাদ? বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা তার সম্প্রসারিত পরিবারকেন্দ্রিক যে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তা এখন শুধু তার পরিবারে সীমাবদ্ধ নেই, তার অবর্তমানে অথবা বলা যায় তার শূন্য স্থান পূরণ করতে যিনি এসেছিলেন তার জীবনাবসানে তার পরিবারও একই ধারার রাজনীতি অর্থাৎ পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লৰ্যেই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। ৰমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় দুই জনপ্রিয় নেতার দুঃখজনক অকালমৃতু্যতে তাদের নিজ নিজ দলের নেতারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দলে টেনে এনেছিলেন রাজনীতিতে নেহাতই নিরাসক্ত দুই নারীকে। তাদের একজন হারিয়েছেন পিতা, আরেকজন স্বামী। উদ্দেশ্য, উভয় নেতার প্রতি মানুষের যে সীমাহীন ভালোবাসা ও আবেগ তা কাজে লাগিয়ে দলের ঐক্য ঠিক রাখার পাশাপাশি ৰমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া। সন্দেহ নেই, দলের নেতৃত্ব তারা ভালোভাবেই দিয়েছেন এবং উভয়েই যে প্রায় তিন দশক ধরে দেশের প্রধান দুটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের দলে কেউ ভাবতেই পারেন না উভয়ে জীবিত ও সুস্থ থাকতে অন্য কেউ তাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসবেন। তারা যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। দলকে তারা ৰমতাসীন করেছেন এবং মোটামুটি নিশ্চিত করেছেন যে তারা যতদিন দল দুটির নেতৃত্বে থাকবেন, ঘুরেফিরে তাদের দলই ৰমতায় আসবে। কিন্তু তাদের একচ্ছত্র নেতৃত্বে দেশ বা জাতির কোনো লাভ যে হয়নি, তা আগেই উলেস্নখ করেছি। বরং তাদের নেতৃত্বের নেতিবাচক দিকই বিগত বছরগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত তো বটেই, জাতীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তও আসছে একজনের কাছ থেকে। যিনি যখন ৰমতায় থাকছেন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় একক কতর্ৃত্ব তার। গণতন্ত্রচর্চার অনুপস্থিতিতে দুই প্রধান দলের শীর্ষ নেতারা দলে ও রাষ্ট্রৰমতায় তাদের উত্তরাধিকারীদের আগমনের পথ অবাধ করে দিয়েছেন। এৰেত্রে রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রশ্ন নেই। বেশ কয়েক বছর ধরেই দুই দলের পোস্টার-ব্যানারে শোভা পাচ্ছে দুই পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজনের ছবি। পরিবার দুটিতে রাজনীতির সূচনা যারা করেছেন তাদের ছবি অর্থাৎ প্রথম প্রজন্মের, বর্তমান নেতার ছবি অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্মের এবং ভবিষ্যৎ অর্থাৎ তৃতীয় প্রজন্মের সম্ভাব্য প্রতিনিধিত্বকারীর ছবি। উভয় দলের একটি অংশ এটিকে দোষণীয় মনে করছে না, কিন্তু আরেক অংশ বিষয়টিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। বিগত কেয়ারটেকার সরকারের পূর্বের সরকার ৰমতায় থাকাকালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ৰমতাসীন দলে ও পর্দার অন্তরাল থেকে সরকারের কর্মকাণ্ডে যেভাবে হসত্দৰেপ করছিলেন, তা কেউ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি দলের মধ্যে গুরম্নত্বপূর্ণ যে পদটি তাকে দেওয়া হয়েছিল, তা আদৌ প্রয়োজন ছিল বলে দলের অনেকে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু কেউ প্রতিবাদও করেননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও ৰমতাসীন দলের প্রধানের আমেরিকাপ্রবাসী পুত্র তার দলের একজন নবীন সদস্য এবং তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবেই রাজনীতিতে তাদের উত্তরণ ঘটছে।

 

এই প্রবণতা অতীতে কোনো সুফল বয়ে আনেনি, ভবিষ্যতেও যে আনবে না তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। দেশবাসীর দুর্ভাগ্যের ও দুর্ভোগের অবসান কবে হবে, তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তা না হলে ১৯৭১ সালে এত রক্ত ঝরার পর, এত ধ্বংসলীলার পরও তারা সুখের মুখ দেখবে না কেন? ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। স্বাধীনতালাভের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের অধীনে সংৰিপ্ত সময়ের জন্য গণতন্ত্র এলেও শিগগিরই তা পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় এবং জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় একদলীয় শাসন। ১৯৭৫ সালে এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন এক দলের কতর্ৃত্ববাদী শাসনের অবসানে আসে সামরিক শাসন। সেই সামরিক শাসক ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা করলেও তা সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু তিনি তার সরকারকে গণতান্ত্রিক রূপ দিতে বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদদের সমাবেশ ঘটান তার দলে এবং শেষ পর্যন্ত সেটি দলীয় সরকার হিসেবেই টিকে থাকে ১৯৮১ সালে তাকে হত্যা ও ১৯৮২ সালে আরেক সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ কতর্ৃক ৰমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত। এরশাদ ৰমতায় থাকেন দীর্ঘ নয় বছর এবং ১৯৯০ সালে তার পতন ঘটে সকল গণতান্ত্রিক শক্তির যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনরায় যাত্রা শুরম্ন হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করলেও বাসত্দবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশবাসী রাজনৈতিক বিচারে দুটি প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থক হিসেবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দল দুটির শীর্ষ নেতৃদ্বয় তাদের দলের দায়িত্বহীন নেতাদের কাছ থেকে অন্ধ সমর্থন লাভ করে দলে কেমন একনায়কতান্ত্রিক ৰমতা প্রয়োগ করছেন তা উলেস্নখ করেছি। নির্বাচন এলে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেন তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে। মনোনয়ন তারাই পায় যাদের অর্থ ও পেশি শক্তি আছে। নির্বাচনে জয়ী হলে মন্ত্রী পদ বণ্টন করা হয় আনুগত্য ও তোষামোদীর বিনিময়ে। সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে উভয়ে কীভাবে দলের সাধারণ সম্পাদক ও মহাসচিব পরিবর্তন করেছেন, তা অনেকেরই মনে থাকার কথা। আচরণে গণতন্ত্র না থাকার কারণে দুটি দলই তাদের দলের ৰমতায় থাকাকালে আলঙ্কারিক পদ থেকে বিদায় নেওয়া ও পদে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কী আচরণ করেছেন, তাও দেশবাসীর বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়।

 

নিম্ন আদালত কার্যত সরকারেরই অঙ্গ। সরকারি দলের হলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযুক্তরা অবলীলায় জামিন পেয়ে যাচ্ছে, আর হালকা অভিযোগে আটক বিরোধী দলের অভিযুক্তরা একই আদালত কতর্ৃক জামিন পাচ্ছে না। রাষ্ট্রের অশীতিপর প্রেসিডেন্ট আইনকানুনের ঊধের্্ব উঠে এবং বিবেক দ্বারা তাড়িত না হয়ে শুধু দলীয় বিবেচনায় হত্যা মামলায় মৃতু্যদণ্ড লাভকারী আসামিদের ৰমা ঘোষণা করে চলেছেন। হাইকোর্টের বেঞ্চগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মামলা সেসব বেঞ্চে পাঠানো হলে সেগুলো অনিষ্পন্ন থাকছে অথবা খারিজ হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ৰেত্রে সরকারি আচরণ আরো বিস্ময়কর। ৰমতাসীন দলগুলোর সাথে বোঝাপড়া আছে এমন দলগুলো যেসব ইসু্যতে সরকারের পৰ থেকে বাধাহীনভাবে সমাবেশ ও মিছিল করতে পারছে, একই ইসু্যতে বিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত দলগুলোকে সমাবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে না, রাস্তায় মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলকারীদের গুলি করছে, বেধড়ক পেটাচ্ছে, গ্রেফতার করছে এবং মামলা দিচ্ছে। গত ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি দেশব্যাপী বিরোধী দলের মিছিলে গুলি চালিয়ে পুলিশ ৫ জনকে হত্যা করেছে, সহস্রাধিক আহত হয়েছে এবং ১৬ হাজার অজ্ঞাত লোকের বিরম্নদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ যে কাউকে ধরে এই মামলাগুলোতে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। এ আচরণ গণতান্ত্রিক হতে পারে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা না থাকলেই কেবল এমন আচরণ করা হতে পারে। বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভকারী প্রধান দুটি দল ৰমতায় গেলেই কেন প্রতিপৰ দলের বিরম্নদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ ও সহিংস হয়ে ওঠে, তা দেশবাসীর কাছে অতি বিস্ময়ের ব্যাপার।

 

বিএনপি ৰমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ সংসদ অধিবেশন বর্জন করে, আওয়ামী লীগ ৰমতায় গেলে বিএনপি সংসদে যোগদান থেকে বিরত থাকে। এটিই যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুদলের যে কোনোটিই সরকারে অথবা বিরোধী দলে থাকুক না কেন, সরকারে থাকলে প্রতিটি কাজে বিরোধী দলকে অগ্রাহ্য করা আর বিরোধী দলে থাকলে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও পদৰেপকে গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে তার বিরোধিতা করা। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ৰমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম প্রধান কাজ ছিল দেশের যেসব গুরম্নত্বপূর্ণ স্থানে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম আছে, সে নামগুলো মুছে ফেলা। এই কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর হাতে নেওয়া হয় নিজেদের মতো করে স্বাধীনতার ইতিহাস পুনর্লিখনের কাজ। কারণ তারা অভিযোগ করে আসছিল যে বিএনপি স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করেছে। সরকার ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধন, সে আইনের অধীনে ট্রাইবু্যনাল গঠন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ও বিএনপির দুজন নেতার বিচার শুরম্ন করেছে, ভারতের সাথে প্রটোকল স্বাৰর করে ট্রানজিট সুবিধা দান, উচ্চতর আদালতের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের আমলে কৃত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রত্যাবর্তন, কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বাতিল, বিরোধীদলীয় নেতাকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, চ্যানেল ওয়ান বন্ধ ঘোষণা, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করেছে। সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, ১৯৭৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত (মাঝে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাদ দিয়ে) ২৮ বছর ধরে বাংলাদেশে চলে আসা সবকিছু ভুল ছিল, এখন তাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছে যাবতীয় ভুল শোধরানোর। ভুলে ভুলে যদি প্রায় তিন দশক পার হয়ে থাকে, তাহলে এবারের পাঁচ বছরে সকল ভুল শোধরানো সম্ভব হবে বলে কেউ মনে করে না। কারণ এরই মধ্যে তিন বছর কেটে গেছে এবং সাফল্যের দেখা মেলেনি। যে দুই বছর অবশিষ্ট আছে নির্বাচনের জন্য ঘর গোছাতেই সে সময় কেটে যাবে। দেশের জন্য আর কাজ করা হবে না।