ভারতের দারিদ্র্যচিত্র ও সমরসজ্জা

বিগত সাত বছরের মতো এবারো ভারতের কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শারদ পাওয়ার পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশনে দেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে তিনি রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ভারতের কৃষি অর্থনীতিবিদেরা তার ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কারণ তিনি গত আট বছর কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কৃষি খাতে অনেকগুলো রেকর্ড গড়ার দাবি করেছেন। তাদের মতে, কোনো বছর ২৪ কোটি ৫০ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের পর অন্য কোনো বছরে ২৪ কোটি ৮০ লাখ টন উৎপাদিত হওয়া কোনো রেকর্ড নয়। খাদ্যপ্রাপ্যতার হার কতটুকু বেড়েছে তা বিচার্য বিষয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতে গত প্রায় ২০ বছরে ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’-এর বছরগুলোতে খাদ্যপ্রাপ্যতা বিপজ্জনক হারে কমেছে। ১৯৯২-‘৯৬ সালে যেখানে খাদ্যের মাথাপিছু দৈনিক প্রাপ্যতা ছিল ৪৭৪.৯ গ্রাম, সে ক্ষেত্রে ২০০৭-২০১০ সালে খাদ্যপ্রাপ্যতা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪০.৪ গ্রাম। কমে যাওয়ার এই বার্ষিক হার ৭.৩ শতাংশ। আলোচিত মেয়াদে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো বছর খাদ্যপ্রাপ্যতা বাড়েনি। কিন্তু তার পূর্ববর্তী ২০ বছরে অর্থাৎ ১০ শতাংশ হারে বেড়ে ১৯৭২ সালে মাথাপিছু ৪৩৩.৭ গ্রাম থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ৪৪০.৩ গ্রামে উন্নীত হয়েছিল। বর্তমান পরিসি’তির আশু উন্নতি ঘটবে এমন সম্ভাবনা দেখছেন না ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদেরা। ভারতের খাদ্য উৎপাদনে আশাব্যঞ্জক সাফল্য অর্জিত না হওয়া এবং চাহিদা মেটাতে বিপুল খাদ্য আমদানি করায় তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপদের কারণ। কারণ ভারত থেকে খাদ্য কিনতে পারবে না এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে ভারতের মতো ক্রেতার আবির্ভাব হলে খাদ্যশস্যের আমদানির ব্যয় বাড়বে। বিশ্বে খাদ্য রফতানিকারী দেশের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।

ভারত বিশ্ব-অর্থনীতিতে একটি সম্মানজনক অবস্থান গড়ে নিতে এবং সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে ‘বিগ ব্রাদার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে দেশটি সমর শক্তির দিক থেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে যে প্রতিষ্ঠা করবে, তাতেও কোনো সংশয় নেই। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া ভারতকে তোয়াক্কা না করার দেশ আর দ্বিতীয়টি নেই। আশির দশকের শেষ দিকে নেপাল ভারত-নির্ভরতা কমিয়ে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়লে নেপালকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, এমনকি রাজবংশ নির্মূলে পারিবারিক কলহের চেয়ে ভারতের ষড়যন্ত্রই মুখ্য কারণ ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনো সংশয়ের ঊর্ধ্বে না ওঠায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করতে সব উদ্যোগ নিয়েছে এবং বর্তমানে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। দুই দেশের সম্পর্কের এই উন্নয়নের পর ভারত এখন আর কোনো প্রতিবেশীকেই তার সাথে তুলনীয় বলে গণ্য করছে না। ভারতের এই মনোভাব সবপর্যায়ে প্রকট হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ভারতের স’ায়ী প্রতিনিধি হরদীপ পুরি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের এক সেমিনারে দম্ভের সাথেই বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে ‘উইন-উইন রিলেশনস’। ভারতের পরমাণু ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য একতরফা কোনো কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বিনিয়োগের ফলে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস’ান হয়েছে। জাতিসঙ্ঘে বিভিন্ন ইস্যুতে ভোট নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের অবস’ান যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বলে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল থিঙ্কট্যাঙ্ক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এক নিবন্ধের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোটের বেলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও ভারতের একটি স্বতন্ত্র অবস’ান থাকবে। জাতিসঙ্ঘ উত্থাপিত যেসব ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও অপরাপর কয়েকটি রাষ্ট্র যে অবস’ান নেয়, সেসব ইস্যুতে ভারত বিশ্ববাসীকে ছেড়ে অন্যের স্বার্থে নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারে না। তিনি আরো বলেন, ভারত জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। এমনকি এর ফলে নিরাপত্তা পরিষদে ভারত স’ায়ী সদস্যপদ না পেলেও ভারত এ নীতি থেকে পিছু হটবে না। ভারত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদের স’ায়ী সদস্যপদ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে না।

ভারতের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের মানুষের আশাবাদী হয়ে ওঠার কথা। কারণ এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ভারতের উন্নয়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবেশী পিছিয়ে থাকলে ভারতের পক্ষে কাঁটাতারের বেড়া বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ‘ ইকোনমিক রিফিউজি’র ভারতে অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যেমন অনুপ্রবেশ ঠেকানোর যাবতীয় ব্যবস’া নিয়েও মেক্সিকো, কিউবা ও ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে মানুষের প্রবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। কিংবা চার দিক থেকে অবরুদ্ধ গাজার সাথে মিসরের যোগাযোগব্যবস’া বন্ধ করে দেয়ার পর কিভাবে মাটির নিচ দিয়ে টানেল খনন করে গাজাবাসী মিসর থেকে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চালান আনছে, তা থেকেও উপলব্ধি করা যেতে পারে। ইসরাইল কয়েক দফা রকেট হামলা চালিয়ে টানেলগুলো ধ্বংস করে দেয়ার পরও নতুন করে টানেল খনন করা হয়েছে। ১৯৪৭ সাল থেকে প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে, তা রীতিমতো আধিপত্যবাদী এবং সবার কাছ থেকে নিজের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ভারত কোনো আপস করেনি। বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশীরা কিছুই পায়নি। অন্যান্য প্রতিবেশীর কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি শুধু বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণের দিকগুলো তুলে ধরি, তাহলে এ বিষয়ে উপলব্ধি করা সহজ হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা যে বিনা স্বার্থে ছিল না, তা রাজনীতিতে নবিসের পক্ষেও বোঝা সম্ভব। বিশ্ব রাজনীতির দাবা খেলায় পটু হেনরি কিসিঞ্জার সমপ্রতি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গিয়েও এ কথাটি আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সাথে সাথে ভারতের কাছে বেরুবাড়ী তুলে দিলেও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের দু’টি ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সাথে মূল ভূখণ্ডে যোগাযোগ করার জন্য তিনবিঘা করিডোরে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে ভারতের সময় লেগেছে দীর্ঘ ৩৮ বছর। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ ২০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালুর অনুমতি নিয়ে শুকনো মওসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার আর বন্ধ করেনি। অনেক দেনদরবারের পর ১৯৭৭ সালে ভারত এ ব্যাপারে পাঁচ বছরের জন্য একটি ‘অ্যাডহক’ চুক্তি করে। কিন’ চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেটি আর নবায়ন করতে চায়নি। বাংলাদেশের পীড়াপীড়িতে ১৯৮৪ সালে ভারত গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে একটি স্বল্পমেয়াদি ‘সমঝোতা স্মারকে’ স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালে। ক্ষুদ্র প্রতিবেশীর সাথে ভারতের এহেন আচরণের অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণা করা নিশ্চয়ই অসঙ্গত হবে না যে, ভারত যত উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ভারতীয় আধিপত্য ও খবরদারি তত প্রকটভাবে অনুভূত হবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, ভারতের পক্ষে কখনো ‘সুপার পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হওয়া সম্ভব হবে না, বড়জোর আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়া সম্ভব। কিন’ ভারতে যেভাবে দারিদ্র্য বিরাজ করছে, তাতে অন্য কোনো দিকে মনোযোগী হওয়ার চেয়ে ভারতের উচিত সীমাহীন দারিদ্র্য ও ধনবৈষম্য নির্মূলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া। ভারত যদিও নিজেকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত করেছে, কিন’ একই সাথে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশের বসবাসই ভারতে। বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪১.৬ শতাংশই ছিল আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে। ২০১০ সালের জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের ৩৭.২ শতাংশ মানুষ জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে। অক্সফোর্ড পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের সামপ্রতিক এক গবেষণা অনুসারে ভারতের আটটি রাজ্যে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আফ্রিকার ২৬টি দরিদ্রতম দেশের মোট জনসংখ্যা ৪১ কোটিরও বেশি। জাতিসঙ্ঘের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলসের রিপোর্ট অনুযায়ী- আগামী চার বছরের মধ্যে ভারত ও চীনের ৩২ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসতে পারবে তাদের নিজ নিজ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সুফল হিসেবে। কিন’ পদক্ষেপ যে সত্যি সত্যি সুফল বয়ে আনবে এ ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই সংশয় কাটেনি। কারণ দারিদ্র্য নির্মূল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পর গত সাড়ে ছয় দশকে দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে কোনো সরকারই কাঙিক্ষত সাফল্য পায়নি। ২০১১ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ক্ষুধা পরিসি’তি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা ৮১টি দেশের তালিকায় ভারতের স’ান দিয়েছে ৪৫তম। একই সূচকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপালসহ আরো কিছু দরিদ্র দেশ ভারতের চেয়ে ভালো অবস’ানে আছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় ১.২৫ মার্কিন ডলার হলে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস’ান বোঝায়। ভারতের ন্যাশনাল কমিশন ফর এন্টারপ্রাইজের ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি অর্জুন সেনগুপ্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭৭ শতাংশ ভারতীয় দৈনিক মাথাপিছু ৫০ সেন্ট বা ২০ রুপি ব্যয় করে জীবন কাটায় এবং সাক্সেনা কমিটির রিপোর্টে ক্যালোরি গ্রহণের দিক থেকে ৫০ শতাংশ ভারতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অক্সফোর্ড ইনিশিয়েটিভের দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী ভারতের মোট জনসংখ্যার ৫৩.৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, যাদের মধ্যে ৩৪ কোটি বা জনসংখ্যার ২৮.৬ শতাংশ হতদরিদ্র এবং আরো ১৯ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যে নিপতিত। ভারতের ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল, কিন’ কৃষি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

১৯৪৭ সালে ভারতের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ছিল ৬১৯ মার্কিন ডলার এবং তখন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মাথাপিছু আয় ছিল যথাক্রমে ৪৩৯ ডলার, ৭৭০ ডলার ও ৯৩৬ ডলার। ১৯৯৯ সালে এই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যায় এবং ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় দাঁড়ায় যথাক্রমে ১,৮১৮ ডলার, ৩,২৫৯ ডলার, ১৩,৩১৭ ডলার ও ১৫,৭২০ ডলার। ১৯৪৭ সালে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার আয়ের মধ্যে খুব পার্থক্য ছিল না। কিন’ দক্ষিণ কোরিয়া ২০০০ সালে উন্নত দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। ভারত আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশাল হওয়া সত্ত্বেও এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদেরা সর্বস্তরে সীমাহীন দুর্নীতি ও সম্পদ বণ্টনে ব্যাপক বৈষম্যকে দায়ী করেছেন। নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত সরকারের ‘নিও-লিবারেল’ নীতি ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর ফলে ভারতের দারিদ্র্যপীড়িত রাজ্যগুলোর গ্রামে কৃষিনির্ভর পরিবারে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ভারতীয় গ্রামবাসী কৃষক বা কৃষি শ্রমিক আত্মহত্যা করেছে। এই করুণ চিত্রের পাশাপাশি ভারতে ডলারের হিসাবে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যার দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় অবস’ানে থাকা বেমানান মনে হলেও বাস্তবে এটিই সত্যি এবং সম্পদের বৈষম্য যে ভারতে কতখানি তা অনুমান করা যায়। ভারতের গ্রামগুলোতে বসবাসকারী ৮৫ শতাংশ পরিবার হয় ভূমিহীন, নয়তো অতিপ্রান্তিক বা ক্ষুদ্র কৃষক। গত ১৫ বছরে এই চিত্রের ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে যে, ২০১৫ সালেও ভারতে ৫৩ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকবে। জাতিসঙ্ঘের মানব উন্নয়ন সূচকে ভারতের অবস’ান ১৩২তম এবং বিগত এক যুগে অবস’ানটা মোটামুটি একই ছিল।

কিন্তু এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ভারত আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। প্রতিবেশী প্রতিটি দেশ ভারতের কূটনৈতিক আচরণের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সমরসজ্জায় আশঙ্কার মধ্যে থাকে। দেশে যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো তো আছেই, গত ছয় বছর ধরে যুদ্ধাস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রেও ভারতের স্থান ছিল শীর্ষে। এই প্রস্তুতি কার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য? মহাত্মা গান্ধীর অহিংস পথই এখনো ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি। কিন্তু এই নীতি কখনো অহিংস ছিল না। গান্ধী তার জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষ করেছেন যে, তার অনুসারী কিভাবে মুসলমানদের হত্যা করতে তার মন্ত্র প্রয়োগ করেছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ব্যাপকভাবে মুসলমান এবং সাধারণভাবে শিখ ও দলিত বা নিচু বর্ণের হিন্দুরা বার বার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের পর বেশির ভাগ দেশীয় রাজ্যকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করেছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদ ও ১৯৫২ সালে গোয়া দখল করেছে। ভারত একবার চীনের সাথে এবং তিনবার পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখতে ভারতের ভূমিকা ছিল প্রধান। সিকিমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ খোলামেলা ব্যাপার। ভারতের অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হলে বোধহয় ভুল হবে না যে, ভারত অহিংসার জপমালা নিয়ে বসে নেই। তারা তাদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে অবিচল, আর সে লক্ষ্য হলো ‘অখণ্ড ভারত’। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতকে ট্রানজিটের নামে কার্যত করিডোর দিয়ে পূর্ব দিকে তাদের সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ কিছুটা সুগম করে দিয়েছে। কিন্তু চীন ও পাকিস্তান ভারতের জন্য যেহেতু বড় ধরনের ‘উৎপাত’, অতএব তাদের বিরুদ্ধে সমর প্রস্তুতি রাখতে ভারত দারিদ্র্য নির্মূলের মতো ইস্যুকে কখনো বড় করে দেখেনি। ভারত আগামী ১৫ বছরে ১০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে ব্যয় করবে। এটি সামরিক খাতে নিয়মিত ব্যয়ের অতিরিক্ত। চলতি বছর ভারতের সামরিক বাজেটের পরিমাণ ৩৮০০ কোটি ডলার, পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। এ ব্যয় নিঃসন্দেহে অহিংসার বাণী ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে নয়।